logo
DONATE NOW
Powered By Cashfree logo
logo
DONATE NOW
Powered By Cashfree logo
বাংলা ও বাঙালি

সরকারের টাকায় মন্দির তৈরি সংবিধান বিরোধী – হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা।

ভারতীয় সংবিধানের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এই নীতির অর্থ ধর্মহীনতা বা ধর্মীয় অনুশীলনের বিরোধিতা নয়; বরং এটি রাষ্ট্রকে প্রতিটি ধর্মবিশ্বাসের বিষয়ে নীতিগত সমদূরত্ব (principled distance) ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। সংবিধানের ১৪, ১৫, ২৫, ২৭ এবং ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করতে পারে না, কোনো বিশেষ ধর্মের প্রচার বা পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারে না, এবং কোনো ধর্মীয় কার্যক্রমের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করতে পারে না। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ধারাবাহিক কিছু প্রশাসনিক পদক্ষেপ সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার এই মূল চেতনাকে গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

বিগত কয়েক বছরে রাজ্যে সরকারি জমি ও অর্থ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিকাঠামো নির্মাণের একাধিক দৃষ্টান্ত সামনে এসেছে। রাজ্য সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থা ইসকন-কে ৭০০ একর কর-মুক্ত জমি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করেছে এবং সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী ‘মিয়াপুর’ গ্রামটির নাম পরিবর্তন করে ‘মায়াপুর’ করা হয়েছে। একইভাবে, রাজ্যীয় কোষাগার থেকে আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় করে দিঘায় সরকারি জমির ওপর জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে সরকারি সহায়তায় প্রচার ও ধর্মীয় শোভাযাত্রার আয়োজন দেখা গেছে। শুধু তা-ই নয়, সার্বজনীন রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজ্যের প্রায় এক কোটিরও বেশি পরিবারে সরকারি কর্মকর্তা ও সম্পদ ব্যবহার করে ‘জগন্নাথদেবের মহাপ্রসাদ’ ও ছবিযুক্ত কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, কলকাতার নিউটাউনে ২৬২ কোটি টাকা আনুমানিক ব্যয়ে ‘দুর্গাঙ্গন’ এবং শিলিগুড়ির মাটিগাড়ায় শতকোটিক টাকার ‘মহাকাল মন্দির’ নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, নিউটাউন ও মাটিগাড়ার এই জমিগুলো মূলত শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ ও সংরক্ষিত ছিল—কোনো ধর্মীয় ব্যবহারের জন্য নয়।

বিপরীতক্রমে, অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে নীতিগত সমদূরত্বের এই রূপ দেখা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, দিঘায় ভ্রমণরত মুসলিমদের জন্য একটি মসজিদের দীর্ঘদিনের দাবির ক্ষেত্রে, যেখানে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায় নিজস্ব অর্থায়নে দীর্ঘমেয়াদি লিজে জমি চেয়েছে, সেখানেও সরকার কোনো জমি সংস্থান করেনি। অন্যদিকে, দুর্গোৎসব উপলক্ষ্যে সরকারি অর্থায়নের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৮ সালে যেখানে প্রতি পুজো কমিটিকে ১০,০০০ টাকা অনুদান এবং বিদ্যুতের বিলে ২৫ শতাংশ ছাড় দিয়ে সূচনা হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে কমিটি পিছু ১, লক্ষ ১০ হাজার টাকা এবং বিদ্যুতের বিলে ৮০ শতাংশ ছাড়। ২০২৪ সালেই রাজ্যের ৪৩,০০০-এর বেশি দুর্গা পূজা কমিটিকে এই সরকারি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, যার মোট পরিমাণ শত কোটি টাকার ওপর। অথচ অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসব পালনে এরূপ অনুদানের সমতুল্য ব্যবস্থা দেখা যায় না।

আইনি ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে, শিল্প ও কর্মসংস্থানের জন্য নির্ধারিত জমিকে ধর্মীয় অবকাঠামোয় রূপান্তর করা এবং নির্দিষ্ট একটি ধর্মের উপাসনার জন্য প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করা সংবিধানের ১৪, ১৫ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। রাষ্ট্র নাগরিকদের করের টাকার ট্রাস্টি বা রক্ষকমাত্র। করদাতাদের অর্থ নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের পেছনে ব্যয় করা জনআস্থা ও বিবেকের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানে, কারণ এটি ভিন্নধর্মী বা অ-বিশ্বাসী নাগরিকদের অপ্রত্যক্ষভাবে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় চর্চাকে অর্থায়ন করতে বাধ্য করে।

সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়শই এসব উদ্যোগকে ‘বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সত্য হলো, বাঙালি সংস্কৃতি কোনো একক ধর্মীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। বাঙালি একটি বৈচিত্র্যময় মিশ্র ও শঙ্কর জাতি। ১৩৫২ সালে সুলতান হাজী শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ যখন প্রথম ‘শাহে বাঙালি’ ও ‘শাহে বাংলা’ উপাধি ধারণ করে সমস্ত নাগরিককে ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করেন, তখন থেকেই এই সংমিশ্রিত পরিচয়ের যাত্রা শুরু। পরবর্তীতে গৌড়ের সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহের রাজত্বকালে কৃত্তিবাসকে বাংলা রামায়ণ রচনার নির্দেশ প্রদান এবং বৃহস্পতি মিশ্রকে সাহিত্য রচনার জন্য সোনার কুণ্ডল, অলঙ্কার ও রত্নহারে ভূষিত করার মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ ঘটেছিল। আজকের পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধেক মানুষের ব্যবহৃত পদবি—যেমন রায়, মজুমদার, হালদার, শিকদার, সমাদ্দার, পোদ্দার, কানুনগো, মল্লিক ইত্যাদি—মধ্যযুগের সুলতানি প্রশাসনিক ব্যবস্থার যৌথ ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে।

সুতরাং, সার্বজনীন সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে সরকারি অর্থ ও প্রশাসনিক শক্তিতে কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মের উপাসনা ও উৎসবকে সমগ্র জাতির ওপর প্রতিফলিত করার চেষ্টা সামাজিক বিভাজন বাড়ায় এবং দীর্ঘকালের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ঝুঁকিতে ফেলে। মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন রায়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রাষ্ট্রকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের সাথে সম্পর্কিত করা বা অগ্রাধিকার দেওয়া সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ। এই সংবিধানবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই স্থানীয় সুধী সমাজ সোচ্চার হয়েছেন এবং কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলাও দায়ের হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনের শাসন ও সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা পুনরুদ্ধারই এখন সময়ের মূল দাবি।


বাংলা এবং বাঙালির জন্য লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের সাহায্য করুন।
আমরা কোনো কোটিপতি বা বড় কোনো কোম্পানি নই – আমাদের পাঠকরাই আমাদের সমর্থন করেন। আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ এবং সাহসী প্রচেষ্টার জন্য অনুদান দিয়ে আমাদের পাশে থাকুন।
We are not billionaires or big companies – our readers support us. Support us by donating to this important and courageous effort.

logo
DONATE NOW
Powered By Cashfree logo