‘বন্দে মাতরম’ না, ‘জন গণ মন’ না, ভারতের রাষ্ট্রীয় সংগীত হোক – ‘শুভ সুখ চৈন’

azad-hind-fauj

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যদি কয়েকটি শব্দকে জাতীয় জাগরণের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করতে হয়, তবে “বন্দেমাতরম” নিঃসন্দেহে তার অন্যতম। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কলমে জন্ম নেওয়া এই গান পরবর্তী প্রায় সাত দশক ধরে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, বিপ্লবী সংগঠনের কার্যকলাপ, স্বদেশি আন্দোলন এবং স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল জনসমুদ্র—সব ক্ষেত্রেই “বন্দেমাতরম” ছিল আবেগ, প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগের ভাষা।

কিন্তু ভারতের বহুত্ববাদী চেতনার পরিপন্থি বলে সেই সময়েই এই গানটি ভেদাভেদ এবং সাম্প্রদায়িক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।  


বঙ্কিমচন্দ্র ও বন্দেমাতরমের জন্ম

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭০-এর দশকে বন্দেমাতরম রচনা করেন। ১৮৭৫ সালে এটি সাহিত্যপত্রিকা বঙ্গদর্শন-এ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে ১৮৮২ সালে প্রকাশিত আনন্দমঠ উপন্যাসে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। 

১৮৯৬ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে এটি গাওয়ার পর গানটি সর্বভারতীয় পরিচিতি লাভ করে।

এরপর ধীরে ধীরে “বন্দেমাতরম” একটি সাংস্কৃতিক রচনা থেকে রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়। 

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে শিক্ষিত ভারতীয় সমাজের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়ছিল। জাতীয়তাবাদী নেতারা এমন একটি প্রতীক খুঁজছিলেন যা ভারতবাসীকে আবেগগতভাবে একত্রিত করতে পারে। “বন্দেমাতরম” সেই শূন্যস্থান পূরণ করে।

এই সময় “বন্দেমাতরম” স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান স্লোগান হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা আন্দোলের মিছিলকারীরা “বন্দেমাতরম” ধ্বনি দিতে দিতে এগিয়ে যেতেন।  “বন্দেমাতরম” ধ্বনি দিয়ে গ্রেফতার বরন করতেন। স্কুল-কলেজের ছাত্ররা, আইনজীবীরা, ব্যবসায়ীরা এমনকি গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষও এই স্লোগান গ্রহণ করেন।

ব্রিটিশ প্রশাসন এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে যে অনেক জায়গায় “বন্দেমাতরম” ধ্বনি নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়। বাংলার বীর বিপ্লবীরা হাসি মুখে “বন্দেমাতরম” ধ্বনি দিয়ে ফাঁসির মঞ্চে আত্মবলিদান করতেন।


বিতর্কের সূত্রপাত

এত জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও গানটির অন্তরনিহিত ধর্মীয় চেতনা সাম্প্রদায়িক বিতর্কের জন্ম দেয়। গানটিতে মাতৃভূমিকে দেবীরূপে উপস্থাপন করা ভারতের সব সম্প্রদায়ের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। মুসলমানদের যুক্তি ছিল যে রাষ্টীয় প্রতীক এমন হওয়া উচিত যা ধর্মীয় প্রতীকবাদের ঊর্ধ্বে থাকবে এবং সকল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করবে। এবং ভারতের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে প্রতিফলিত করবে। 

কিন্তু “বন্দেমাতরম” গানটি শুরুই হয়েছে সুজলা সুফলা মাতৃভূমিকে মাতৃদেবীরূপে স্তব করে। 

বন্দে মাতরম্
সুজলাং সুফলাং
মলয়জশীতলাং

তারপর আবার মাতৃভূমিকে দেবী দূর্গা, লক্ষী, সরস্বতী হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী
কমলা কমল-দলবিহারিণী
বাণী বিদ্যাদায়িনী

ইসলামের একেশ্বরবাদ (তাওহীদ) অনুসারে কোনো কিছুকেই একেশ্বরের আসনে বসানো যায়না এবং তার বন্দনা বা স্তব করা যায় না। নিজের জন্মভূমিকে মাতৃভূমি হিসাবে ভালবাসা যায়, মাতৃভূমির জন্য গর্ব অনুভব করা যায়, মাতৃভূমির জয় গাওয়া যায়, কিন্তু মাতৃভূমিকে মাতৃদেবী হিসাবে পূজা করা যায় না, বন্দনা করা যায় না।

এবং মাতৃভূমিকে মাতৃদেবী হিসাবে পূজা না করার জন্য দেশের প্রতি ভক্তি, ভালোবাসা, দেশের জন্য গর্ব অহংকার কোনো কিছুই কমে যায় না। পৃথিবীতে অনেক শক্তিশালি উন্নত জাতি আছে, তারা তাদের নিজেদের দেশকে পিতৃভূমি (Father Land) বলে, তার জন্য তাদের দেশের প্রতি তাদের ভালোবাসা কারো থেকে কম নয়।


আনন্দমঠ

শুধু “বন্দেমাতরম” গানটি নয়, আনন্দমঠ উপন্যাসটিও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। আন্দমঠ উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল ১৭৭৬ সালের মনন্তরের পর ফকির-সন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিকায়। 

ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বলতে আঠারো শতকের শেষের দিকে (১৭৬০-১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলাতে ফকির ও সন্ন্যাসী বা মুসলিম ও হিন্দু তাপসদের তৎকালীন ব্রিটিশ শাসন বিরোধী আন্দোলনকে বোঝানো হয়ে থাকে। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রধান নেতা ছিলেন মুসলমান পীর মজনু শাহ। উধুয়ানালার যুদ্ধ (১৭৬১) ও বক্সারের যুদ্ধে (১৭৬৪) মজনু শাহ বৃহৎ সংখ্যক মুসলিম ফকির ও হিন্দু সন্ন্যাসীকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে একত্রিত করেন। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বাংলায় প্রথম ব্রিটিশ-বিরোধী সংগ্রামের সূচনা করে। 

কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সাম্প্রদায়িক মানসিকতা আনন্দমঠ উপন্যসটিতে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়েছে, এবং ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে অত্যাচারি মুসলমান শাসকদের বিরুদ্ধে ‘সন্তান দল’ নামক হিন্দু সন্ন্যাসীদের লড়াই হিসাবে দেখানো হয়েছে। এই আনন্দমঠে বঙ্কিমচন্দ্র “বন্দেমাতরম” গানটি সংযুক্ত করেন, সেখানে দেখাযায় হিন্দু সন্ন্যাসীরা “বন্দেমাতরম” ধ্বনি দিয়ে মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

খুব স্বভাবিক ভাবেই মুসলিমরা “বন্দেমাতরম” এবং আনন্দমঠের বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে থাকে। উনিশ শতকের শেষদিকে এই আপত্তি খুব জোরালো ছিল না। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে মুসলিম রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি বড় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়।


কংগ্রেস নেতৃত্ব তখন বাধ্য হয়ে এই বিষয়টি নিয়ে দলের অভ্যন্তরে আলোচনা শুরু করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং “বন্দেমাতরম” গানটির ঐতিহাসিক মর্যাদাকে বজায় রাখার জন্য ১৯৩৭ সালে জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু এবং মওলানা আবুল কালাম আজাদের একটি উপ-কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শরণাপন্ন হন।

রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ ও কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত (১৯৩৭):

নেহরু ও সুভাষচন্দ্রকে লেখা চিঠিতে কবিগুরু জানান যে, প্রথম দুটি স্তবকে কোনো ধর্মীয় রূপক নেই এবং তা দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বন্দনা। কিন্তু পরবর্তী স্তবকগুলো মুসলিমদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পরামর্শ মেনে নিয়ে তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসু ও নেহরুর নেতৃত্বে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি (CWC) একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাস করে:

জাতীয় সভা বা অধিবেশনে কেবল ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া হবে। বাকি অংশগুলো বাদ দেওয়া হবে যাতে কোনো সম্প্রদায়ের আপত্তি না থাকে।

গান্ধীজি বলেছিলেন যে, যে গান এত আত্মত্যাগের ইতিহাস বহন করে তা কখনো বর্জন করা যায় না, তবে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রাখাও জরুরি।


১৯৪৩ সালের অক্টোবর মাসে সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ সরকার তথা সুভাষ বসুর অস্থায়ী স্বাধীন ভারত সরকারের ঘোষণাতেও জাতীয় সংগীত হিসাবে বন্দেমতরম গাওয়া হতো।  কিন্তু নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু চেয়েছিলেন সমস্ত বিতর্কের ঊর্ধ্বে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংগীত।

১৯৪৩ সালে নেতজী সুভাষচন্দ্র বসু যখন জার্মানি থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থানান্তরিত হন, তখন তার নির্দেশে আজাদ হিন্দ রেডিওর লেখক মুমতাজ হুসেন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের (আইএনএ) কর্নেল আবিদ হাসান সাফরানি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জনগণ মন -এর অনুকরনে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে হিন্দুস্তানি ভাষায় “শুভ সুখ চৈন” নামে গানটি রচনা করেন। তারপর সুভাষ বসু সিঙ্গাপুরে অবস্থিত আইএনএ সম্প্রচার কেন্দ্র ক্যাথে বিল্ডিং-এ গিয়ে ক্যাপ্টেন রাম সিং ঠাকুরিকে গানটিতে একটি যুদ্ধজয়সূচক সুর দিতে বলেন। তারপর এটি “বন্দে মাতরম” এর স্থলাভিষিক্ত হয়ে আজাদ হিন্দ সরকারের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গৃহীত হয় এবং সব সভায় গাওয়া হতো। সুভাষচন্দ্র বসুর প্রস্থানের আগের চূড়ান্ত সমাবেশও গানটি গাওয়া হয়েছিল।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টে ভারত স্বাধীনতা লাভের পর পরদিন সকালে জওহরলাল নেহেরু লালকেল্লার প্রাচীরে ভারতের তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। এই উপলক্ষ্যে ক্যাপ্টেন ঠাকুরীকে তার অর্কেস্ট্রা দলের সদস্যদের সঙ্গে “শুভ সুখ চৈন” এর সুর বাজাতে আমন্ত্রণ জানানো হয়।


স্বাধীনতার পর বন্দেমাতরম গানটি নিয়ে সরকারের অবস্থান

ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার পরে কোন গানটি দেশের জাতীয় সংগীত হিসাবে গ্রহণ করা হবে, তা নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক হয়েছে। দীর্ঘ বিতর্কের পর ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের সংবিধান সভার শেষ অধিবেশনে ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন।

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জনগণমন’ গানটিকে ভারতের দাপ্তরিক ‘জাতীয় সঙ্গীত’ (National Anthem) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
  • স্বাধীনতা আন্দোলনে অনন্য ভূমিকার কারণে ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম দুটি স্তবককে ‘জাতীয় গান’ (National Song) হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয় এবং ঘোষণা করা হয় যে এটি ‘জনগণমন’-এর সমান মর্যাদার অধিকারী হবে।

তবে জাতীয় সঙ্গীতের মতো জাতীয় গান গাওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানে সুনির্দিষ্ট কোনো কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা বা ‘প্রোটোকল’ রাখা হয়নি।


ইতিহাস কেবল গৌরবের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, জাতীয় পরিচয়, এবং স্বাধীনোত্তর ভারতের বহুত্ববাদী রাষ্ট্রগঠনের জটিল প্রশ্ন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু এই জটিল প্রশ্নের সহজ সুন্দর সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের জাতীয় সঙ্গীত “শুভ সুখ চৈন” গানটির মাধ্যমে।

শুভ সুখ চৈন

(আজাদ হিন্দ ফৌজের জাতীয় সঙ্গীত) – বাংলা লিপ্যন্তর:

শুভ সুখ চৈন কী বরখা বরসে, ভারত ভাগ্য হ্যায় জাগা
পাঞ্জাব, সিন্ধ, গুজরাট, মরাঠা, দ্রাবিড়, উৎকল, বঙ্গ
চঞ্চল সাগর, বিন্ধ্য, হিমালয়, নীলা যমুনা গঙ্গা
তেরে নিত গুণ গায়েঁ, তুঝসে জীবন পায়েঁ,
সব তন পায়ে আশা।

সূরজ বনকর জগ পর চমকে, ভারত নাম সুভাগা।
জয় হো! জয় হো! জয় হো!
জয়, জয়, জয়, জয় হো!

সব কে দিল মে প্রীত বসায়ে তেরী মিঠী বাণী,
হর সুবে কে রহনেওয়ালে, হর মজহব কে প্রাণী,
সব ভেদ ঔর ফারক মিটাকে,
সব গোদ মে তেরী আকে,
গুঁথে প্রেম কী মালা।

সূরজ বনকর জগ পর চমকে, ভারত নাম সুভাগা।
জয় হো! জয় হো! জয় হো!
জয়, জয়, জয়, জয় হো!

শুভ সবেরে পঙ্খ-পখেরে, তেরে হী গুণ গায়েঁ,
বাস-ভরী ভরপুর হাওয়ায়েঁ, জীবন মে ঋতু লায়েঁ,
সব মিলকর হিন্দ পুকারে,
জয় আজাদ হিন্দ কে নারে,
প্যারা দেশ হামারা।

সূরজ বনকর জগ পর চমকে, ভারত নাম সুভাগা।
জয় হো! জয় হো! জয় হো!
জয়, জয়, জয়, জয় হো!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *