Headlines

সুস্থ গণতন্ত্র বনাম সংখ্যাগুরুবাদের ঔদ্ধত্য

Healthy Democracy vs. the Arrogance of Majoritarianism

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের যাত্রা শুরু হয়েছিল বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদের এক অনন্য অঙ্গীকার নিয়ে। ভারতের সংবিধানের মূল রচয়িতা ড. বি আর আম্বেদকর গণপরিষদের এক ভাষণে সতর্ক করে বলেছিলেন—“ভারতে যদি সামাজিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের তাসের ঘর ভেঙে পড়তে বেশি সময় লাগবে না।”

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ‘গণতন্ত্র’ শব্দটিকে আমরা সাধারণত জনগণের শাসন হিসেবেই চিনি। কিন্তু কেবল ভোটের সংখ্যা দিয়ে কি একটি সুস্থ গণতন্ত্রকে পরিমাপ করা সম্ভব? বর্তমান বিশ্বে সুস্থ গণতন্ত্র এবং সংখ্যাগুরুবাদের (Majoritarianism) ঔদ্ধত্যের মধ্যকার সংঘাত একটি বড় রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। সংখ্যাগুরুবাদ অনেক সময়ই গণতন্ত্রের মুখোশ পরে আসে, যা সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়া কঠিন। কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই দুটি ধারণা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।


সংখ্যার চেয়ে সম্মতির গুরুত্ব বেশি

একটি সুস্থ গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিনে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি একটি নিয়ত চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে পরমতসহিষ্ণুতা এবং আইনের শাসন শেষ কথা। বিষয়টিকে আরও বিশদভাবে বুঝতে হলে আমাদের কেবল রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর তাকালে চলবে না; এর সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক দিকগুলোও খতিয়ে দেখতে হবে।

ক্ষমতার নৈতিকতা বনাম সংখ্যার আস্ফালন

সুস্থ গণতন্ত্রে ক্ষমতার একটি ‘নৈতিক ভিত্তি’ থাকে। ফরাসি দার্শনিক রঁসো (Rousseau) ক্ষমতার এই রূপকে ‘জনগণের সাধারণ ইচ্ছা’ (General Will) বলেছিলেন, যা সবার মঙ্গলের কথা ভাবে।

  • গণতন্ত্রের দর্শন: এখানে ক্ষমতা হলো একটি আমানত বা দায়িত্ব। সরকার যখন কোনো নীতি নির্ধারণ করে, তখন তারা ভাবেন—”এই নিয়মে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির কী লাভ বা ক্ষতি হবে?”
  • সংখ্যাগুরুবাদের দর্শন: এখানে ক্ষমতাকে দেখা হয় একটি ‘লাইসেন্স’ বা অধিকার হিসেবে। ভোটের ব্যবধান যদি ৫১% বনাম ৪৯% হয়, তবে সংখ্যাগুরুবাদ ধরে নেয় যে ওই ৫১% ভোট পাওয়ার কারণে বাকি ৪৯% মানুষের ওপর যেকোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বৈধতা তারা পেয়ে গেছে। একেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বলা হয় “Tyranney of the Majority” বা সংখ্যাগুরুর স্বৈরাচার।

সংখ্যাগুরুবাদের ঔদ্ধত্য

সংখ্যাগুরুবাদ হলো এমন একটি রাজনৈতিক মানসিকতা, যা বিশ্বাস করে—যেহেতু একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দল সংখ্যায় বেশি, তাই রাষ্ট্রের ওপর কেবল তাদেরই একচ্ছত্র অধিকার রয়েছে। যখন এই মানসিকতা ‘ঔদ্ধত্যে’ রূপ নেয়, তখন তা গণতন্ত্রের কাঠামোটিকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।

সংখ্যাগুরুবাদের ঔদ্ধত্য কোনো সামরিক অভ্যুত্থানের মতো এক রাতে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে না। এটি অত্যন্ত ধীর গতিতে, গণতান্ত্রিক পথেই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে। এই প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে ঘটে:

  • বিচার বিভাগের মেরুদণ্ড ভাঙা: সুস্থ গণতন্ত্রে বিচার বিভাগ হলো সংবিধানের অভিভাবক। কিন্তু সংখ্যাগুরুবাদী শাসকেরা আইন ও আদালতকে এমনভাবে পুনর্গঠন করে (যেমন—নিজেদের অনুগত বিচারক নিয়োগ), যাতে সরকারের যেকোনো অসাংবিধানিক সিদ্ধান্তকে আদালত আইনি বৈধতা দিতে বাধ্য হয়।
  • আমলাতন্ত্রের রাজনৈতিকীকরণ: পুলিশ ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে দেশের সেবকের পরিবর্তে “শাসক দলের ক্যাডার” হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। ফলে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা উঠে যায়।
  • গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ (চতুর্থ স্তম্ভের পতন): সুস্থ গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় ‘ওয়াচডগ’ (Watchdog) বা পাহারাদার। কিন্তু সংখ্যাগুরুবাদের যুগে কর্পোরেট চাপ বা আইনি ভীতি প্রদর্শন করে গণমাধ্যমকে ‘ল্যাপডগ’ (Lapdog) বা পোষা প্রাণীতে পরিণত করা হয়, যারা কেবল শাসকের গুণগান গায়।

‘আমরা’ বনাম ‘ওরা’ তত্ত্ব (Identity Politics)

সংখ্যাগুরুবাদের ঔদ্ধত্য টিকে থাকে সমাজে একটি কৃত্রিম বিভাজন ও শত্রু তৈরির মাধ্যমে। তারা সমাজকে দুটি ভাগে ভাগ করে ফেলে:

[ আমরা (The “True” Citizens) ] <====== (সংঘাত) ======> [ ওরা (The “Others” / Enemies) ]

  • ভয়ের রাজনীতি: সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিয়ত বোঝানো হয় যে তারা বিপদে আছে, তাদের সংস্কৃতি ও অধিকার হুমকির মুখে। আর এই “বিপদ” থেকে বাঁচতে হলে তাদের একতাবদ্ধ হয়ে একজন শক্তিশালী, উগ্র নেতাকে অন্ধভাবে সমর্থন করতে হবে।
  • অপরীকরণ (Otherization): ভিন্ন ধর্ম, জাতি বা মতাদর্শের মানুষকে ‘বহিরাগত’ বা ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ হয়। এর ফলে সমাজে এক ধরণের স্থায়ী মেরুকরণ বা ঘৃণা তৈরি হয়, যা সুস্থ সামাজিক সম্প্রীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।

সংস্কৃতির আধিপত্যবাদ (Cultural Hegemony)

একটি সুস্থ গণতন্ত্র বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে লালন করে। একটি বাগানে যেমন নানা রঙের ফুল থাকে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও তেমনি বিভিন্ন ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস ও উৎসবের সহাবস্থান থাকে।

কিন্তু সংখ্যাগুরুবাদের ঔদ্ধত্য যখন বাড়ে, তখন তারা “এক দেশ, এক সংস্কৃতি, এক ভাষা”—এই ধরণের এককেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা চাপিয়ে দিতে চায়। সংখ্যালঘুদের নিজস্ব সংস্কৃতি বা ধর্মীয় রীতিনীতিকে তখন ‘মূলধারার বিরোধী’ বা ‘উস্কানিমূলক’ বলে প্রচার করা হয়। জোরপূর্বক এই সাংস্কৃতিক একীকরণ আসলে একটি বহুত্ববাদী দেশের বৈচিত্র্যকে হত্যা করে।

ক্রনি ক্যাপিটালিজম বা ঘনিষ্ঠ পুঁজিবাদ

সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতির পেছনে সাধারণত একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক চক্র কাজ করে। সাধারণ মানুষের আবেগ (ধর্ম বা জাতীয়তাবাদ) ব্যবহার করে যখন একটি দল বা গোষ্ঠী একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করে, তখন তারা দেশের বড় বড় কর্পোরেট হাউস বা ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুবিধা দেয়। এর বিনিময়ে সেই ব্যবসায়ীরা দলটির নির্বাচনী ফান্ডের জোগান দেয় এবং তাদের অনুগত মিডিয়া চালাতে সাহায্য করে।

এর ফলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার খর্ব হয়, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য আকাশচুম্বী হয়, কিন্তু সংখ্যাগুরুত্বের আবেগে বুঁদ হয়ে থাকা জনতা সেই অর্থনৈতিক শোষণ টের পায় না।


ভারতের প্রেক্ষাপটে সংখ্যাগুরুবাদের নির্দিষ্ট কিছু রূপ প্রকাশ পাচ্ছে

ভারতের বাস্তবতায় সংখ্যাগুরুবাদের ঔদ্ধত্য কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি সামাজিক স্তরেও নেমে এসেছে:

বৈচিত্র্যের ওপর আঘাত: ভারত কোনো একক জাতি, ধর্ম বা ভাষার দেশ নয়। এটি বহু সংস্কৃতির এক ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। কিন্তু সংখ্যাগুরুবাদের ঔদ্ধত্যের কারণে প্রায়শই “এক দেশ, এক ভাষা” (যেমন হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা) কিংবা একক ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রবণতা দেখা যায়, যা তামিলনাড়ু, কেরল, পশ্চিমবঙ্গ বা উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর আঞ্চলিক ও ভাষাগত আত্মপরিচয়কে সংঘাতের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

ধর্মীয় মেরুকরণ: সুস্থ গণতন্ত্রে ধর্ম একটি ব্যক্তিগত বিষয় এবং রাষ্ট্রের চোখে সব ধর্ম সমান (সর্বধর্ম সমভাব)। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিতে এখন নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্মীয় মেরুকরণ। বহুত্ববাদের জায়গায় স্থান করে নিচ্ছে “বহুসংখ্যক বনাম সংখ্যালঘু” (Majoritarian vs Minoritarian) এক স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন।

বিচার বিভাগের ভূমিকা: সুপ্রিম কোর্ট ভারতের সংবিধানের মূল অভিভাবক। অতীতে বহু ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে আদালত নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার রাশ টেনে ধরেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সংখ্যাগুরুত্বের রাজনৈতিক আবহাওয়ার কারণে বিচার বিভাগের অনেক সিদ্ধান্তে এক ধরণের দ্বিধা বা আপসকামিতা লক্ষ্য করা গেছে, যা আইনের শাসনের ধারণাকে দুর্বল করে।

তদন্তকারী সংস্থার রাজনৈতিক ব্যবহার: ইডি (ED), সিবিআই (CBI)-এর মতো স্বাধীন কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোকে সুস্থ গণতন্ত্রে অপরাধ দমনের কাজে ব্যবহার করার কথা। কিন্তু ভারতের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এগুলো বিরোধী দলের নেতাদের কণ্ঠরোধ করার এবং রাজনৈতিক সমীকরণ মেলানোর প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে বলে প্রায়শই অভিযোগ উঠছে।

‘গোদি মিডিয়া’ বা মূলধারার গণমাধ্যমের পতন: ভারতের মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশ আজ শাসকের সমালোচকের ভূমিকা ছেড়ে তাদের প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়েছে। ভিন্নমত পোষণকারী সাংবাদিক বা সমাজকর্মীদের ‘দেশবিরোধী’ বা ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’ তকমা দিয়ে জনসমক্ষে খলনায়ক বানানোর এক ভয়ংকর সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

বুলডোজার জাস্টিস (Bulldozer Justice): কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা আদালতের রায় ছাড়াই কেবল প্রশাসনিক নির্দেশে অভিযুক্তের (যার বড় অংশই সংখ্যালঘু বা দরিদ্র) বাড়ি-ঘর ভেঙে দেওয়ার এক নতুন সংস্কৃতি ভারতে শুরু হয়েছে। এটি আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিকে (Due Process of Law) সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সংখ্যাগুরু জনতার হাততালির জন্য করা এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক ঔদ্ধত্য।

মব লিঞ্চিং বা গণপিটুনি: গো-রক্ষা বা অন্য কোনো ধর্মীয় গুজবের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশ্য রাস্তায় পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলার মতো ঘটনা ভারতের মতো সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে সংখ্যাগুরুবাদী মানসিকতার চরম অবক্ষয়কে নির্দেশ করে।

ইতিহাসের পুনর্লিখন: পাঠ্যপুস্তক থেকে মুঘল আমল বা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নির্দিষ্ট কিছু ধর্মনিরপেক্ষ অধ্যায় বাদ দিয়ে, ইতিহাসকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় চশমায় দেখার চেষ্টা চলছে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনোজগতে একপেশে চিন্তাভাবনা ঢুকিয়ে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।


সংকট থেকে উত্তরণের দীর্ঘমেয়াদী উপায়

এই অন্ধকার থেকে বের হয়ে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র ও যুবসমাজকে স্বাধীনভাবে কথা বলতে হবে। দলদাসের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস দেখাতে হবে। একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তা পরিমাপ করা হয় সেই রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল ও সংখ্যালঘু নাগরিকটি কতটা নিরাপদে এবং সম্মানের সাথে তার অধিকার ভোগ করছে, তার ওপর ভিত্তি করে। স্কুল-কলেজ থেকেই তরুণ প্রজন্মকে শেখাতে হবে যে, গণতন্ত্র মানে কেবল বিজয়ী দলের স্লোগান দেওয়া নয়; গণতন্ত্র মানে পরাজিত পক্ষের বা ভিন্নমতের মানুষের কথা মন দিয়ে শোনার ধৈর্য ও উদারতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *