Headlines

পশ্চিমবঙ্গ অভিন্ন দেওয়ানি বিধি ২০২৬ – সুস্থ গণতন্ত্র বনাম সংখ্যাগুরুবাদের ঔদ্ধত্ব

Uniform Civil Code 2026 West Bengal

আগামী ২৯শে জুন ২০২৬ সোমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল পেশ হতে যাচ্ছে। রাজ্য বিধানসভায় বিজেপির যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাতে এই বিল যে সহজেই পাস হয়ে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

ভারতের গোদি মিডিয়া এই অভিন্ন দেওয়ানি আইন নিয়ে খবর করতে গিয়ে মূলত মুসলিম পুরুষদের শর্তসাপেক্ষে একসঙ্গে সর্বাধিক ৪টি স্ত্রী রাখার অধিকার খর্ব করার কথাই বলছে। এবং এটাকে অনেকেই ভারতে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষদের উপর হিন্দুত্ববাদীদের বিজয় হিসেবে দেখছে।

কিন্তু মুসলমানরা কেন অভিন্ন দেওয়ানি আইনের বিরোধিতা করছে, বা অভিন্ন দেওয়ানি আইন বলবৎ হলে মুসলমান সমাজের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে সে সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের ধারণা খুব একটা পরিষ্কার নয়। নিম্নে বিরোধিতার মূল কারণগুলি নিয়ে আলোচনা করা হলো।


বিবাহ (Marriage)

ভারতে হিন্দু এবং অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে সাধারণ ধারণা রয়েছে যে – ইসলামি শরিয়তের আওতায় মুসলমান মহিলারা অত্যন্ত করুণ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। সবাই না হলেও বেশিরভাগ মুসলমান পুরুষ চারটি করে বিয়ে করে এবং যখন খুশি তালাক তালাক তালাক বলে স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দেয়। তাই অভিন্ন দেওয়ানি আইন বলবৎ করলে মুসলমান পুরুষদের একাধিক বিবাহ বন্ধ হবে এবং মুসলিম মহিলাদের সামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে।

কিন্তু ভারত সরকারের ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য অন্য কথা বলছে। ২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী ভারতের মোট জনসংখ্যা ছিল ১২১০৮৫৪৯৭৭ জন। হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ৯৬৬২৫৭৩৫৩ জন – মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০% এবং মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ১৭২২৪৫১৫৮ জন – মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪%।

ভারতে বিবাহিত নারী-পুরুষের মোট সংখ্যা ছিল ৫৭৯৫৮৪৭৮৩ জন – মোট জনসংখ্যার ৪৮%। যখন হিন্দু বিবাহিত নারী-পুরুষের সংখ্যা ছিল ৪৭১৩৯৭৯০০ জন – মোট হিন্দু জনসংখ্যার ৪৯%, যা জাতীয় গড়ের চাইতে বেশি। যদিও আমরা জানি ভারতে কয়েক লক্ষ হিন্দু সাধু রয়েছেন, অনেক রাজনীতির কারবারি রয়েছেন যারা বিয়ে করেন না।

অপর দিকে মুসলিম বিবাহিত নারী-পুরুষের সংখ্যা ছিল ৭৩৬৮১৯০১ জন – মোট মুসলিম জনসংখ্যার ৪৩%, যা কিনা শতাংশের হিসাবে হিন্দুদের থেকে এমনকি জাতীয় গড়ের থেকেও অনেক কম।

যদি হিন্দু বিবাহিত পুরুষরা সবাই একটাই বিয়ে করে সন্তুষ্ট থাকত এবং মুসলিম পুরুষদের বেশিরভাগ লোক একটার বেশি বিয়ে করত তাহলে এই ফলাফলটা উল্টো হতো। অর্থাৎ শতাংশের বিচারে বিবাহিত মুসলিমদের জনসংখ্যা বিবাহিত হিন্দু জনসংখ্যার অনেক বেশি হতো। এটা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়। ২০১১ সালের ভারত সরকারের নিজেরই গণনা রিপোর্ট সেই কথা বলছে।

ভারত সরকারের ২০১৯-২১ সালের স্যাম্পল ডেটাও (NFHS-5, 2019-21) একই কথা বলছে। NFHS-5, 2019-21 ডেটা অনুযায়ী ভারতে বহুবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি আদিবাসী (Scheduled Tribes বা ST) জনগোষ্ঠীর মধ্যে (১.৫%) এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে। মেঘালয় (৬.১%), মিজোরাম (৪.১%) এবং অরুণাচল প্রদেশে (৩.৯%) এর হার সবচেয়ে বেশি। এবং এই রাজ্যগুলোতে মুসলমান সম্প্রদায়ের উপস্থিতি নেই বললেই চলে।

যদিও হিন্দু ধর্মে পুরুষ বা নারী কারও একাধিক বিবাহে কোনো বাধা বা নিষেধ নেই, তবুও ১৯৫৫ সালের হিন্দু বিবাহ আইন (Hindu Marriage Act) অনুযায়ী, একজন হিন্দু পুরুষ একই সময়ে একাধিক স্ত্রী রাখতে পারেন না। কিন্তু মুসলিম পার্সোনাল ল অনুযায়ী, একজন মুসলিম পুরুষ একই সময়ে শর্তসাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৪ জন স্ত্রী রাখতে পারেন।

অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু হলে সবার জন্য একই আইন হবে, অর্থাৎ মুসলিম পুরুষদের একসঙ্গে ৪টি বিবাহের অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে।

মুসলমানদের আপত্তির কারণ

মুসলমানদের মতে, শুধু আইন করে পুরুষের একাধিক বিবাহ বন্ধ করলে সমাজে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ব্যাভিচার বৃদ্ধি পাবে। হিন্দু বিবাহ আইনে একজন হিন্দু পুরুষের একই সময়ে একাধিক স্ত্রী রাখা আইনত দণ্ডনীয় হলেও, হিন্দু পুরুষদের একাধিক বিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।

উদাহরণস্বরূপ সম্প্রতি সংবাদপত্রে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কলকাতার গড়িয়া এলাকার (কৌশিক দত্ত এবং দুই বোন ঝুমা ও সোমা) কিংবা মহারাষ্ট্রের সোলাপুরের যমজ দুই বোনের এক পাত্রকে বিয়ে করার খবরগুলো আমরা দেখেছি, হিন্দু আইনে সম্পূর্ণ অবৈধ হলেও সামাজিকভাবে সেগুলো ঘটেছে।


লিভ-ইন সম্পর্ক বা একত্রবাস (Live-in relationship or cohabitation)

অভিন্ন দেওয়ানি আইন পুরুষের একাধিক বিবাহের অধিকার কেড়ে নিলেও, নারী-পুরুষের লিভ-ইন সম্পর্ক তৈরি করতে কোনো বাধা হচ্ছে না। এমনকি কোনো বিবাহিত পুরুষ বা নারী যদি বিবাহবহির্ভূতভাবে এক বা একাধিক নারী বা পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করে, তবে আদালত জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার বলে সেখানে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না বিবাহিত পুরুষটির স্ত্রী বা বিবাহিত নারীটির স্বামী কোনো অভিযোগ দায়ের করেন। এবং অভিযোগ দায়ের হলেও সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায় অনুযায়ী বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে ফৌজদারি অপরাধ বলা হবে না, কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে না; এটা অভিযোগকারীকে শুধুমাত্র বিবাহবিচ্ছেদ নিতে সাহায্য করবে।

২০১৮ সালে সুপ্রিম court (জোসেফ শাইন মামলা) ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ নম্বর ধারা বাতিল করে দেয়। এর ফলে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়া ভারতে এখন কোনো ফৌজদারি অপরাধ (Criminal Offence) নয়। অর্থাৎ, এই কারণে পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারে না বা কোনো জেল-জরিমানা হয় না।

সুপ্রিম কোর্টের মতে, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ ভারতের প্রত্যেক নাগরিককে নিজস্ব জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা দিয়েছে। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কার সাথে থাকবেন, সেটি তাঁদের একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।

গুড়গাঁওয়ের একটা ঘটনা সামনে এসেছে যেখানে পারিবারিক আদালত একজন হিন্দু পুরুষকে একসঙ্গে একজন স্ত্রী এবং একজন লিভ-ইন পার্টনার রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এখানে আমরা দেখছি একজন মানসিকভাবে বিবাহিত হিন্দু মহিলা, যে কিনা তার সারা জীবন একজন হিন্দু পুরুষের স্ত্রী হিসেবে অতিবাহিত করেছে, তাকে তার আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

সোজা কথায় অভিন্ন দেওয়ানি আইন মুসলিম পুরুষের একাধিক বিবাহের অধিকার কেড়ে নিয়ে একজন মুসলিম পুরুষকে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী পুরুষদের মতোই বিবাহবহির্ভূত লিভ-ইন সম্পর্ক তৈরি করতে উৎসাহিত করে এবং একজন মানসিকভাবে বিবাহিত মহিলাকে তার সামাজিক ও আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে সাহায্য করে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড ইসলামি মূল্যবোধের পরিপন্থী। মুসলমান সমাজ এই ব্যবস্থা কখনও মেনে নিতে পারবে না।

তাছাড়া পুরুষের একাধিক বিবাহ রোধ করে মহিলাদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা যদি অভিন্ন দেওয়ানি আইনের অন্যতম মূল লক্ষ্য হয়, তবে যাদের মধ্যে পুরুষের বহুগামিতার শতাংশ (মেঘালয়ে ৬.১%) সবচেয়ে বেশি, সেই আদিবাসী এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষদের সবার আগে অভিন্ন দেওয়ানি আইনের আওতায় আনা উচিত, অথচ তাদেরকে এর থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

কাজিন ম্যারেজ (Cousin marriage)

মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে কাজিন ম্যারেজ বৈধ। অর্থাৎ মুসলিম আইনে খুড়তুতো, জ্যাঠতুতো, মামাতো, মাসতুতো, পিসতুতো ভাই-বোনদের মধ্যে বিবাহ হতে কোনো বাধা নেই। হিন্দু ম্যারেজ আইনে এই ধরনের তুতো বিবাহ বা কাজিন ম্যারেজ উত্তর ভারতে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও দক্ষিণ ভারতের অনেক অংশে এবং অনেক আদিবাসী সমাজে কাজিন ম্যারেজ আইনত বৈধ।

বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে মুসলমানরা বেশির ভাগই কাজিন ম্যারেজ করে, এবং সে জন্য মুসলমানদের মধ্যে জিনগত রোগ বেশি দেখা যায়। কিন্তু এই ধারণার পক্ষে কোনো প্রামাণিক তথ্য নেই। বেশিরভাগটাই হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান।

অবশ্য একটা সময় ছিল, যখন মুসলমান সমাজে কাজিন ম্যারেজকে উৎসাহ দেওয়া হতো। এর পিছনে কোনো ধর্মীয় কারণ ছিল না। সে সময় কৃষি জমি ছিল গ্রামীণ আয়ের প্রধান উৎস। মূলত পারিবারিক কৃষিজমি যাতে হস্তান্তর না হয়ে যায়, তার জন্যই কাজিন ম্যারেজে উৎসাহ দেওয়া হতো। বর্তমানে আগের পরিস্থিতি আর নেই, তাই কাজিন ম্যারেজে মানুষের উৎসাহও আর নেই।

মুসলমানদের মধ্যে কাজিন ম্যারেজ রয়েছে, তাই মুসলমানদের মধ্যে জিনগত রোগ বেশি – এই ধারণা পুরোপুরি ভুল। ভারত সরকারের তথ্য সেই কথাই বলছে। ভারতে সম্প্রদায়, জাতি এবং উপজাতি ভিত্তিক জিনগত রোগের (Genetic Disorders) ইতিহাস ও পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। ইসলাম বা মুসলমানদের কাজিন ম্যারেজের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

যেমন –

ক) বিটা-থ্যালাসেমিয়া (Beta-Thalassemia): 

সিন্ধি, লোহানা এবং কচ্ছের ভানুশালী সম্প্রদায়: এদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়ার বাহকের হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৮% থেকে ১৫%। 

পাঞ্জাবি এবং খত্রী সম্প্রদায়: এদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়ার বাহকের হার প্রায় ৪% থেকে ৬.৫%। 

পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ও কায়স্থ সম্প্রদায়: কিছু আঞ্চলিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের নির্দিষ্ট কিছু গ্রামীণ মুসলিম পকেট এবং কিছু উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে এই বাহকের হার ৪% থেকে ৮% পর্যন্ত পৌঁছায়।

খ) সিকল সেল অ্যানিমিয়া (Sickle Cell Anemia): এটি মূলত ভারতের আদিবাসী (Scheduled Tribes) এবং নির্দিষ্ট কিছু অনগ্রসর সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশি দেখা যায়। 

আদিবাসী বেল্ট: মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড় এবং মহারাষ্ট্রের আদিবাসী জনসংখ্যায় সিকল সেল জিনের বাহকের হার ১০% থেকে ৪০% পর্যন্ত হতে পারে। 

কেন্দ্রীয় সরকারের ডেটা অনুযায়ী, ভারতের প্রতি ৮-১০ জন আদিবাসী শিশুর মধ্যে ১ জন সিকল সেল অ্যানিমিয়ার বাহক হিসেবে জন্মায়।

ক্ষুদ্র সম্প্রদায় ভিত্তিক রোগ (Founder Effect)

পার্সি সম্প্রদায় (Parsis): G6PD ডেফিসিয়েন্সি: এদের মধ্যে এই এনজাইমের ঘাটতি প্রায় ১২% থেকে ১৫% পুরুষের মধ্যে দেখা যায়, যার ফলে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ খেলে রক্তকণিকা ভেঙে যায়। এছাড়া এদের মধ্যে স্তন ও প্রোস্টেট ক্যান্সারের জিনগত প্রবণতা বেশি।

অশোকেনাজি ইহুদি (Ashkenazi Jews): টে-সাক্স রোগ (Tay-Sachs Disease): একটি মারাত্মক স্নায়বিক রোগ, যা এই সম্প্রদায়ের জিনগত বৈশিষ্ট্যের সাথে যুক্ত।

আগরওয়াল ও বৈশ্য সম্প্রদায়: সিউডোকোলিনএস্টারেজ ডেফিসিয়েন্সি (Pseudocholinesterase Deficiency): এই সম্প্রদায়ের মানুষের অস্ত্রোপচারের সময় সাধারণ অ্যানেশস্থেশিয়া (যেমন- সাক্সামেথোনিয়াম) দিলে শরীর তা সহজে বিপাক করতে পারে না, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।

কমতি বা আর্য বৈশ্য সম্প্রদায়: অ্যানেশস্থেশিয়ার প্রতি একই ধরনের মারাত্মক সংবেদনশীলতা এদের মধ্যেও পরিসংখ্যানগতভাবে অনেক বেশি দেখা গেছে।

জাঠ ও গুজ্জর সম্প্রদায়: উত্তর-পশ্চিম ভারতের (পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান) গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি সৃষ্টিকারী জিনগত মিউটেশন (MYBPC3 deletion) জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে, যা তরুণ বয়সে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার (Sudden Cardiac Arrest) কারণ হতে পারে।

উপরের তথ্য থেকে একথা পরিষ্কার যে ভারতে আদিবাসী এবং হিন্দু তফসিলি জাতিদের মধ্যেই জিনগত রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। অথচ দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের (custom) দোহাই দিয়ে তাদের মধ্যে কাজিন ম্যারেজকে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে কাজিন ম্যারেজের প্রচলন বর্তমানে কম হলেও ঐতিহ্য শুরু থেকেই রয়েছে এবং জিনগত রোগের প্রকোপও অত্যন্ত কম। সেক্ষেত্রে অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু করে, জোর করে মুসলমানদের কাজিন ম্যারেজ বন্ধ করা রাজনৈতিক দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছু নয়।

এমনটাও নয় যে বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে কাজিন ম্যারেজ আইনত নিষিদ্ধ তাই কাজিন ম্যারেজ একেবারেই হয় না। এই প্রবন্ধের লেখকের অল্প বয়সের (ক্লাস ৫ থেকে ক্লাস ৯) গৃহশিক্ষক ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত বংশীয় নিষ্ঠাবান বাঙালি হিন্দু ব্রাহ্মণ, স্বর্গীয় দুর্গাচরণ ভট্টাচার্য মহাশয়। তিনি তাঁর মামাতো বোনকে বিবাহ করেছিলেন, সেই অপরাধে তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রীকে (মামাতো বোন) ত্যাজ্যপুত্র করে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।

আবার এই প্রতিবেদনের লেখক আরও একজন নিষ্ঠাবান হিন্দু ব্রাহ্মণকে জানতেন, যিনি তাঁর পিসতুতো বোনের সঙ্গে আজীবন লিভ-ইন সম্পর্কে কাটিয়ে দিলেন, কিন্তু আইনের বেড়াজালে বিবাহ করতে পারেন নি। তাই অভিন্ন দেওয়ানি আইন কাজিন ম্যারেজকে নিষিদ্ধ করতে পারলেও দুজন প্রাপ্তবয়স্ক কাজিন নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বা একত্রবাস বন্ধ করতে পারবে না। মুসলিম সমাজের আপত্তি ঠিক এইখানটাতেই।


বিচ্ছেদ (Divorce)

ভারতে হিন্দুদের মধ্যে একটা বিকৃত ধারণা রয়েছে যে, মুসলমান পুরুষরা নিজেদের ইচ্ছামতো যখন খুশি তালাক দিয়ে থাকে, তাই মুসলমানদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা হিন্দুদের থেকে অনেক গুণ বেশি।

কিন্তু ভারত সরকারের পরিসংখ্যান সেকথা বলে না। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ভারতে বিবাহবিচ্ছিন্ন মানুষের জনসংখ্যা ছিল মোট ১৩৬২৩১৬ জন – মোট জনসংখ্যার ০.১১% এবং বিবাহবিচ্ছিন্ন নয় কিন্তু আদালতের রায়ে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকে এমন মানুষের সংখ্যা ছিল মোট ৩৫৩৫২০২ জন – মোট জনসংখ্যার ০.২৯%। অর্থাৎ বিবাহবিচ্ছিন্ন ও আলাদা থাকে এমন মানুষের সংখ্যা (০.১১+০.২৯ =) ০.৪%।

মোট হিন্দু বিবাহবিচ্ছিন্ন মানুষ ছিল ৯৬২৮১০ জন – মোট হিন্দু জনসংখ্যার ০.১%, আদালতের রায়ে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকে এমন হিন্দুর মোট সংখ্যা ছিল ২৮৭০৬৮৫ – মোট হিন্দু জনসংখ্যার ০.৩%। বিবাহবিচ্ছিন্ন ও আলাদা থাকে এমন হিন্দুর সংখ্যা (০.১+০.৩ =) ০.৪%।

মোট মুসলিম বিবাহবিচ্ছিন্ন মানুষ ছিল ২৬৯৬০৯ – মোট মুসলিম জনসংখ্যার ০.১৬%। আদালতের রায়ে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকে এমন মুসলিমদের সংখ্যা ছিল ৩৮৪৭৩৮ – মোট মুসলিম জনসংখ্যার ০.২২%। বিবাহবিচ্ছিন্ন ও আলাদা থাকে এমন মুসলিমদের সংখ্যা (০.১৬+০.২২ =) ০.৩৮%, যা হিন্দুদের তুলনায় এবং জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক কম।

তাই মুসলিম পুরুষরা স্ত্রীদেরকে যখন খুশি ইচ্ছেমতো তিন তালাক দিয়ে নারী জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে – এটা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়। ভারত সরকারের নিজেরই গণনা রিপোর্ট সেই কথাই বলছে।

বর্তমানে ভারতে মুসলিমদের তাৎক্ষণিক তিন তালাক (যেটা বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ সমস্ত মুসলিম দেশে অনেক আগে থেকেই নিষিদ্ধ) নিষিদ্ধ হলেও, তালাক-এ-আহসান এবং তালাক-এ-হাসান প্রচলিত রয়েছে। তালাক-এ-আহসান বিশ্বের মাঝে সর্বোত্তম বিবাহবিচ্ছেদ পদ্ধতি বলে স্বীকৃত।

সংক্ষেপে তালাক-এ-আহসান (Talaq-e-Ahsan in brief)

ক) স্বামী বা স্বামীর প্রতিনিধি একবার পরিষ্কারভাবে তালাক ঘোষণা করবেন।

খ) এই তালাক ঘোষণাটা স্ত্রীর স্বাভাবিক মাসিক পবিত্র অবস্থার সময়ে হতে হবে। স্ত্রী যখন তার মাসিক অপবিত্র অবস্থার মধ্যে থাকবে, তখন তালাক বললে তালাক হবে না।

গ) স্বামী যদি তার স্ত্রীকে সত্যিই তালাক দিতে চান তবে তালাক ঘোষণার পর থেকে তিন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন।

ঘ) এই তিন মাস সময়কে ইদ্দত বলে। এই ইদ্দত চলাকালীন স্ত্রী চাইলে স্বামীর বাড়িতেই থাকতে পারবেন, তাকে জোর করে স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া যাবে না। এই ইদ্দত সময়ের মধ্যে স্বামী উক্ত স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করবেন না। স্ত্রী যদি গর্ভবতী থাকেন তবে এই ইদ্দত সময় সন্তানের জন্ম হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ হবে। এই ইদ্দত সময়ের মধ্যে স্বামী তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তারপর এই সময়ের মধ্যে স্বামী যদি চান তবে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবেন। অথবা এই সময়ের মধ্যে স্বামী যদি উক্ত স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করেন তবে আর তালাক হবে না। এবং ইদ্দত চলাকালীন স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে ভরণ-পোষণ পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখেন।

ইদ্দত সময়ের মধ্যে স্বামী যদি স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেন বা স্ত্রী সহবাস না করেন তবে ইদ্দত সময়ের পরে স্বাভাবিকভাবে তালাক-এ-আহসান পূর্ণ হয়ে যাবে। তালাক দেওয়ার ঘোষণা বা তালাক ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা মৌখিকও হতে পারে আবার লিখিতও হতে পারে। তবে শিয়া মতে লিখিত তালাক গ্রহণযোগ্য নয় এবং তালাক দানের সময় কমপক্ষে দুজন যোগ্য সাক্ষীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।

এরপরেও ভবিষ্যতে বিবাহবিচ্ছিন্ন স্বামী-স্ত্রী যদি পুনরায় পরস্পরকে বিবাহ করতে চান, তবে করতেই পারেন, কোনো বাধা নেই। তাই এই তালাক-এ-আহসানকে সর্বোত্তম তালাক বলে।

অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু হলে এই সমস্ত বিবাহবিচ্ছেদ পদ্ধতি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে এবং বিবাহবিচ্ছেদ একমাত্র আদালতের মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে।

মুসলমানদের আপত্তির কারণ

আদালতের দীর্ঘসূত্রতাই মুসলমানদের আপত্তির মূল কারণ। তালাক-এ-আহসানের মাধ্যমে মুসলিম নারী-পুরুষ যেখানে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বিচ্ছেদজনিত সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়ে আবার নতুন করে বিবাহ করে নতুন সংসার জীবন শুরু করতে পারেন, সেখানে আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ পেতে নারী-পুরুষের বাকি জীবনটা পার হয়ে যেতে পারে।

ইতিমধ্যেই অমুসলিম সমাজে বিবাহবিচ্ছেদের ব্যাপারে আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা জীবনের একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। সেক্ষেত্রে অমুসলিম পুরুষ বা নারী নতুন জীবনসঙ্গী খুঁজে পেলে তার সঙ্গে লিভ-ইন সম্পর্কে থাকেন, এবং আদালত এতে কোনো আপত্তি করে না। উপরন্তু তাদের বর্তমানের এই লিভ-ইন সম্পর্ক পূর্বের জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে বিবাহবিচ্ছেদ পেতে সাহায্য করে।

কিন্তু ইসলাম ধর্মে বিবাহ না করে নারী-পুরুষের একত্রবাস পুরোপুরি নিষিদ্ধ। তাই যতদিন পর্যন্ত না আদালত বিবাহবিচ্ছেদের অনুমতি দিচ্ছে, ততদিন, হয়তোবা তাদের বাকি পুরোটা জীবন নতুন করে বিবাহিত জীবন শুরু করার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এটা মানব জীবনের প্রতি একধরনের নিষ্ঠুরতা ছাড়া আর কিছু নয়।

ইসলাম নারী-পুরুষের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে ব্যাভিচার বলে নিষিদ্ধ করে এবং বিবাহকে সহজ করার কথা বলে। বিবাহকে সহজ করতে হলে বিবাহবিচ্ছেদকেও সহজ করতে হবে।

অভিন্ন দেওয়ানি আইন আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদকে দীর্ঘসূত্রী করে বিবাহকেই নিরুৎসাহিত করে এবং মানুষকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক গড়ে তুলতে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করে। এক্ষেত্রে অভিন্ন দেওয়ানি আইন নিয়ে মুসলমানদের আপত্তির যথেষ্ট কারণ রয়েছে।


উত্তরাধিকার (Inheritance)

প্রাথমিক অংশীদার (Primary heir)

ইসলাম ধর্মে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং গাণিতিকভাবে বিন্যস্ত, যা সরাসরি কুরআনের নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। শরিয়া আইনে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী অথবা স্বামী, বাবা, মা, ভাই, বোন, দাদু, নাতি-নাতনি ইত্যাদি অর্থাৎ পরিবারে সবার অধিকার নির্দিষ্ট অংশানুপাতে সুরক্ষিত রয়েছে।

যেমন বর্তমানে একজন মুসলিম ব্যক্তি মারা গেলে তার সম্পত্তিতে তার স্ত্রী পাবেন ১/৮ অংশ (স্বামী হলে ১/৪ অংশ), বাবা পাবেন ১/৬ অংশ, মা পাবেন ১/৬ অংশ, বাকি সম্পত্তি ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ২/৩ ও ১/৩ অনুপাতে ভাগ হবে। যদি মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে না থাকে, একটিমাত্র মেয়ে থাকে, তবে মেয়ে পাবে ১/২ অংশ, একাধিক মেয়ে থাকলে মেয়েরা সবাই মিলে পাবে ২/৩ অংশ এবং বাকি সম্পত্তি মৃত ব্যক্তির ভাইদের মধ্যে ভাগ হবে।

কিন্তু অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু হওয়ার পর যদি কোনো ব্যক্তি উইল না করে মারা যান, তবে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি শুধুমাত্র তার স্ত্রী বা স্বামী, এক বা একাধিক সন্তান, মৃত ব্যক্তির মা এবং মৃত ব্যক্তির বাবা এই ৪টি পক্ষের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। মৃত ব্যক্তির সন্তান যদি মৃত ব্যক্তির আগেই মারা যান, তবে তার সন্তানেরা (মৃত ব্যক্তির নাতি-নাতনি) তাদের বাবার প্রাপ্য অংশটি পাবেন।

দত্তক (Adoption)

হিন্দু ধর্মের মতো ইসলাম ধর্মে সন্তান দত্তক নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। তবে একজন মুসলিম ব্যক্তি অপরের সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো করে লালন-পালন করে, ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করতেই পারেন, তাতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু তার এই সন্তান কখনও তার বায়োলজিক্যাল সন্তানদের মতো আইনত সমান উত্তরাধিকারী হয় না। এমনকি এই সন্তানকে তার প্রকৃত বাবা-মায়ের পরিচয় জানিয়ে দিতে হয়, এবং মুসলিম সমাজে তার প্রকৃত বাবা-মায়ের নামেই তার পরিচয় হয়। লালন-পালনকারী ব্যক্তি শুধুমাত্র তার অভিভাবক হিসেবে গণ্য হন।

অভিন্ন দেওয়ানি আইনে হিন্দুদের মতো একজন মুসলিম ব্যক্তিও চাইলে সন্তান দত্তক নিতে পারবেন, এবং এই দত্তক নেওয়া সন্তান তার প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য হবে।

উইল (Will)

ইসলামি শরিয়া আইনে একজন ব্যক্তি তাঁর মোট সম্পত্তির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ (১/৩ অংশ) নিজের ইচ্ছামতো কাউকে উইল (ওসিয়ত) করে দিয়ে যেতে পারেন এবং বাকি দুই-তৃতীয়াংশ আইনি উত্তরাধিকারীদের জন্যই রাখতে হয়।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে একজন ব্যক্তিকে তাঁর নিজের উপার্জিত সম্পত্তির ওপর ১০০% উইলের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, একজন মানুষ চাইলে তাঁর সম্পূর্ণ সম্পত্তি কোনো ট্রাস্টকে, কোনো নির্দিষ্ট সন্তানকে বা অন্য যে কাউকে উইল করে দিয়ে যেতে পারেন।

মুসলমানদের আপত্তির কারণ

মুসলমানদের মতে অভিন্ন দেওয়ানি আইনে উত্তরাধিকারের বিধি-বিধান তৈরি করা হয়েছে মূলত শহুরে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তদের কথা ভেবেই। প্রান্তিক গরিব মানুষদের সমস্যার কথা এখানে ভাবা হয়নি।

উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক একজন শহুরে মধ্যবিত্ত ব্যক্তি মারা যাওয়ার সময়, তিনি ৫০ লক্ষ টাকা রেখে গেছেন। তার স্ত্রী, একজন ছেলে, একজন মেয়ে, তার বাবা এবং মা রয়েছেন। অভিন্ন দেওয়ানি আইন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির ৫ জন উত্তরাধিকারী প্রত্যেকেই ১০ লক্ষ টাকা করে পাবেন। তার বসতবাড়িটির মূল্য ধরে ৫ জনের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

এবার ধরা যাক একজন প্রান্তিক গ্রামীণ চাষি বা দিনমজুর, মারা যাওয়ার সময় সম্পত্তি বলতে তার বসতবাড়ি, কষ্ট করে কোনোমতে একটা সংসার চলার মতো একটুকরো জমি রেখে গেছেন। এবং তার স্ত্রী, একজন ছেলে, একজন মেয়ে রয়েছেন; তার বাবা, মা জীবিত রয়েছেন এবং মৃত ব্যক্তির অন্য ভাই-বোনদের নিয়ে বাবা-মায়ের আলাদা সংসার রয়েছে। এক্ষেত্রে তার এই ফেলে যাওয়া সম্পত্তি, ৫ জনের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে প্রত্যেকে নিজের নিজের অংশ নিয়ে আলাদা হয়ে গেলে, এক জটিল আর্থ-সামাজিক সমস্যার জন্ম হতে পারে। ইসলামি শরিয়া আইনে যেভাবে উত্তরাধিকার বণ্টনের কথা বলা হয়েছে, সেভাবে অংশ ভাগ হলে এই ধরনের আর্থ-সামাজিক সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কম হয়।

শরিয়া আইনের বিরোধীরা অভিন্ন দেওয়ানি আইনে ছেলে-মেয়ের সমান অধিকারের কথা বলেন। কিন্তু অভিন্ন দেওয়ানি আইনে একজন ব্যক্তিকে তার সম্পত্তির ১০০% উইল করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। তাই ব্যক্তি যদি মারা যাওয়ার আগে তার সমস্ত সম্পত্তি তার একমাত্র ছেলেকে লিখে দিয়ে যান, তবে কারও কিছু করার থাকবে না। ভারতের পুরুষশাসিত সমাজে অভিন্ন দেওয়ানি আইনে মেয়ে সন্তানদের বঞ্চিত হওয়ার পুরোপুরি সম্ভাবনা রয়েছে। শরিয়া আইনে যেহেতু একজন ব্যক্তি তার মোট সম্পত্তির মাত্র ১/৩ অংশ উইল করতে পারে, তাই সে চাইলেও তার মেয়েকে বা কোনো উত্তরাধিকারীকে পুরোপুরি বঞ্চিত করতে পারে না।


উপসংহার (Conclusion)

অভিন্ন দেওয়ানি আইনে একদিকে যেমন পশ্চিমা সংস্কৃতির (বিবাহিত নারী-পুরুষের পরকীয়া) অন্ধ অনুসরণ করা হয়েছে, অপর দিকে ভারতের কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথাগুলিকে প্রাচীন ঐতিহ্যের নামে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এক দেশ – এক আইন এবং মহিলাদের সামাজিক মর্যাদার কথা বলা হলেও, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলি, যেখানে বহুবিবাহ সবচাইতে বেশি হয় এবং ভারতের তফসিলি জাতি ও উপজাতি, যাদের মধ্যে বহুবিবাহ ও জিনগত রোগ সবচাইতে বেশি, তাদেরকে অভিন্ন দেওয়ানি আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে উত্তরাধিকারীদের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও ১০০% উইল করার অধিকার দিয়ে পুরুষশাসিত সমাজে নারীর উত্তরাধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি ভালো করে পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, এই আইনের বিধি-বিধান তৈরি করার সময় যুক্তি, তথ্য ও বাস্তবতা কম গুরুত্ব পেয়েছে। এই আইনে সুস্থ গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার পরিবর্তে সংখ্যাগুরুবাদের ঔদ্ধত্যের প্রকাশ ঘটেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *