Headlines

বাঙালি কীভাবে একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিতে পরিণত হলো: মধ্যযুগে বাঙালির সামাজিক বিবর্তন।

বাঙালি কীভাবে একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিতে পরিণত হলো

মধ্যযুগে বাঙালির সমাজজীবনে নিঃসন্দেহে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসলামের ব্যাপক প্রসার। ইসলামের এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রাসনকে প্রতিহত করার জন্য হিন্দুদের মধ্যেও বিভিন্ন সংস্কার আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল। নদীয়ায় ১৪৮৬ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তি আন্দোলন এর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু তা সত্ত্বেও বর্তমানে বাঙালি একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিতে পরিণত হয়েছে।

কী কারণে বা কেন, কীভাবে সুদূর আরবের রুক্ষ মরুভূমিতে জন্ম নেওয়া একটা ধর্মমত বাংলার নরম মাটিতে এতখানি প্রভাব বিস্তার করতে পারল যে, বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান হয়ে গেল—এই বিষয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে।


১৮৭২ সালে ব্রিটিশ ভারতে প্রথম জনগণনা করা হয়। এই জনগণনাতেই সর্বপ্রথম জানা যায় যে, গ্রামবাংলায় ইসলামের অনুসারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তখন কলকাতার ভদ্রলোকদের মধ্যে হইচই পড়ে যায়। মুসলমান শাসকরা অত্যাচার করে, ভয় দেখিয়ে, লক্ষ লক্ষ হিন্দুকে জোর করে মুসলমান হতে বাধ্য করেছে—এই মতবাদ তখন বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

কিন্তু পরবর্তীকালে এই মতবাদ অযৌক্তিক এবং অসার বলে পরিত্যক্ত হয়। স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায় —

“মুসলমানের ভারত বিজয় নিপীড়িত দরিদ্রের মুক্তির রূপ নিয়ে দেখা দিয়েছিল। সেই কারণে আমাদের এক-পঞ্চমাংশ লোক মুসলমান হয়ে গেছে। শুধু তরবারির দ্বারা সেটা সম্ভব হয়নি। এটা চরম বাতুলতা বলে পরিগণিত হবে যদি বলা হয় যে এসবই তরবারি ও ধ্বংসের পথে সাধিত হয়েছিল।”

বর্তমানে অনেকেই মনে করেন যে, গোঁড়া ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে বাংলার এক বড় অংশের পিছিয়ে পড়া মানুষ প্রথমে বৌদ্ধ বা জৈন এবং পরে বৌদ্ধ বা জৈন থেকে মুসলমান হয়েছেন।


বাংলার মাটিতে ইসলাম ধর্ম বিস্তারের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বুঝতে গেলে আমাদের ভারতবর্ষের ইতিহাস নিয়ে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করতে হবে।

ভারতবর্ষের ইতিহাসে নন্দবংশের প্রতিষ্ঠাতা মহাপদ্মনন্দ ছিলেন শূদ্র, মৌর্যবংশও ছিল শূদ্র বংশ, সম্রাট মহামতি অশোকও ছিলেন মৌর্য। এ কারণে নন্দ ও মৌর্য আমলে ব্রাহ্মণদের গুরুত্ব কমে যায়। 

মৌর্যযুগে বৌদ্ধ রাজাদের সময় বৈশ্যদের প্রাধান্য বেড়েছিল। বুদ্ধের শিষ্যদের অনেকেই ছিলেন প্রতিষ্ঠিত ধনী ব্যবসায়ী। এর ফলে সেই সময়ের ভারতীয়রা বর্ণাশ্রম ধর্মের বিরোধী হয়ে পড়েছিল। এই সময় ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্র লিখে বর্ণাশ্রম ব্যবস্থাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে উঠেপড়ে লাগলেন।

এরপর এলো গুপ্তযুগ। গুপ্তরাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রাহ্মণদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পদমর্যাদা পুনরায় বৃদ্ধি পেল। গুপ্তযুগকে বলা হয় ভারতের ব্রাহ্মণদের কাছে “স্বর্ণযুগ।” এই গুপ্তযুগেই রচিত হলো বিভিন্ন পুরাণ এবং এইসব পুরাণের মাধ্যমে ব্রাহ্মণরা পুনরায় শুরু করলেন বর্ণাশ্রম ধর্মের প্রচার। এই যুগেই বর্ণাশ্রম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য মহাভারত থেকে গীতাকে পৃথক করে ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা দেওয়া হয়।

সেই সঙ্গে রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ জনগণের ওপর শুরু হলো ব্রাহ্মণ্যবাদী অত্যাচার। বৌদ্ধদের নিষ্কর জমিগুলো কেড়ে নিয়ে ব্রাহ্মণদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। গৌড়ের ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদের কাছ থেকে কর আদায় করত। গুপ্ত যুগেই শঙ্করাচার্য গৌতম বুদ্ধকে বিষ্ণুর নবম অবতার বলে ঘোষণা করে বৌদ্ধ ধর্মকে হিন্দু ধর্মের মধ্যে বিলীন করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

বিভিন্ন গল্পের জন্ম দিয়ে এলাকার জৈন ও বৌদ্ধ মন্দিরগুলোকে দখল করে নেওয়া হয়। বাংলার বহু শিবমন্দিরে লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, ওইসব শৈবক্ষেত্রগুলোতে পীঠরক্ষক হয়ে পাহারা দিচ্ছেন “ভৈরব মূর্তি।” এই ভৈরব মূর্তিগুলো আসলে বুদ্ধ, মহাবীর বা কোনো বৌদ্ধ অথবা জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তি। এ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার, এসব শিবমন্দির আদিতে কোনো জৈন বা বৌদ্ধ মন্দির ছিল। পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণরা এগুলোকে দখল করে শিবমন্দিরে রূপান্তরিত করেছেন।

পুরীর জগন্নাথ মন্দির, ভুবনেশ্বরের ভাস্করেশ্বর মন্দির বা তমলুকের বর্গভীমা মন্দির বৌদ্ধ মঠকে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত করার অন্যতম উদাহরণ।

আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন —

“বৌদ্ধবিহারের নাম শুনিলে হিন্দুগণ কানে আঙুল দিতেন, এই পাপ নাম উচ্চারণ করিতে নাই – শিশুরা এই শিক্ষা পাইয়াছিল।” বৌদ্ধপ্রধান গ্রামের “পার্শ্ববর্ত্তী গ্রামবাসিগণ কখনও ভোরের বেলায় সেই গ্রামের নাম লয় না, পূবের গ্রাম কি পশ্চিমের গ্রাম ইত্যাদি বলিয়া দরকার হইলে ইহার উল্লেখ করিয়া থাকে।”

“হিন্দুদেবতার অনেকগুলিই বৌদ্ধতন্ত্র হইতে গৃহীত। ‘তারা’ দেবীর উৎপত্তি বৌদ্ধ ধর্ম্ম থেকে, গাছের তলায় ধ্যানরত বুদ্ধই বর্তমানে জটেশ্বর শিব। হিন্দুরা বৌদ্ধ ও ডোম পণ্ডিতদিগের বৃত্তি লোপ করাইয়া তাহাদের হস্ত হইতে দেবমন্দিরের পূজার অধিকার কাড়িয়া লইয়াছিলেন। ডোমাচার্য্যদিগের নাম বৌদ্ধ-সাহিত্যে পরিচিত। যে সকল বৌদ্ধ পুরোহিত তান্ত্রিক অনুষ্ঠান করিয়া অতি হেয় জিনিষ ভক্ষণ করিতেন তাঁহারাই সম্ভবত ‘মেথর’ শ্রেণীতে পরিণত হইয়াছিল। শব্দটি ‘মহোত্তর’ শব্দের অপভ্রংশ বলিয়া মনে হয়।”


সম্রাট শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় শুরু হয় ৪০০ বছরের বৌদ্ধ পাল রাজত্ব। পালযুগে বাংলার রাজধর্ম বৌদ্ধ হলেও উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে এর বিশেষ প্রভাব পড়েনি। কিন্তু নিম্নবর্ণের হাঁড়ি, মুচি, ডোম, বাগদি প্রভৃতি জাতির ওপর প্রবলভাবে বৌদ্ধ প্রভাব পড়েছিল। উচ্চবর্ণের হিন্দুর অত্যাচারে নিম্নবর্ণের এইসব ব্রাত্য মানুষদের দুর্দশার অন্ত ছিল না। তাই ব্রাহ্মণদের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য সমাজের এইসব অন্ত্যজ শ্রেণীর এক বিরাট অংশের মানুষ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। রাজা বৌদ্ধ হওয়ার জন্য ব্রাহ্মণরা এই সময় বৌদ্ধদের উপর অত্যাচার করতে পারত না।

কিন্তু পালযুগ শেষ হয়ে সেন রাজত্বের সময় আবার যখন ব্রাহ্মণ্যধর্ম রাজধর্মরূপে দেখা দিল, তখন উচ্চবর্ণের হিন্দু ব্রাহ্মণরা পুনরায় সমাজের ব্রাত্যজনদের ওপর অত্যাচার শুরু করে দিল। দান-দক্ষিণা ঠিকমতো দিতে না পারলে ব্রাহ্মণরা এদের শাপ-শাপান্ত করত, ব্রাহ্মণের ছায়া মাড়ানোর অধিকার পর্যন্ত ছিল না তাদের।

ব্রাহ্মণদের একতরফা অত্যাচারে হাঁড়ি-মুচি-ডোম-বাগদিদের মতো সমাজের ব্রাত্য জনগোষ্ঠীর মানুষেরা সব সময় অপমানের ভয়ে আতঙ্কে থাকত। এই অবস্থা থেকে রেহাই পাবার পথ খুঁজতে লাগল তারা। এ সময় বাংলায় মুসলমান আগমন তাদের সামনে মুক্তির সুযোগ এনে দিল।

বাংলার মাটিতে যখন ব্রাহ্মণ্যবাদী অত্যাচার-নির্যাতন চরম আকার ধারণ করল, তখন বাঙালি বৌদ্ধদের একটা অংশ নেপালে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। অনেকেই নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করে বর্ণপ্রথার সর্বনিম্নে স্থান পায়। বৌদ্ধদের আরেকটি অংশ দিল্লির মুসলিম শাসক কুতুবউদ্দিন আইবকের শরণাপন্ন হয় এবং বৌদ্ধদের রক্ষায় বাংলায় মুসলিম সেনাবাহিনী পাঠানোর জন্য অনুরোধ করে; আর একদল ভিক্ষু মির্জাপুরে গিয়ে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির সাথে দেখা করে তাকে মগধকে মুক্ত করতে অনুরোধ করেন। বিখ্যাত তিব্বতি ঐতিহাসিক লামা তারানাথের রচিত ‘ভারতে বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস’ নামক গ্রন্থে এর উল্লেখ আছে।

বখতিয়ার খলজির নদীয়া বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় ইসলামের আগমন ঘটে। যদিও প্রাচীনকাল থেকে আরব দেশের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। আরবে যখন ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয় হয়, তখন অনেক মুসলমান ফকির-দরবেশ আরব বণিকদের সঙ্গে বাংলাতে আসেন ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য। অধুনা বাংলাদেশের লালমনিরহাটের প্রাচীন মসজিদটি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবদ্দশাতেই তৈরি হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। কিন্তু বখতিয়ারের বাংলা জয়ের পরেই ইসলামের প্রসার বৃদ্ধি পায়।

সমাজের অবহেলিত ব্রাত্যজনেরা বাংলায় ইসলামের আগমনকে ভেবে নিলেন তাদের “মুক্তিদূত” হিসেবে। তারা ভাবল, মুসলমানের ছদ্মবেশে স্বয়ং ধর্মঠাকুর এসেছেন তাঁর ভক্তদের রক্ষা করতে।

এই সময়ে রামাই পণ্ডিতের লেখা “নিরঞ্জনের রুষ্মা” কবিতায় তার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই—

“জাজপুর পুরবাদি
সোলসয় ঘর বেদি
বেদি লয় কর লয় দুন।

দক্ষিণা মাগিতে যায়
যার ঘরে নাহি পায়
শাঁপ দিয়া পোড়ায় ভুবন।।

মালদহে লাগে কর
না চিনে আপন পর
জালের নাইর দিশ পাস।

বোলিষ্ঠ হইল বড়
দশ বিশ হইয়া জোড়
সধর্ম্মীকে কর-এ বিনাশ। ।

বেদে করে উচ্চারণ
বের্যায় অগ্নি ঘনে ঘন
দেখিয়া সভাই কম্ফমান।

মনেতে পাইয়া মর্ম্ম
সবে বলে রাখ ধর্ম্ম
তোমা বিনে কে করে পরিত্রাণ।।

এইরূপে দ্বিজগণ
করে ছিষ্টি সংহারণ
এ বড় হইল অবিচার।

বৈকুণ্ঠে থাকিয়া ধর্ম্ম
মনেতে পাইয়া মর্ম্ম
মায়াতে হইল অন্ধকার।।

ধর্ম্ম হইল यবনরূপী
মাথায়িতে কাল টুপি
হাতে শোভে তীরুচ কামান।

চাপিয়া উত্তম হয়
ত্রিভুবনে লাগে ভয়
খোদার বলিয়া এক নাম।।

নিরঞ্জন নিরাকার
হইল্য ভেস্ত অবতার
মুখেতে বলেন দম্মাদার।

যতেক দেবতাগণ
সবে হয়্যা একমন
আনন্দেতে পরিল ইজার।।

ব্রহ্মা হইলা মহাম্মদ
বিষ্ণু হইলা পেগাম্বর
আদম্ফ হইল শূলপাণি।

গণেশ হইল গাজী
কার্ত্তিক হইল কাজী
ফকির হইল যতমুনি।।

তেজিয়া আপন ভেক
নারদ হইল্য সেক
পুরন্দর হইল্য মৌলানা।

চন্দ্র সূর্য আদি দেবে
পদাতিক হয়্যা সবে
সবে মিলি বাজায় বাজনা।।

আপুনি চণ্ডিকাদেবী
তিঁহ হইল্যা হায়া বিবি
পদ্মাবতী হইল বিবি নূর।

যতেক দেবতাগণ
হয়্যা সবে একমন
প্রবেশ করিল জাজপুর।।

দেউল দেহারা ভাঙ্গে
কড়া কিড়্যা খায় রঙ্গে
পাখড় পাখড় বলে বোল।

ধরিয়া ধর্ম্মের পায়
রামাই পণ্ডিত গায়
ই বড় বিষম গণ্ডগোল।।”

এভাবে মুসলমান শাসন বাংলার অন্ত্যজ শ্রেণীকে ব্রাহ্মণ্য নির্যাতন এবং সামাজিক অপমানের হাত থেকে নিষ্কৃতির সুযোগ দিল। সেন যুগে সমুদ্রযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার ফলে যে সব মৎস্যজীবীরা সাগরে যেতে পারছিল না তারাও খুশি হলো। ব্রাহ্মণ্য বর্ণাশ্রমী সমাজে যে সব অস্পৃশ্য লোকেরা এত দিন মানুষের সম্মান পায়নি, ইসলাম তাদের সামনে আশার আলো নিয়ে এল। দলে দলে তারা মুসলমান হয়ে যেতে লাগল।


সেন আমলে রাজকার্যে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের কোনো স্থান ছিল না। মুসলমান শাসনে জাত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সরকারি চাকরিতে সুযোগ দেওয়া হতো, নিম্নবর্ণের হিন্দুদের উঁচু উঁচু পদে নিয়োগ করা হতো। ইসলামের এই উদারতায় মুগ্ধ হয়ে অনেক নিম্নবর্ণের মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল।

ব্রাহ্মণ্যবাদী অত্যাচার, নিম্নবর্ণের হিন্দু ও বৌদ্ধদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের অন্যতম কারণ ছিল; কিন্তু একমাত্র কারণ ছিল না। অনেক উচ্চবর্ণের মানুষও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা ইসলাম ধর্মপ্রচারকদের ব্যক্তিগত চরিত্র ও ধর্মনিষ্ঠা মানুষের মনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে আসা এইসব পীর-ফকিরদের অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে বলে মানুষ বিশ্বাস করত। সম্ভবত তাদের চিকিৎসা বিদ্যায় পারদর্শিতার কারণে এমনটা হয়েছিল।

হিন্দু-বৌদ্ধ যুগে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা বিদ্যার সুফল সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে ছিল; বৈদ্যরা কেবল উচ্চবর্ণের এবং অভিজাত শ্রেণীর লোকেদেরই চিকিৎসা করত। অসুস্থ হলে সাধারণ মানুষের জন্য তুকতাক, মন্ত্রতন্ত্র, ঝাড়ফুঁকই একমাত্র উপায় ছিল। সুদূর মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে ধর্মপ্রচার করতে আসা মুসলমান সুফি-দরবেশরা আরবীয় চিকিৎসা পদ্ধতিতে পারদর্শী ছিলেন। তারা নদীর তীরে লোকালয়ের কাছে আস্তানা গেড়ে বসতেন, ধর্মোপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চিকিৎসা করতেন। ফলে নিম্নবর্ণের দরিদ্র মানুষ দলে দলে তাদের আস্তানায় ভিড় জমাতে থাকে, অনেকেই তাদের মুরিদ (শিষ্য) হয়ে যায়।

মার্কিন গবেষক রিচার্ড ইটনের মতে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত মুসলমান ধর্মপ্রচারকরা স্থানীয় মানুষদের দারিদ্র্য দূর করার জন্য জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে চাষবাস করতে উৎসাহ দিতেন। কিন্তু দক্ষিণবঙ্গে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় জঙ্গল কেটে লোনা জমিকে চাষযোগ্য করা সহজ কাজ ছিল না। মুসলমান ধর্মপ্রচারকরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে সুলতানদের কাছ থেকে বড় বড় এলাকা পাত্তানি (পাট্টা) নিয়ে, শিষ্যদের দ্বারা জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করিয়ে চাষযোগ্য জমিতে পরিণত করেন। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় চাষবাস হতে থাকে। এই সব জমিতে কৃষি কাজে যুক্ত হওয়ার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন এসে ভিড় করতে থাকে। পরে তারা অনেকেই মুসলমান হয়ে যায়।

দাস-দাসী ক্রয়-বিক্রয় ভারতে প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে স্ট্রাবো লিখেছেন,

“ভারতবর্ষে যে সকল কুমারীর পিতামাতা দারিদ্র্য-নিবন্ধন তাহাদিগকে যোগ্যবরের সঙ্গে বিবাহ দিতে অসমর্থ, তাঁহারা সদ্যোযৌবন-প্রাপ্ত কন্যাদিগকে বিবাহার্থে বাজারে আনিয়া বিক্রয় করিয়া থাকেন।”

—এই প্রথা মধ্যযুগে বাংলাতেও প্রচলিত ছিল। সেদিন পর্যন্তও বৈষ্ণবেরা রামকেলি, নবদ্বীপ প্রভৃতি স্থানে ভিক্ষুণীদিগকে বাজারে বিক্রয় করত। সাধারণত এইরূপ মেয়েদের এক একজনের মূল্য ছিল ১/০ (পাঁচ সিকে)। 

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে কবি দাশরথি এই প্রথাকে বিদ্রূপ করিয়া লিখেছেন:—

“গোসাক্রীকে পাঁচ সিকে দিয়ে, ছেলে শুদ্ধ করেন বিয়ে, জাত্যংশে কুলীন বড় নেতা।”

ভাগ্যান্বেষণে আসা বিদেশি মুসলমান সৈন্য এবং ব্যবসায়ীরা এইসব কন্যাদের ক্রয় করে বিবাহ করে বাংলাতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে। ক্রমে ক্রমে এদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়।


এছাড়া বিশুদ্ধ ধর্মীয় আদর্শগত কারণেও অনেক মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। মধ্যযুগে পূর্ব থেকে প্রচলিত অন্যান্য ধর্মমতের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা বাংলার মাটিতে স্থায়ীভাবে ইসলাম ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছিল।

মধ্যযুগ ছিল হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের অবক্ষয়ের যুগ। তখন বঙ্গীয় হিন্দু সমাজে যে সব সম্প্রদায়ের প্রভাব ছিল, তার মধ্যে শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণব প্রধান। এই তিনটি প্রধান সম্প্রদায় ছাড়াও সৌর, গাণপত্য, পাশুপত, পাঞ্চরাত্র, কাপালিক, কৌল প্রভৃতি বহু সম্প্রদায় বিদ্যমান ছিল। এইসব সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ-কলহ লেগেই থাকত।

আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন —

“শাক্ত ও বৈষ্ণবের দ্বন্দ্ব যে কি ভীষণ, তাহা আসামে যেরূপ দৃষ্ট হয়, বৃহৎ বাংলার অন্য কোন প্রদেশে সেরূপ দেখা যায় নাই।

চৈতন্য-চরিতামৃতে দেখা যায়, নবদ্বীপে শ্রীবাসের বাড়ীতে কোন লোক চন্দন ও সিন্দুরলিপ্ত বিল্বপত্র ও চণ্ডীপূজার ফুল রাখিয়া গিয়াছিল, এজন্য বৈষ্ণবদের সে কি ক্রোধ! এই অপরাধে সেই ব্যক্তি নাকি কুষ্ঠগ্রস্ত হইয়াছিল!

নরোত্তম-বিলাসে দৃষ্ট হয়, শাক্তেরা বৈষ্ণব-গুরু নরোত্তমের মৃত্যু হইলে, তাঁহার শবের পশ্চাৎ পশ্চাৎ হাততালি দিয়া ঠাট্টা-করিতে করিতে গিয়াছিল (নরোত্তম-বিলাস দ্রষ্টব্য)।

 বৈষ্ণবেরা কালীর নাম করিত না, এজন্য দোয়াতের কালিকে ‘সেহাই’ বলিত। শক্তিপূজার উপকরণের নাম করিতে নাই, এজন্য জবা পুষ্পকে “ওড় ফুল” বলিত, “কাটা” কথা তাহাদের অভিধানে নিষিদ্ধ, এজন্য তরকারী কোটাকে “বানান” বলিত।

কিন্তু আসামের শাক্ত-বৈষ্ণবের দ্বন্দ্বের কাছে উহা কিছুই নহে। দুর্গাপ্রতিমাকে প্রণাম না করাতে শঙ্কর-শিষ্য নারায়ণের দক্ষিণ হস্ত রাজা নরনারায়ণের আদেশে ভৃত্যেরা ডাঙ্গিয়া ফেলিয়াছিল, এবং এই নারায়ণ দাস ও অপর শিষ্য গোকুল দাসের উপর রাজার আদেশ হইল, ইহাতেও যদি তাঁহারা দেবীকে প্রণাম না করেন, তবে তাঁহারা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। এইরূপ ভীষণ অত্যাচারের ফলে নিরীহ বৈষ্ণবেরা শেষে মরিয়া হইয়া শিখদের মত বিদ্রোহী হইয়া উঠিয়াছিলেন, তাঁহারা জপমালা ফেলিয়া দিয়া খড়গ-হস্ত হইয়া রাজা লক্ষ্মীসিংহকে হত্যা করিয়াছিলেন (১৭৮০ খৃঃ), আসামে বৈষ্ণববাহিনী দুর্দ্ধর্ষ হইয়া সিংহাসন অধিকার করিয়া বসিয়াছিলেন।”


প্রত্যেক সম্প্রদায়েরই আলাদা আলাদা আচার-আচরণ এবং পূজাপার্বণ পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। এই সব সম্প্রদায়ের অনেক প্রথা ও ব্যবস্থা বর্তমান যুগের দৃষ্টিতে আপত্তিজনক ও অশ্লীল বলে মনে হবে।

উদাহরণস্বরূপ সেই সময় প্রচলিত দুর্গাপূজা সংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে শবরোৎসবের কথা বলা যায়। 

ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন —

“শারদীয় দুর্গাপূজার সময় দশমী তিথিতে শবরোৎসব নামে একটি নৃত্যগীতোৎসব প্রচলিত ছিল। গ্রামে নগরে এই উৎসবে নরনারীর দল কর্দমলিপ্ত এবং বৃক্ষপত্রমাত্র পরিহিত ও অর্ধ উলঙ্গ হইয়া নানাপ্রকার যৌনক্রিয়াগত অঙ্গভঙ্গী করিয়া এবং তদ্বিষয়ক গান গাহিয়া উম্মত্ত নৃত্যে মাতিত, তাহা না করিলে নাকি দেবী ভগবতী রুষ্ট হইতেন, সমসাময়িক কালবিবেক-গ্রন্থ এবং প্রায় সমসাময়িক বা কিছু পরবর্তী কালিকাপূরাণে তাহা উল্লেখ করা হইয়াছে। বৃহদ্ধর্মপূরাণে এই সম্বন্ধে একটু বিধিনিষেধ বর্ণনা আছে, কিন্তু তাহা শক্তি-উপাসক বা উপাসিকার পক্ষে প্রযোজ্য নয়। তাঁহারা এইরুপ করিলে নাকি দেবীর সুখ উৎপাদিত হইত। …. বসন্তে হোলক (হোলী) এবং চৈত্র মাসে কাম-মহোৎসবেও প্রায় অনুরূপ অনুষ্ঠান প্রচলিত ছিল। কালবিবেক-গ্রন্থে বলা হইয়াছে, কামমহোৎসবে নানাপ্রকার যৌন অঙ্গভঙ্গী এবং জুগুন্সিতোক্তি করিয়া নৃত্যগীত করিলে কামদেবতা প্রীত হন, এবং তাহার ফলে ধনেপুত্রে লক্ষ্মী লাভ হয়। ইহাই বুঝি ছিল সমসাময়িক কালের বিবেক।”

মধ্যযুগে কয়েকটি তান্ত্রিক সাধন প্রণালীর কথা জানতে পারা যায়। সাধারণত তান্ত্রিক সম্প্রদায় শাক্ত বলে গণ্য হলেও তান্ত্রিক শৈব, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ও ছিল। কেউ এই সম্প্রদায়ে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক হলে তাকে ওই সম্প্রদায়ভুক্ত একজনের কাছে দীক্ষা নিতে হতো এবং দিনের বেলা নানারকম অনুষ্ঠানের পর ঘোষণা করতে হতো যে সে পূর্বের ধর্মসংস্কার সমস্ত পরিত্যাগ করল এবং এর প্রমাণস্বরূপ তার বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ ক্রিয়া সম্পন্ন হতো। রাত্রিবেলা গুরু ও শিষ্য আটজন বামাচারী তান্ত্রিক পুরুষ এবং আটটি স্ত্রীলোক (নর্তকী ও তাঁতির কন্যা, গণিকা, ধোপানী, নাপিতের স্ত্রী বা কন্যা, ব্রাহ্মণী, একজন ভূস্বামীর কন্যা ও গোয়ালিনী) সহ একটি অন্ধকার কক্ষে প্রবেশ করত এবং প্রতি পুরুষের পাশে একটি স্ত্রীলোক বসত। গুরু তখন শিষ্যকে নিম্নলিখিত রূপ উপদেশ দিতেন—

‘আজ থেকে লজ্জা-ঘৃণা, শুচি-অশুচি জ্ঞান, জাতিভেদ প্রভৃতি সমস্ত ত্যাগ করবে। মদ্য, মাংস, স্ত্রীসম্ভোগ প্রভৃতি দ্বারা ইন্দ্রিয়বৃত্তি চরিতার্থ করবে, কিন্তু সর্বদা ইষ্ট দেবতা শিবকে স্মরণ করবে এবং মদ্য মাংস প্রভৃতি ব্রহ্মপদে লীন হবার উপাদান স্বরূপ মনে করবে।’

এর পর নানা প্রক্রিয়া ও মন্ত্র পাঠ করার পর সকলেই মদ্য পান ও মাংস ভক্ষণ করত, গোমাংসও বাদ যেত না। মদ্য পান করতে করতে চেলা সম্পূর্ণ বেহুশ হয়ে পড়ত, তখন সে অবধূত সংজ্ঞা পেত এবং তার নতুন নামকরণ হতো। তারপর গুরু ও অন্যান্য সকলে চলে যেত, কেবলমাত্র চেলা ও একটি স্ত্রীলোক থাকত। 

তান্ত্রিকরা আরো অনেক বীভৎস আচরণ করত, যেমন মানুষের মৃতদেহের উপর বসে মড়ার মাথার খুলিতে উলঙ্গ স্ত্রী-পুরুষের একত্র সুরাপান ইত্যাদি।

বৈষ্ণব সহজিয়ারাও এই তান্ত্রিক দর্শনের ভিত্তিতেই পরকীয়া প্রেমের প্রতিষ্ঠা করেছিল। প্রেমের দ্বারা ভগবানকে লাভ করাই তাদের চরম লক্ষ্য। সুতরাং প্রথমে নর-নারীর প্রেমের মধ্য দিয়াই এই প্রেমের স্বরূপ উপলব্ধি করতে হবে। নিজের স্ত্রী অপেক্ষা অন্য নারীর প্রতি আসক্তিই বেশি প্রবল হয়, সুতরাং এটাই এই প্রেমের প্রথম সোপান এবং প্রথমে স্থুল দেহজাত ও নিকৃষ্ট প্রবৃত্তি হলেও ক্রমে এটা ভগবানের প্রতি প্রেমে পরিণত হয়। 

সহজিয়ারা অনেক শাখায় বিভক্ত—যেমন আউল, বাউল, সাঁই, দরবেশ, ন্যাড়া, সহজিয়া প্রভৃতি। ইহা ছাড়া কর্তাভজা, স্পষ্টদায়ক, সখীভাবক, কিশোরী, ভজনী, রামবল্লভী, জগন্মোহিনী, গৌড়বাদী, সাহেবধানী, পাগলনাথী, গোবরাই প্রভৃতি সম্প্রদায়ও অনেক সহজিয়া শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হয়। এই সব বিভিন্ন শাখার সহজিয়াদের ধর্মমত, সামাজিক প্রথা ও সাধন প্রণালীর মধ্যে যথেষ্ট প্রভেদ থাকলেও গুরুবাদ, স্ত্রী-পুরুষের অবাধ মিলন ও পরকীয়া প্রেমের মাহাত্ম্য সকলেই স্বীকার করে।

আশ্চর্যের বিষয়, ১৭১৭ সনে বৈষ্ণব সমাজের তৎকালীন নেতারা আলিবর্দী খাঁর প্রধান কর্মচারীদের মধ্যস্থতায় প্রকাশ্য সভায় বিচার করে স্বকীয়া হতে যে পরকীয়া শ্রেষ্ঠ—এই মত গ্রহণ করেছিলেন, সেই দলিলখানি পাওয়া গিয়েছে (বঙ্গ-সাহিত্য-পরিচয়, দ্বিতীয় খণ্ড ১৬৩৮-৩৯ পৃঃ)।

বৌদ্ধগ্রন্থ কথাবত্থু-তে ‘একাধিপ্পয়ো’ নামক একটি প্রথার উল্লেখ আছে। কোনো স্ত্রী-পুরুষ পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হলে তাদের দৈহিক মিলন হতে পারে।

কর্তাভজা সম্প্রদায় আউলচাঁদ নামক এক সাধু অষ্টাদশ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন। এই সম্প্রদায়ের লোক কর্তা বা গুরুকে সাক্ষাৎ ভগবান বা কৃষ্ণ বলে মনে করত এবং তাকেই ইষ্টদেবতা জ্ঞানে পূজা করত। ক্রমে এই সম্প্রদায়ের খুব সমৃদ্ধি হয় ও ভক্তের সংখ্যা অসম্ভব বৃদ্ধি পায়। এই দলের মধ্যে স্ত্রীলোকের সংখ্যাই ছিল খুব বেশি এবং গোপীরা কৃষ্ণকে যেমন ভাবে কায়মনপ্রাণে ভজন করত এরাও সেইরূপ করত।

কোনো কোনো সম্প্রদায়ের গুরুভক্তি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, বিয়ের পর নববধূকে তার প্রথম রাত্রি গুরুকে উৎসর্গ করতে হতো। কোথাও বা স্থানীয় রাজা, জমিদার বা গ্রামের মোড়ল গুরুর জায়গা দখল করত। এই কুৎসিত প্রথা ‘গুরুপ্রসাদি প্রথা’ নামে পরিচিত ছিল।

মধ্যযুগের প্রথম ভাগে দুর্গাপূজার সময় অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ ও ক্রিয়াদির কথা কালবিবেকে উল্লেখ রয়েছে। মধ্যযুগের শেষ পর্যন্ত এই সব অশ্লীলতা দুর্গাপূজার অঙ্গ ছিল। ব্রিটিশ শাসনে বিদেশী একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ থেকে জানা যায় —

“দিনের পূজা শেষ হইলে ধনী লোকের বাড়ীতে দেবীর মূর্তির সম্মুখে একদল বেশ্যার নৃত্যগীত আরম্ভ হয়। তাহাদের পরিধেয় বস্ত্র এত সূক্ষ্ম যে তাহাকে দেহের আবরণ বলা যায় না। গানগুলি অতিশয় অশ্লীল এবং নৃত্যভঙ্গী অতিশয় কুৎসিত। ইহা কোন ভদ্র সমাজে উচ্চারণ বা বর্ণনার যোগ্য নহে। অথচ দর্শকেরা সকলেই ইহা উপভোগ করেন—কোন রকম লজ্জা বোধ করেন না।”

লেখক ১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় রাজা রাজকৃষ্ণের বাড়িতে এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

পূজায় পাঁঠা ও মহিষ বলি সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন—,

“নদীয়ার বর্তমান মহারাজার পিতা পূজার প্রথম দিন একটি পাঁঠা বলি দেন। তারপর প্রতিদিন পূর্বদিনের দ্বিগুণ সংখ্যা এবং এইরূপে ১৬ দিনে ৩২,৪৪৮ পাঁঠা বলি দেন। বলি শেষ হইলে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে উপস্থিত দর্শকবৃন্দ নিহত পশুর রক্তলিপ্ত কর্দম গায়ে মাখিয়া উন্মত্তের মত নাচিতে আরম্ভ করে এবং তারপর রাস্তায় বাহির হইয়া অশ্লীল গীত ও নৃত্য করিতে করিতে অন্যান্য পূজা-বাড়ীতে গমন করে।”

চৈতন্যভাগবতকার দুঃখের সহিত বলেছেন যে ভক্তিমূলক বৈষ্ণব ধর্ম লোপ পেয়েছে। ধর্মের নামে যা প্রচলিত আছে তা হয় তান্ত্রিক সাধনা অথবা লৌকিক দেবদেবীর পূজা।

এক তান্ত্রিক সাধনার কথা তিনি লিখেছেন —

“রাত্রি করি মন্ত্র পড়ি পঞ্চ কন্যা আনে।
নানাবিধ দ্রব্য আইসে তা সবার সনে॥
ভক্ষ্য ভোজ্য গন্ধমাল্য বিবিধ বসন।
খাইয়া তা সবা সঙ্গে বিবিধ রমন॥ ”

মধ্যযুগে হিন্দু সমাজের এই অধঃপতন সেসময়ে রচিত সাহিত্যেও প্রভাব বিস্তার করেছিল। রাধাকৃষ্ণের প্রেমের মহান আদর্শ চৈতন্যের পূর্বেও এ দেশে প্রচলিত ছিল। কিন্তু তা বহুল পরিমাণে সাত্ত্বিক ভাবশূন্য হয়ে নরনারীর দৈহিক সম্ভোগের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্য সমগ্র ভারতে সমাদর লাভ করেছিল। কিন্তু সাধারণ নরনারীর দৈহিক সম্ভোগের যে বাস্তব চিত্র জয়দেব অঙ্কিত করেছেন, রাধাকৃষ্ণের কামকেলির যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, আজকের দিনে ভদ্রলোক বাঙালি, জনসমক্ষে বা পরিবার-পরিজনের সামনে এ কাব্য পাঠ করতে লজ্জা বোধ করবেন।

চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন সম্বন্ধে একজন বৈষ্ণব সাহিত্যের সমালোচক লিখেছেন যে,

“আদিরসের ছড়াছড়ি থাকায় কাব্যখানি প্রায় পর্নোগ্রাফি (Pornography) পর্যায়ে পড়িয়াছে।” শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের নায়ক কৃষ্ণ বারংবার রাধাকে বলছেন যে তার দেহসম্ভোগের জন্যই তিনি (কৃষ্ণ) পৃথিবীতে অবতার হয়ে জন্মেছেন (অবতার কৈল আহ্মে তোর রতি আসে)। অনেক পণ্ডিতের মতে এই কৃষ্ণকীর্তন চৈতন্যের জন্মের অল্প পূর্বেই রচিত। 

সুতরাং জয়দেব থেকে আরম্ভ করে তিনশত বৎসর রাধাকৃষ্ণের প্রেমের ছদ্ম আবরণে কামের নগ্নরূপ ও পরকীয়া প্রেমের মাহাত্ম্য বৈষ্ণব ধর্মকে কলুষিত করেছিল।


বাংলার সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ ধর্মের নামে এই অশ্লীলতা, অনাচার, ব্যভিচার থেকে মুক্তির পথ খুঁজছিল। এই সময় ইসলামের আগমনে তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত পথ খুঁজে পেয়েছিল। মুসলমান ধর্মগুরু — পীর, ফকিরদের পূত-পবিত্র চরিত্র এবং আধ্যাত্মিকতা বাংলার জনমানসে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। 

স্বয়ং রাজা বল্লাল সেন (মতান্তরে লক্ষণ সেন, সমসাময়িক বা সেক শুভদয়ার বিবরণ অনুযায়ী) মুসলমান সুফি সাধক ‘জালালুদ্দিন তবরিজি’র আধ্যাত্মিকতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তিনি জালালুদ্দিন তবরিজিকে দরগাহ নির্মাণের জন্য এবং দরগাহের বাৎসরিক ব্যয় নির্বাহের জন্য ভূমি দান করেছিলেন। ‘সেক শুভদয়া’তে এর উল্লেখ রয়েছে।

বাংলার সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষদের অনেকেই এই সময় এই সব ফকির দরবেসদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল।


প্রথম যুগের তুর্কি সেনাবাহিনী ও ধর্মান্তরিত নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের নিয়েই বাংলার মুসলমান সমাজ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ক্রমে ক্রমে আরো অনেক শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণীর মুসলমান বাইরের দেশ থেকে বাংলাতে আসেন। সংখ্যায় কম হলেও স্থানীয় ধর্মান্তরিত মুসলমানদের সঙ্গে মিলিত হয়ে তারা বাংলায় একটা উচ্চতর শিক্ষা ও সংস্কৃতির জন্ম দিলেন।

ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে পর্তুগিজ বারবোসা বাংলার প্রধান একটি বন্দরের সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের সম্বন্ধে লিখেছেন —

“মুসলমানেরা পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা সাদা জোব্বা পরে – ইহার তলে-লুঙ্গির মত কোমরে জড়ান কাপড় এবং উপরে কোমরে রেশমের কোমরবন্ধ হইতে রৌপ্যখচিত তরবারি ঝুলান থাকে। হাতে মণিমাণিক্যখচিত অনেকগুলি আংটি এবং মাথায় সূক্ষ্ম তুলার কাপড়ের টুপি। তাহারা খুব বিলাসী – মেয়ে পুরুষ উভয়ই উৎকৃষ্ট খাদ্য ও মদ্যপানে অভ্যস্ত। প্রত্যেকের ৩-৪ বা ততোধিক স্ত্রী। তাহাদের পরণে মূল্যবান বস্ত্র ও অলঙ্কার কিন্তু তাহারা পর্দানসীন। নৃত্য গীত তাহাদের খুব প্রিয়। প্রত্যেকেরই অনেক ভৃত্য। সাধারণ লোকেরা খাটো কুর্তা ও মাথায় পাগড়ী পরে। সকলেই জুতা ব্যবহার করে। ধনীদের জুতায় রেশম ও সোনার সুতার কাজ।

মুসলমানদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা সাধারণতঃ ফার্সী ভাষার সাহায্যেই হইত। অনেকে আরবী ভাষারও চর্চা করিতেন। বিদ্যাশিক্ষার জন্য মক্তব ও মাদ্রাসা ছিল। সুলতানগণ এইরূপ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করিতেন। সুফীদের দর্গাতেও শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল।

প্রাথমিক শিক্ষা বাংলা ভাষায় হইত। সাধারণতঃ বিদেশী ও স্বল্পসংখ্যক অভিজাত মুসলমান উর্দু ব্যবহার করিতেন তাছাড়া সকলেই বাংলা ভাষায় কথাবার্তা বলিত। মুসলমান সমাজে অবস্থাপন্ন লোকের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা সম্বন্ধে বিশেষ যত্ন নেওয়া হইত। মসজিদেও শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। সকলেই কোরাণ শরীফ পড়িত এবং অন্য এক বা একাধিক বিষয় শিখিত।

অনেক সময় অল্পবয়সেই ছেলেমেয়েদের বিবাহের সম্বন্ধ স্থির হইত কিন্তু বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বে বিবাহ হইত না। বর ঘোড়ায় চড়িয়া শোভাযাত্রা করিয়া কনের বাড়ীতে যাইত – সেখানে কাজীর সামনে মোল্লা বিবাহ দিতেন। ধনীর বাড়ীতে ভোজ নৃত্যগীতাদি একাধিক দিন চলিত। বিবাহ সম্বন্ধে হিন্দুর অনেক লৌকিক আচার অনুষ্ঠান মুসলমান সমাজেও প্রচলিত ছিল।”

কবিকঙ্কণের চণ্ডীমঙ্গলে মধ্যযুগের বাঙালি মুসলমান সমাজের একটি মনোরম চিত্র পাওয়া যায়। অনুমান করা যায় যে বড় বড় নগরে মুসলমানেরা একটি স্বতন্ত্র পাড়ায় বাস করত।

“ফজর সময়ে উঠি
বিছায়ে লোহিত পাটী
পাঁচ বেরি’ করয়ে নমাজ।

ছোলেমানী মালা করে
জপে পীর পগম্বরে
পীরের মোকামে দেয় সাঁজ।।

দশ বিশ বেরাদরে
বসিয়া বিচার করে
অনুদিন কেতাব কোরাণ।

কেহ বা বসিয়া হাটে
পীরের শীরিণি বাটে
সাঁঝে বাজে দগড়, নিশান।।

বড়ই দানিসবন্দ
না জানে কপট ছন্দ
প্রাণ গেলে রোজা নাহি ছাড়ি।

যার দেখে খালি মাথা
তার সনে নাহি কথা
সারিয়া চেলার মারে বাড়ি।।

ধরয়ে কম্বোজ বেশ
মাথাতে না রাখে কেশ
বুক আচ্ছাদিয়া রাখে দাড়ি।

না ছাড়ে আপন পথে
দশ রেখা টুপি মাথে
ইজার পরয়ে দৃঢ় দড়ি।।

আপন টোপর নিয়া
বসিলা গাঁয়ের মিয়া
ভুঞ্জিয়া কাপড়ে মোছে হাত।”


তথ্যসুত্রঃ

ভারতীয় সমাজ-পদ্ধতি – ডাঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত

বাঙ্গলা দেশের ইতিহাস (মধ্য যুগ) – রমেশচন্দ্র মজুমদার

বাঙ্গলার ইতিহাস (সামাজিক বিবর্তন) – ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত

বৃহৎ বঙ্গ- দীনেশচন্দ্র সেন

বাঙ্গালীর ইতিহাস – নীহাররঞ্জন রায়

শ্রীশ্রীগীতগোবিন্দম – জয়দেব

শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন – মহকবি চণ্ডীদাস



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *