মধ্যযুগের বাংলার মুসলমান শাসনকে প্রধানত দুইভাগে ভাগ করা হয়। স্বাধীন সুলতানি আমল এবং মুঘল আমল।
সুলতানি আমলে বাংলা ছিল হিন্দুস্থান থেকে পৃথক একটি শক্তিশালী সমৃদ্ধশালী স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। অর্থনীতিতে, সামরিক শক্তিতে সুলতানি বাংলা ছিল বিশ্বের প্রথম সারির রাষ্ট্রগুলির মধ্যে একটি। মুঘল আমলে বাংলা তার স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব হারিয়ে মুঘল হিন্দুস্থানের একটি সুবা বা প্রদেশে পরিনত হয়।
সুলতানি বাংলা – বাংলা সালতানাত
সুলতানি আমলে বাঙালির ভাষা, পোষাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস, সাহিত্য-সংস্কৃতি, গৃহ নির্মাণ, ব্যবসা-বানিজ্য, কৃষি, শিল্প, যুদ্ধবিদ্যা সবেতেই ব্যাপক এবং বৈপ্লবিক উন্নতি সাধিত হয়েছিল। কিন্তু বাঙালির জীবনে সুলতানী আমলের অবদান নিয়ে আলোচনা করতে হলে সর্বপ্রথম বাঙালি পরিচয়, বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
শাহ-ই-বাংলা ইলিয়াস শাহ: বাঙালি পরিচয়ের জনক
বাঙালির নৃতাত্ত্বিক গঠন প্রাচীন হলেও, রাজনৈতিকভাবে “বাঙালি” পরিচয়টি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মধ্যযুগে। আর এই ঐতিহাসিক কৃতিত্বের মহানায়ক হলেন সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ।
ইলিয়াস শাহের আগে বাংলা রাঢ়, গৌড়, পুণ্ড্র, বঙ্গ, সমতট, হরিকেল প্রভৃতি উপাঞ্চলে বিভক্ত ছিল। ১৩৪২ খ্রিষ্টাব্দে লখনৌতির সিংহাসন আরোহণের পর তিনি একে একে সাতগাঁও ও সোনারগাঁও জয় করেন। ১৩৫২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সমগ্র বাংলাকে একক প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে এনে, এই বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোকে একত্রিত করে ‘বাঙ্গালাহ’ নামক একটি রাষ্ট্র গঠন করেন। তখন থেকেই “বাংলা” নামটি একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক অঞ্চলের পরিচয় হিসেবে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদেশি ভ্রমণকারী ও ইতিহাসবিদরাও তখন থেকে “বাংলা”কে পৃথক অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করতে শুরু করেন।
সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ নিজেকে ‘শাহ-ই-বাংলা’ (বাংলার সম্রাট) এবং সুলতান-ই-বাঙালিয়ান’ (বাঙালিদের সুলতান) উপাধিতে ভূষিত করেন। এবং এই অখণ্ড বাংলার নাগরিকদের বাঙালি নামে অবিহিত করেন। এভাবেই ইলিয়াস শাহ বাংলা অঞ্চলের মানুষদের সামাজিক এবং ভাষাগত পরিচয়কে রাজনৈতিক ভাবে রূপান্তরিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন। তখন থেকেই সমগ্র ভারতবর্ষের এবং ভারতবর্ষের বাইরের লোকেরাও এই অঞ্চলের অধিবাসী অথাৎ আমাদেরকে বাঙালি বলে অভিহিত করে আসছে।
ভাষা হল জাতি গঠনের ভিত্তি। বাঙালি মায়ের সন্তান ইলিয়াস শাহ বাংলা ভাষায় সরকারি কাজকর্ম করার নির্দেশ জারি করে ভাষার ভিত্তিতে সমগ্র বাঙালি জাতিকে একজোট করার প্রক্রিয়া শুরু করলেন। তার রাজত্বকালেই সর্বপ্রথম বাঙালিরা একটি জাতি হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে। ইলিয়াস শাহ থেকে শুরু করে বাংলার সুলতানেরা সবাই নিজেকে পরিচয় দিতেন “বাঙালি” নামে। শুধু সুলতানেরাই নয়, বাংলা রাষ্ট্রের সব অভিজাত ও কর্মকর্তারাই নিজেদের পরিচয় দিতেন “বাঙালি” নামে, জন্মসুত্রে তারা আরব, তুর্কি, পাঠান, বালুচ, ইরানি, তাজিক যাই হয়ে থাকুক না কেনো- বহির্বিশ্বে তাঁরা নিজেদের পরিচয় দিতেন ‘বাঙালি’ নামে। বাংলা রাষ্ট্রের সৈন্যরা সমগ্র ভারতসহ সারাবিশ্বে পরিচিত হয় “পাইক-ই-বাঙ্গালাহ” হিসেবে। অর্থাৎ যিনি বাংলার তিনিই বাঙালি, – তিনি জন্মসুত্রে আরব না তুর্কি না অন্যকিছু সেটা বিবেচ্য বিষয় ছিল না।
এককথায় বাঙালি হলো সুলতানি বাংলার অধিবাসীদের নাগরিকত্বের পরিচয়। যিনি বাংলার অধিবাসী, যে বাংলাকে, বাংলার মানুষ, বাংলা ভাষা, বাংলার প্রকৃতি, বাংলার সংস্কৃিতিকে আপন করে নিয়েছে, তার পরিচয় তিনি বাঙালি। আর এভাবেই সেই সময় থেকেই বাংলার সকল অঞ্চলের সকল অধিবাসী, হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ ব্রাহ্মণ চণ্ডাল সবাই বাঙালি বলে পরিচিত হয় এবং বাংলার বাইরের দেশগুলোও তাদের কে বাঙালি বলে অভিহিত করে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়ন ও বিকাশে বাংলার মুসলমান সুলতান ও সাহিত্যসেবীদের অবিস্মরণীয় অবদান বাংলার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রকৃত পক্ষে তাদের হাতেই বাংলা ভাষার মুক্তি ঘটে এবং সাহিত্যের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়।
বৌদ্ধ ধর্মের হাত ধরে পাল আমলে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেন আমলে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা বন্ধ হয়ে যায়। এ সম্পর্কে বহুভাষাবিদ পণ্ডিত ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেনঃ “আমরা হিন্দু-কালের কোনো বাংলা সাহিত্য পাই নাই। হিন্দু সেনরাজাগণ সংস্কৃতের উৎসাহদাতা ছিল। ব্রাহ্মণেতর ধর্মের সহিত সংশ্লিষ্ট বলিয়াই সম্ভবতঃ তাহারা বাংলা ভাষার প্রতি বিদ্বিষ্ট ছিল।”
ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন রাজাদের সময়ে বাংলা ভাষাকে ইতর ভাষা বলে ঘৃণা করা হত, রাজকার্যে বাংলা ভাষা ব্রাত্য ছিল। বাঙ্গলার চর্চাও ছিল ব্রাহ্মণদের কাছে নিন্দিত। বাঙ্গলা ভাষাভাষিদের আাশীর্বাদ গ্রহণকেও নিষেধ করা হয়,
“আাশীর্বাদং ন গৃহীয়াং পূর্ববঙ্গ নিবাসিতঃ
শতায়ুরিতি বক্তব্য হতায়ুবর্দিতিযতঃ
কারণ বাঙালিরা শতায়ু বলতে গিয়ে হতায়ু বলে বসে।
বাঙ্গলা ভাষা তাদের চোখে এতই হেয় ছিল যে, এ ভাষায় আঠারোটি পুরাণ কিংবা রামের জীবনী পাঠ করলে বা শুনলে নরকে যেতে হতো।
“অষ্টদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানিচ।
ভাষায়াং মানবঃ শ্রুতা রৌরবং নরকং ব্রজেং।”
আঠারোটি পুরান এবং রামের জীবনচরিত দেশীয় (বাঙ্গলা) ভাষায় শুনলে রৌরব নামক নরকে যেতে হবে।
মুসলমান সুলতানরা বাংলা ভাষায় সরকারি কাজকর্ম শুরু করেন। সুলতানদের হাতে পড়ে বাংলা ভাষার ব্যাপক শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। হাজার হাজার আরবি, ফার্সি, তুর্কি শব্দ এই সময় স্থায়ী ভাবে বাংলা ভাষার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে, বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
ভাষাবিদ শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন –
“… হীরা কয়লার খনির মধ্যে থাকিয়া যেমন জহুরীর আগমনের প্রতীক্ষা করে, শুক্তির ভিতর মুক্তা লুকাইয়া থাকিয়া যেরূপ ডুবুরীর অপেক্ষা করিয়া থাকে, বঙ্গভাষা তেমনই কোন শুভদিন, শুভক্ষণের জন্য প্রতীক্ষা করিতেছিল। মুসলমান বিজয় বাংলা ভাষার সেই শুভদিন, শুভক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল। গৌড়দেশ মুসলমানগণের অধিকৃত হইয়া গেল। তাঁহারা ইরান-তুরান যে দেশ হইতেই আসুন না কেন, বঙ্গদেশ বিজয় করিয়া বাঙালি সাজিলেন।
বঙ্গভাষা অবশ্য বহু পূর্ব হইতে এদেশে প্রচলিত ছিল, বুদ্ধদেবের সময়ও ইহা ছিল, আমরা ললিত বিস্তরে তাহার প্রমাণ পাইতেছি। কিন্তু বঙ্গ-সাহিত্যকে একরূপ মুসলমানের সৃষ্টি বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না। ..
সুলতানদের আদেশে রামায়ণ-মহাভারতের বাংলা অনুবাদ করা হয়। সেন আমলে ব্রাহ্মণ্যবাদী অত্যাচারে বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চর্যাপদকে বঙ্গভূমির মায়া কাটিয়ে নেপালের রাজ পরিবারে আশ্রয় নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। বাংলা ভাষায় ধর্মগ্রন্ধ পড়লে, রৌরব নরকে যাওয়ার ফতোয়া দেওয়া হয়েছিল। বাংলার মুসলমান সুলতানদের আদেশে, উৎসাহে ও অর্থসাহায্যে বাংলা ভাষায় অসংখ্য কাব্য, সাহিত্য, মঙ্গল কাব্য লেখা হতে লাগল।
… দেশী ভাষায় ধর্মগ্রন্থ রচনা করিতে হইবে, এই আদেশ শুনিয়া পন্ডিতের মুখ শুকাইয়া গেল, ইতরের ভাষায় পবিত্র দেব-ভাষা রচনা করিতে হইবে, চন্ডালকে ব্রাহ্মণের সঙ্গে এক পংক্তিতে স্থান দিতে হইবে! কিন্তু শত শত কল্লুক ভট্ট, রঘুনন্দন, শত শত স্মৃতি লিখিয়া শত শত বছরে যাহা না করিতে পারেন, শাহানশাহ্ বাদশাহের একদিনের হুকুমে তাহা হয়-রাজশক্তি এমনই অনিবার্য। অগত্যা প্রাণের দায়ে ব্রাহ্মণকে তাহাই করিতে হইল। পরাগলী মহাভারতে উল্লিখিত আছে,
“শ্রীযুত নায়ক সে যে নসরত খান,
রচাইল পাঞ্চালী সে গুণের নিধান।”
এতদ্বারা প্রমাণিত হইতেছে, হুসেন শাহের পুত্র নসরত শাহ মহাভারতের বঙ্গানুবাদ করাইয়াছিলেন।
… কবীন্দ্র পরমেশ্বর সংস্কৃতে বিশেষ ব্যুৎপন্ন ছিলেন এবং তিনি মহাভারতের স্ত্রী-পর্ব পর্যন্ত অনুবাদ রচনা করেন। পরাগলের বিজয়দৃপ্ত সুযোগ্য পুত্র ছুটি খাঁ শ্রী করণ নন্দীর দ্বারা মহাভারতের অশ্বমেধ পর্বের অনুবাদ সংকলন করাইয়াছিলেন।”
“বাংলা রামায়ণের রচয়িতা কবি কৃত্তিবাস তাঁহার আত্মকাহিনীতে লিখিয়াছেন যে তিনি একজন গৌড়েশ্বরের সভায় গিয়াছিলেন এবং তাঁহার কাছে বিপুল সংবর্ধনা লাভ করিয়াছিলেন এবং গৌড়েশ্বর-ই তাকে বাংলা রামায়ণ লিখতে আদেশ করেছিলেন। এই গৌড়েশ্বর ছিলেন সুলতান রকুনুদ্দীন বারবক শাহ।”
‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ নামক বিখ্যাত বাংলা কাব্যের রচয়িতা মালাধর বসু ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’-এ বলিয়াছেন যে গৌড়েশ্বর রকুনুদ্দীন বারবক শাহ তাঁহাকে “গুণরাজ খান” উপাধি দিয়াছিলেন।
“পদচন্দ্রিকা’য় বৃহস্পতি লিখিয়াছেন যে তিনি গৌড়েশ্বর সুলতান রকুনুদ্দীন বারবক শাহের কাছে ‘পণ্ডিতসার্বভৌম’ উপাধি লাভ করিয়াছিলেন এবং সুলতান তাঁহাকে উজ্জ্বল মণিময় হার, দ্যুতিমান দুইটি কুণ্ডল রত্নখচিত দশ আঙ্গুলের অঙ্গুরীয় দিয়া হাতির পিঠে চড়াইয়া স্বর্ণকলসের জলে অভিষেক করাইয়া ছত্র ও অশ্বের সহিত ‘রায়মুকুট’ উপাধি দান করিয়াছিলেন।
বৃহস্পতি মিশ্র ছিলেন একজন বিখ্যাত পণ্ডিত এবং গীতগোবিন্দটীকা, কুমারসম্ভবটীকা, রঘুবংশটীকা, শিশুপালবধটীকা, অমরকোষটীকা, স্মৃতিরত্নহার প্রভৃতি গ্রন্থের লেখক। ইহার সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ গ্রন্থ অমরকোষটীকা ‘পদচন্দ্রিকা’। বৃহস্পতির প্রথম দিককার বইগুলি জলালুদ্দীন মুহম্মদ শাহের রাজত্বকালে রচিত হয়; জালালুদ্দীনের সেনাপতি রায় রাজ্যধর তাহার শিষ্য ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। জালালুদ্দীনের কাছেও তিনি খানিকটা সমাদর লাভ করিয়াছিলেন, ‘স্মৃতিরত্নহার’-এ তিনি জালালুদ্দীনের নাম উল্লেখ করিয়াছেন”
“যাঁহাদের লেখা ‘কালিকামঙ্গল’ বা ‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্য পাওয়া গিয়াছে, তাঁহাদের মধ্যে সময়ের দিক দিয়া সর্বাপেক্ষা প্রাচীন দ্বিজ শ্রীধর কবিরাজ। ইনি সুলতান নসরৎ শাহের রাজত্বকালে তাঁহার পুত্র ফিরোজ শাহের পৃষ্ঠপোষণ ও আদেশ লাভ করিয়া এই বইটি লিথিয়াছিলেন ; ইহার একটি খণ্ডিত পুঁথি পাওয়া গিয়াছে ।
সাবিরিদ খান নামক একজন মুসলমান কবির লেখা একটি ‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্যেরও খণ্ডিত পুঁথি পাওয়া গিয়াছে ; ইহার ভাষা বেশ প্রাচীন কাব্যটি শ্রীধর কবিরাজের ‘বিদ্যাসুন্দর’-এর অনুকরণে রচিত হইয়াছিল । গোবিন্দদাস নামক একজন চট্টগ্রাম-নিবাসী কবি ১৫২৭ শকাব্দে ( ১৬০৫-০৬ খ্রীষ্টাব্দে ) একটি ‘কালিকামঙ্গল’ রচনা করিয়াছিলেন।”
এ সময়ে বাংলা সাহিত্যে অনেক মুসলমান লেখকেরও আবির্ভাব ঘটেছিল। এর ফলে বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে উন্নত ফারসি সাহিত্যের সংযোগ ঘটে । ইসলামি সংস্কৃতির মৌলিক উপাদান কুরআন হাদিসের বিষয়কে কেন্দ্র করে মুসলিম লেখকেরা রচনা করতে থাকেন অনুবাদ সাহিত্য, প্রণয় উপাখ্যান, জীবনী সাহিত্য, সুফি সাহিত্য, জঙ্গনামা বা যুদ্ধকাব্য ও সওয়াল সাহিত্য।
মধ্যযুগে মুসলিম লেখকদের সাহিত্যচর্চার বড়ো সাধনা ছিল ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী প্রচার করা। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা দূর করে সমাজকে ইসলামের ছায়াতলে আবদ্ধ কল্পে মুসলিম লেখকেরা যে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাতে বাংলা সাহিত্যও সমৃদ্ধ হতে পেরেছিল। এসময় মুসলমান লেখকেরাও ইসলাম ধর্মীয় বিষয়াদি অনুবাদ করে ধর্মসাহিত্যের বিকাশ ঘটিয়েছিলেন।
এতে করে হিন্দু লেখকদের লেখা রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার সাহিত্য স্বাদকে আস্বাদন করার পাশাপাশি মুসলিম সমাজ আরবি প্রণয় উপাখ্যান শাহ্ মুহম্মদ সগীরের লেখা ‘ইউসুফ জোলেখা’কে উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। জৈনুদ্দিন রচিত ‘রসুলবিজয়’ মুসলিম সমাজে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
এ ছাড়া মুসলিম কবিরা রচনা করেন ‘মধুমালতী, বিদ্যাসুন্দর, লায়লী মজনু, সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ এবং মহা কবি আলাওল মালিক মুহম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবত’ অবলম্বনে রচনা করেন ‘পদ্মাবতী’ কাব্য।
যেসব মুসলিম লেখক মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন শেখ ফয়জুল্লাহ, সাবিরিদ খান, দৌলত উজির বাহরাম খান, মুহম্মদ কবীর, দোনা গাজী, কাজী দৌলত, নওয়াজিস খান, শরিফ শাহ, আবদুল হাকিম, সৈয়দ হামজা, ফকির গরীবুল্লাহ, আবদুর রাজ্জাক, শেখ পরানসহ আরো অনেকে। এসব লেখকসহ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে অন্তত শতাধিক মুসলিম লেখক অবদান রেখেছেন। যাদের কঠোর পরিশ্রমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য হয়ে উঠেছিল জগৎখ্যাত।
পোষাক পরিচ্ছদ – খাদ্য়াভ্যাস
সুলতানি আমলে বাঙালির পোষাক পরিচ্ছদে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। এতদিন সেলাই করা পোষাকের ব্যবহার – সূচি-শিল্প বাংলা তথা সমগ্র ভারতে অজানা ছিল। সুলতানি আমলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত মুসলমান দরজিদের মাধ্যমে বাংলায় সেলাই করা পোষাকের প্রচলন হয়। সুলতানের দরবারের অভিজাত বাঙ্গালি হিন্দু পরিবারগুলিও সেলাই করা পোষাক পরতে শুরু করে।
সুলতানদের দরবারে চাকরি করার সুবাদে তুর্কি-ইরানি রন্ধন প্রণালী হিন্দু অভিজাতদের মধ্যেও পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
কৃষি
সুলতানি আমলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আগত মুসলমান সুফি, দরবেশরা স্থানীয় গরিব মানুষদের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য কৃষি কাজ করতে উৎসাহ দিত। তাদের উদ্দ্যোগে ও পরামর্শে বাংলার বিস্তীর্ন এলাকায় গভীর জঙ্গল কেটে পরিস্কার করে কৃষি জমির পত্তন করা হয়েছিল। তার ফলে কৃষির উন্নতি হয়, ধান চালের উৎপাদন অনেক বেড়ে যায়। নুতন নুতন কৃষি জমির টানে দেশ বিদেশ থেকে অনেক মানুষ এসে বাংলায় বসতি স্থাপন করতে থাকে, তার ফলে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বাংলার জনঘনত্ব এই সময় থেকে বৃদ্ধি পেতে থাকে।
কাগজ শিল্প
আগে তালপাতার উপর, গাছের ছালের উপর লেখালেখির কাজ করা হতো। কাগজ তৈরির কৌশল বাঙালির অজানা ছিল। মুসলমান ধর্মপ্রচারকদের কাছে কাগজের উপর লেখা পবিত্র কোরআণ দেখে বাঙালি প্রথম কাগজ সম্মন্ধে জানতে পারে। সুলতানদের উদ্যোগে বাংলায় কাগজ তৈরির কারখানা স্থাপন করা হয়। পান্ডুয়াতে তুঁত গাছের ছাল থেকে উচ্চমানের কাগজ তৈরি হতো। “চীনা পর্যটকেরা লিখিয়াছেন যে বাংলায় তুঁত গাছের বাকল হইতে উৎকৃষ্ট কাগজ তৈরী হয়। ইহার রং খুব সাদা এবং ইহা মৃগ-চর্মের মত মসৃণ।”
সমরাস্ত্র নির্মাণ
আধুনিক যুদ্ধের প্রধান উপকরন আগ্নেয়াস্ত্র বা গোলা-বারুদ-কামান-বন্দুকের ব্যবহার ভারতের মধ্যে বাঙালিরাই প্রথম শিখেছিল। পানিপথের যুদ্ধে বাবরের ভারত আক্রমনের অনেক আগেই, ১৫০০ খৃষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে বাঙালি সৈন্যরা বন্দুক ও কামান ব্যবহার করতে শিখেগিয়েছিল। বাংলা সালতানাতের দক্ষ ও সুসংগঠিত সৈন্য বাহিনী ছিল, যার মধ্যে অশ্বারোহী, পদাতিক, যুদ্ধ হাতি, নৌবাহিনী এবং গোলান্দাজ বাহিনীও ছিল। ড. রমেশ চন্ত্র মজুমদারের মতে “ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম পাদ শেষ হইবার পূর্বেই বাংলা দেশে যুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র কামান, বন্দুক ব্যবহৃত হইত। তখনও উত্তর-ভারতের অন্য কোন অঞ্চলে ইহা প্রচলিত হয় নাই।” আর্টিলারি (গোলান্দাজ বাহিনী) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হয়ে উঠে।
পর্তুগীজ ঐতিহাসিক জোয়াও ডি বারোস মন্তব্য করেন যে আরাকান ও ত্রিপুরার উপর বাংলার সামরিক আধিপত্য তার দক্ষ আর্টিলারির কারণে হয়েছে। আর্টিলারি বিভিন্ন আকারের কামান এবং বন্দুক ব্যবহার করত। পাইকরা এই সময়ে বাংলার পদাতিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ গঠন করে।
বন্দুক ও কামান ব্যবহার করা পদাতিক সৈন্যদের বিশেষ দক্ষতা মুঘল সম্রাট বাবরের মনোযোগ আকর্ষণ করে। “১৫২৯ খ্রীষ্টাব্দের ২রা মে হইতে ৬ই মে পর্যন্ত বাংলার সৈন্যবাহিনীর সহিত বাবরের বাহিনীর যুদ্ধ হইল। বাংলার সৈন্যেরা প্রশংসনীয়ভাবে যুদ্ধ করিল; তাহাদের কামান-চালনার দক্ষতা দেখিয়া বাবর মুগ্ধ হইলেন; তিনি দেখিলেন বাঙালিদের কামান-চালনার হাত এত পাকা যে লক্ষ্য স্থির না করিয়া যথেচ্ছভাবে কামান-চালাইয়া তাহারা শত্রুদের পর্যুদস্ত করিতে পারে। দুইবার বাঙালিরা বাবরের বাহিনীকে পরাস্ত করিল। কিন্তু তাহারা শেষ রক্ষা করিতে পারিল না, বাবরের বাহিনীর শক্তি অধিক হওয়ায় তাহারাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হইল। যুদ্ধের শেষ দিকে বসন্ত রায় নামে বাংলার একজন বিখ্যাত হিন্দু বীর অনুচরবর্গ সমেত বাবরের সৈন্যদের হাতে নিহত হইলেন।”
স্থাপত্য শিল্প – নগর নির্মাণ
বাংলার সুলতানরা নির্মাতাও ছিলেন। সুলতান হাজি শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ হাজিপুর (বিহার) ও শামসুদ্দিপুর (সমস্তিপুর) শহরের প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া দিল্লির শামসী হাম্মামখানার অনুকরণে একটি হাম্মামখানা নির্মাণ করেন।
সমগ্র বাংলা জুড়ে অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা, মিনার, দুর্গ ও প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়। শাহী বাংলার শহরগুলি ছিল মধ্যযুগীয় স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি, বিশেষত রাজকীয় রাজধানী গৌড় এবং পান্ডুয়া।
১৫০০ সালে, রাজধানী গৌড় ছিল জনসংখ্যার দিক দিয়ে বেইজিং, বিজয়নগর, কায়রো এবং কুয়াংচৌর পরে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম নগর। সালতানাতের নগর স্থাপত্য আরব, বাংলা, ফারসি, ইন্দো-তুর্কি এবং বাইজেন্টাইন প্রভাবের ভিত্তিতে ছিল।
খিলানের ব্যবহার করে ঘরের দরজা জানালা তৈরি, সিঁড়ি তৈরি, সেতু তৈরি এই সময় থেকেই শুরু হয়, এর আগে খিলান তৈরির কৌশল বাঙালি তথা ভারতীয়দের কাছে অজানা ছিল।
১৫শ শতাব্দী থেকে বাংলার বাড়ির ছাদ চুন-সুরকি সহযোগে ঢালাই হতে শুরু হয়, তখনও পর্যন্ত ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে ঢালাই ছাদ তৈরির কৌশল অজানা ছিল। বাংলার এই ছাদঢালাই পদ্ধতি পরে মুঘল সাম্রাজ্য এবং ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমের রাজপুত রাজ্যে ব্যাপকভাবে প্রতিলিপি করা হয়। এর উত্তরাধিকার হিসাবে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে এমনকি মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলোতেও মালদা-মুর্শিদাবাদের দক্ষ বাঙালি রাজ-মিস্ত্রীদের সুনাম ও চাহিদা আজও রয়েছে।
বাংলাতে প্রাসাদ তৈরির উপযোগি পাথর ভাল পাওয়া যায় না, তাই সুলতানি আমলের প্রথমদিকে পাথর ও পোড়ামাটির শিল্পকর্ম মিলিয়ে প্রাসাদের কারুকার্য তৈরি হতো। পরেরদিকে প্রধানত পোড়ামাটির অলঙ্করনই ব্যবহার করা হত। পোড়ামাটির তৈরি জ্যামিতিক নকসা, লতাপাতা-ফুল ইত্যাদির অলঙ্করন প্রাসাদ, মসজিদ, মাজার তৈরিতে ব্যবহার করা হত। সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলার নিজস্ব এই শিল্প ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও উৎকর্ষ লাভ করে। হিন্দু মন্দিরগুলোতেও পোড়ামাটির অলঙ্করন ব্যবহার করা হতে থাকে।
পরবর্তী শতাব্দীতে বাঁকুড়া বিষ্ণুপুরের হিন্দু মন্দিরগুলোর দেওয়ালে যে পোড়ামাটির অলঙ্করন আমাদের মুগ্ধ করে, তার উৎপপত্তি এভাবেই হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
পঞ্চদশ শতকের প্রথমে লেখা চীনদেশীয় পর্যটকের বর্ণনায় রাজধানী পাণ্ডুয়ার সুলতানের প্রাসাদের বর্ণনা আছে; – “স্তম্ভগুলিতে ফুল ও পশুপক্ষীর মূর্তি খোদিত ছিল। বাড়ি খুব উঁচু ও প্রকাণ্ড ছিল। তিনটি দরজা পার হইয়া গেলে প্রাসাদের অভ্যন্তরে নয়টি অঙ্গন দেখা যাইত। দরবার কক্ষের দুই দিকের বারান্দা এত দীর্ঘ ও প্রশস্ত ছিল যে এক সহস্র অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, বর্মে আচ্ছাদিত অশ্বারোহী এবং ধনুর্বাণ ও তরবারি হস্তে পদাতিকের সমাবেশ হইতে পারিত। অঙ্গনে ময়ূরপুচ্ছের তৈরী ছত্র হস্তে লইয়া একশত অনুচর দাঁড়াইত এবং বিরাট দরবার কক্ষে হস্তীপৃষ্ঠে ১০০ সৈন্য থাকিত। আঙ্গিনার সম্মুখে কয়েক শত হস্তী সারি দিয়া রাখা হইত।”
আদিনা মসজিদ
সুলতান সিকান্দর শাহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সবথেকে বড় মসজিদ আদিনা মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৩৫৩ ও ১৩৫৯ সালে দিল্লি সালতানাতকে দুইবার পরাজিত করার পর আদিনা মসজিদ ১৩৭৩ সালে নির্মাণ করা হয়।
মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ৫২৪ ফুট লম্বা ও ৩২২ ফুট চওড়া। এতে ২৬০টি থাম ও ৩৮৭টি গম্বুজ আছে। মসজিদের নকশা বাংলা, আরব, ফার্সি ও বাইজেন্টাইন স্থাপত্য অন্তর্ভুক্ত। শুধু আকার-আয়তনেই আদিনা মসজিদ সেই সময়কার দামেস্ক, বাগদাদ, কর্ডোভা অথবা কায়রোর মসজিদগুলির সঙ্গে তুলনীয় নয়, নকশা ও গুণগত দিকেও এটি বিশ্বের সেরা মসজিদগুলির সমকক্ষ।
আদিনা মসজিদের শিলালিপিতে সুলতান সিকান্দারকে “আরব ও পারস্যের সুলতানদের (আরব এ আজম) মধ্যে সবচেয়ে উদার, নিখুঁত, জ্ঞানী, উন্নত এবং ন্যায়পরায়ণ সুলতান ” হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। মসজিদের শিলালিপিতে সিকান্দার শাহকে “মহান সুলতান” এবং “বিশ্বাসীদের খলিফা ” হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
মসজিদের পশ্চিম দিকের বাহিরের দেয়ালের নিচের দিকে ছোট ছোট কয়েকটি পাথরের ব্লকে হিন্দু অথবা বৌদ্ধ দেবতা এবং নৃত্যশিল্পীদের ত্রুটিপূর্ণ মূর্তি খোদাই করা আছে। মসজিদের পূর্ব দিকের দেওয়ালের ভেতরের দিকে একজন নৃত্যশিল্পীর ত্রুটিপূর্ণ মূর্তি খোদাই করা একটা ছোট পাথরের ব্লক উল্টো করে লাগানো আছে। এছাড়াও মসজিদের উত্তর দিকের প্রবেশ পথের মাথার উপর একটা ক্ষুদ্র পাথরের ব্লকে একটি হিন্দু অথবা বৌদ্ধ দেবতার মূর্তিও খোদায় করা রয়েছে। একসময় নিশ্চয়ই এগুলোকে চুন-পলেস্তারার প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে পলেস্তারার প্রলেপ খসে পড়ায় এগুলো উন্মুক্ত হয়েগেছে। অনুমান করা হয়, বাংলায় বাড়ি তৈরি করার উপযুক্ত পাথরের স্বল্পতার জন্য কোন হিন্দু বা বৌদ্ধ মন্দিরের বাতিল হয়ে যাওয়া ত্রুটিপূর্ণ শিল্প কর্মের পাথরের বল্কও এই মসজিদ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে।
হিন্দুত্ববাদীরা দাবি করে যে মসজিদটি “আদিনাথ মন্দির” ভেঙে তৈরি করা হয়েছে। কিন্ত তাদের স্বপক্ষে কোনো প্রমান নেই। কারণ উপরে উল্লিখিত ত্রুটিপূর্ণ মূর্তি খোদাই করা কয়েকটি ছোট ছোট পাথরের বল্ক ছাড়া বিশাল মসজিদের দেওয়ালে বা অন্য কোথাও কোনো মূর্তির চিহ্ন পাওয়া যায় না। সমকালিন বা তার পরবর্তি কালের হিন্দু কবিদের লেখা কোন সাহিত্যে, কাব্য়ে, মঙ্গল কাব্যে, অথবা বিদেশি রাষ্ট্রদূত এবং পর্যটকদের লেখাতে মন্দির ধ্বংস করে মসজিদ তৈরি করার কথা কোথাও বলা হয়নি।
আদিনা মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান সিকান্দার শাহের মাতা ছিলেন সম্ভ্রান্ত হিন্দু ব্রাহ্মণ কণ্যা পুষ্পবতী ভট্টাচার্য (ফুলওয়ারা বেগম)। কবি কৃত্তিবাস, মালাধর বসু, বৃহস্পতি মিশ্র, শ্রীধর কবিরাজ এবং আরও অনেক বাঙালি হিন্দু কবি ও পণ্ডিত গৌড়ের সুলতানের দরবারে পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাজকীয় সম্মান লাভ করেছিলেন। ইনাদের কোনো লেখাতে মন্দির ধ্বংস করে মসজিদ তৈরি করার কোনো ইঙ্গিত পর্যন্ত নেই।
উনিশ শতকে ভূমিকম্পে মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি অব্যবহৃত হয়ে পড়ে। পাণ্ডুয়ার বেশিরভাগ অঞ্চল লতাপাতা পূর্ণ যায়গা হয়ে যায়।
বৈদেশীক সম্পর্ক – কুটনীতি
শাহী বাংলার সুদৃঢ় বিদেশী সম্পর্ক ছিল। বাংলা সালতানাত চীন, ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলির সাথে দূত বিনিময় করেছে। কূটনৈতিক মিত্ররা বাংলাকে প্রতিবেশী রাজ্যগুলির আক্রমণ প্রতিহত করতে সহায়তা করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, হেরাতের তৈমুরিদ শাসক এবং চীনের মিং সম্রাট বাংলা সালতানাত ও জৌনপুর সালতানাতের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সহায়তা করেছিলেন। আঞ্চলিক কূটনীতিতেও বাংলা সক্রিয় ছিল। উদাহরণস্বরূপ, বাংলার দূতাবাসের জাহাজ চীন থেকে ব্রুনাই এবং আচেহ (সুমাত্রা) দূতদেরও চীনে নিয়ে গিয়েছিল। উপকূলীয় অঞ্চলে পর্তুগিজ বাণিজ্য পোস্ট স্থাপনের জন্য বাংলা পর্তুগিজ রাষ্ট্রদূতদের সম্মতি জানায়। মিশরের সুলতান আশরাফ বার্সবা বাংলার সুলতানকে সম্মানের পোশাক এবং স্বীকৃতি পত্র পাঠিয়েছিলেন। পূর্ব আফ্রিকার নগর-রাজ্য মালিন্দির রাষ্ট্রদূতদের বাংলার আদালতে আটক করার নথিও রয়েছে। পূর্ব আফ্রিকান দূতরা বাংলার সুলতানকে জিরাফ উপহার দিয়েছিল, যা বাংলায় চীনা দূতরাও লক্ষ্য করেছিলেন। মধ্য এশিয়ায় সুলতান জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ এবং তৈমুরিয় সাম্রাজ্যের সুলতান শাহরুখ মির্জার মধ্যে যোগাযোগের প্রমাণ রয়েছে।
ব্যবসা-বানিজ্য
কোন এক অজানা কারনে পাল এবং সেন যুগের মুদ্রা পাওয়া যায় না। মুদ্রার ব্যবহার কমই ছিল। কড়ির ব্যবহার ও বিনিময় প্রথার মাধ্যমে ব্যবসা চলত, তাতে ব্যবসা-বানিজ্যে, বিশেষত বৈদেশিক বানিজ্যের ক্ষতি হতো। বাংলার সুলতানরা স্বর্ন মুদ্রা দিনারের পাশাপাশি রৌপ মুদ্রা টংকা-র প্রচলন করেন। টংকা থেকেই টাকার উতপত্তি। টংকা প্রচলনের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতি হয়, বিশেষত বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা হয়ে যায়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, ইউরোপীয় বিবরণগুলি মতে মালাক্কা সুলতানিতে বিপুল সংখ্যক বাঙালি বণিকের উপস্থিতির প্রমান পাওয়া যায়। বণিকরা অনেক জাহাজের মালিক ছিল।
বাংলা সালতানাত মধ্যযুগীয় বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক দেশ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে ছিল। পান্ডুয়া ছিল কাপড় এবং মদ রফতানির কেন্দ্র। পান্ডুয়ায় অন্তত ছয় প্রকারের সূক্ষ্ম মসলিন এবং চার ধরনের মদ পাওয়া যেতো। লাক্ষা এবং রেশম শিল্পেরও উল্লেখ আছে । চিনা পর্যটক মা হুয়ানের বর্ণনাতে সমৃদ্ধ জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সাক্ষ্য রয়েছে। মসলিন, রেশম এবং বিভিন্ন কারুশিল্প বাংলা থেকে চীনে রফতানি করা হত। ইউরোপীয় ভ্রমণকারীদের বর্ণনায় মালাক্কায় বিপুল সংখ্যক ধনী বাঙালি বণিক এবং জাহাজের মালিকের উপস্থিতির প্রমাণ দেয়, বাংলা ছিল এক বৃহৎ বাণীজ্যকেন্দ্র। বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলায় ঘোড়া আমদানি করা হতো এবং চীনে রফতানি করা হতো। বাংলায় একটি জোরদার নদীকেন্দ্রিক জাহাজ নির্মাণের ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। গঙ্গা বদ্বীপে সালতানতের নৌ বাহিনীর জাহাজ নির্মাণের ঐতিহ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। তুরস্কের ওসমানিয় খলিফারা বাংলা থেকে তাদের জন্য যুদ্ধ জাহাজ তৈরি করাত। তুরস্কের যাদুঘরে ১২৪টি কামান সহ একটি যুদ্ধ জাহাজের মডেল প্রদর্শনের জন্য রাখা আছে, মূল জাহাজটি বাংলার চট্টগ্রাম বন্দরের কারখানায় তৈরি করা হয়েছিল। বঙ্গ ও মালদ্বীপের মধ্যে ধান এবং গাভী বিক্রয়ের বাণিজ্য চলত। চীনা বিবরণগুলি থেকে জানা যায় দক্ষিণ পূর্ব এশীয় সাগরে সেই দশকগুলিতে বাংলার জাহাজগুলো ছিল সবচেয়ে বড়।
সোনার বাংলা
সুলতানি আমলে বাংলার ঐশ্বর্য ও সম্পদ প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছিল। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে ধনী নাগরিকদের বর্ণনায় বিস্তৃত প্রাসাদ, মণিমুক্তাখচিত বসনভূষণ, এবং স্বর্ণ, রৌপ্য ও মূল্যবান রত্নের ছড়াছড়ি। বৈদেশিক বর্ণনায়ও এর সমর্থন পাওয়া যায়। পঞ্চদশ শতকে চীনা রাজদূতেরা বাংলায় এসেছিলেন। তাদের বিবরণ থেকে এদেশের সম্পদের পরিচয় পাওয়া যায়। ভোজনের শেষে চীনা রাজদূতকে সোনার বাটি, পিকদানি, সুরাপাত্র ও কোমরবন্ধ এবং সহকারীদের ঐ সব রূপার দ্রব্য, কর্মচারীদেরকে সোনার ঘন্টা ও সৈন্যদেরকে রূপার মুদ্রা উপহার দেওয়া হয়েছিল। এদেশে কৃষিজাত সম্পদের প্রাচুর্য ছিল এবং ব্যবসা বাণিজ্যেও অনেক আয় উপর্জন হত। পোশাক-পরিচ্ছদ ও মণিমুক্তাখচিত অলঙ্কারে এই ঐশ্বর্যের পরিচয় পেয়ে চীনাদূতেরা বিস্মিত হয়েছিলেন। ‘তারিখ-ই-ফিরিশতা’ ও ‘রিয়াজ-উস সলাতীনে’ আছে যে সে সময়কার গৌড় ও পূর্ববঙ্গে ধনী লোকেরা সোনার থালায় খেত। সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ (ষোড়শ শতক) গৌড়ের লুণ্ঠনকারীদের বধ করে ১৩০০ সোনার খালা ও বহু ধনরত্ব পেয়েছিলেন।
জনকল্যান
সুলতান সৈফুদ্দীন ফিরোজ শাহ তাঁহার বীরত্ব, ব্যক্তিত্ব, মহত্ব ও দয়ালুতার জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। ‘রিয়াজ-উস্-সলাতীন’-এর মতে “তিনি বহু প্রজাহিতকর কাজ করিয়াছিলেন ; তিনি এত বেশি দান করিতেন যে পূর্ববর্তী রাজাদের সঞ্চিত সমস্ত ধনদৌলত তিনি নিঃশেষ করিয়া ফেলিয়াছিলেন ; কথিত আছে একবার তিনি এক দিনেই এক লাখ টাকা দান করিয়াছিলেন ; তাঁহার অমাত্যেরা এই মুক্তহস্ত দান পছন্দ করেন নাই ; তাঁহারা একদিন ফিরোজ শাহের সামনে একলক্ষ টাকা মাটিতে স্তূপীকৃত করিয়া তাঁহাকে ঐ অর্থের পরিমাণ বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু ফিরোজ শাহের নিকট এক লক্ষ টাকার পরিমাণ খুবই কম বলিয়া মনে হয় এবং তিনি এক লক্ষের পরিবর্তে দুই লক্ষ টাকা দরিদ্রদের দান করিতে বলেন।”
উদার ধর্মনিরপেক্ষ শাসন ব্যবস্থা
বাংলার সুলতানরা যে উদার ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাব সম্পন্ন ছিলেন, তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় হিন্দু কবি-পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতা থেকে। মুসলমান সুলতানদের আমলে শুধু মুসলমানরা নয়, হিন্দুরাও শাসনকার্যে গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্থান করতেন। এমন কি, তাঁরা বহু মুসলমান কর্মচারীর উপরে ‘ওয়ালি’ (প্রধান তত্ত্বাবধায়ক)-ও নিযুক্ত হতেন। বাংলার সুলতানের মন্ত্রী, সেক্রেটারী, এমন কি সেনাপতির পদেও বহু হিন্দু নিযুক্ত হয়েছিলেন।
সুলতান ইলিয়াস শাহ হিন্দু বীরদের রাজা-মহারাজা উপাধি দিয়ে সেনাপতি পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
দ্রব্যগুণের বিখ্যাত টীকাকার শিবদাস সেন লিখেছেন যে তাঁর পিতা অনন্ত সেন গৌড়েশ্বর বারবক শাহের “অন্তরঙ্গ” অর্থাৎ চিকিৎসক ছিলেন।
বৃহস্পতি মিশ্রের ‘পদচন্দ্রিকা’ থেকে জানা যায় যে, তাঁর বিশ্বাস, রায় প্রভৃতি পুত্রেরা বারবক শাহের প্রধান মন্ত্রীদের অন্যতম ছিলেন।
‘পুরাণসর্বস্ব’ নামক একটি গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে ঐ গ্রন্থের সঙ্কলয়িতা গোবর্ধনের পৃষ্ঠপোষক কুলধর বারবক শাহের কাছে প্রথমে “সত্য খান” এবং পরে “শুভরাজ খান” উপাধি লাভ করেন, এর থেকে মনে হয়, কুলধর বারবক শাহের অধীনে একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন।
কেদার রায় ছিলেন ত্রিহুতে বারবক শাহের প্রতিনিধি, নারায়ণদাস ছিলেন তাঁহার চিকিৎসক এবং ভান্দসী রায় ছিলেন তাঁহার রাজ্যের সীমান্তে ঘোড়াঘাট অঞ্চলে একটি দুর্গের অধ্যক্ষ।
কৃত্তিবাস তাঁর আত্মকাহিনীতে গৌড়েশ্বরের অর্থাৎ বারবক শাহের যে কয়জন সভাসদের উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে কেদার রায় এবং নারায়ণ ছাড়াও জগদানন্দ রায়, ‘ব্রাহ্মণ’ সুনন্দ, কেদার খাঁ, গন্ধর্ব রায়, তরণী, সুন্দর, শ্রীবৎস্থ্য, মুকুন্দ প্রভৃতি নাম পাওয়া যায়। ইনাদের মধ্যে মুকুন্দ ছিলেন ‘রাজার পণ্ডিত’; কেদার রায় বিশেষ প্রতিপত্তিশালী সভাসদ ছিলেন এবং কৃত্তিবাসের সংবর্ধনার সময়ে তিনি কৃত্তিবাসের মাথায় ‘চন্দনের ছড়া’ ঢেলেছিলেন ; সুন্দর ও শ্রীবৎস্য ছিলেন ‘ধর্মাধিকারিণী’ অর্থাৎ বিচারবিভাগীয় কর্মচারী। গন্ধর্ব রায়কে কৃত্তিবাস ‘গন্ধর্ব অবতার’ বলেছেন, এর থেকে মনে হয়, গন্ধর্ব রায় সুপুরুষ ও সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন।
পণ্ডিতদের রাজসম্মানও অনেকটা রাজসিক ভাবেরই ছিল। রায়মুকুট বৃহস্পতি মিশ্র কেবল স্মার্ত পণ্ডিত ছিলেন না, তিনি রঘুবংশ, মেঘদূত, কুমারসম্ভব, শিশুপালবধ, গীতগোবিন্দ প্রভৃতি কাব্যের এবং অমরকোষের টীকাও লিখেছিলেন। গৌড়েশ্বর জালালুদ্দীন এবং বারবক শাহ তাঁকে বহু সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন এবং তিনি উজ্জ্বল মণিময় হার, দ্যুতিমান কুণ্ডলদ্বয়, দশ অঙ্গুলির জন্য রত্নখচিত ভাস্বর উর্মিকা (রতনচূড়) প্রভৃতি পুরস্কার পেয়েছিলেন। তারপর সুলতান তাঁকে হাতির পিঠে বসিয়ে স্বর্ণ-কলসের জলে অভিষেক করে ছত্র, হস্তী ও অশ্ব এবং রায়মুকুট উপাধি দান করেন। বৃহস্পতির পুত্রেরা রাজমন্ত্রী-পদ লাভ করেন ; কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা দিগ বিজয়ী পণ্ডিতরূপে খ্যাতিলাভ করেছিলেন।
সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে ‘ছত্রী’ উপাধিধারী এক শ্রেণীর রাজকর্মচারীর উল্লেখ পাওয়া যায়; ইনারা সম্ভবত সভায় যাওয়ার সময় সুলতানের ছত্র ধারণ করতেন; মালাধর বসু (গুণরাজ খান), কেশব বসু (কেশব খান) প্রভৃতি হিন্দুরা বিভিন্ন সময়ে ছত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন।
সুলতানের চিকিৎসক সাধারণত বৈদ-জাতীয় হিন্দু হতেন; তাঁদের উপাধি হত ‘অন্তরঙ্গ’। কয়েকজন সুলতানের হিন্দু সভাপণ্ডিতও ছিল।
চৈতন্যদেবের একজন প্রিয় ভক্ত সনাতন সুলতান হোসেন শাহের মন্ত্রী ও সভাসদ ছিলেন এবং তাহার বিশিষ্ট উপাধি ছিল ‘সাকর মল্লিক’ (‘সগীর মালিক’, অর্থ ছোট রাজা)। সনাতন হোসেন শাহের অন্যতম ‘দবীর খাস’ বা প্রধান সেক্রেটারীও ছিলেন। হোসেন শাহ তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন ও তাঁর উপর বিশেষভাবে নির্ভর করতেন।
সনাতনের অনুজ রূপ ও হোসেন শাহের মন্ত্রী এবং ‘দবীর খাস’ ছিলেন। বল্লভ (সনাতন-রূপের ভাই), শ্রীকান্ত (ইহাদের ভগ্নীপতি), চিরঞ্জীব সেন, (গোবিন্দদাস কবিরাজের পিতা), কবিশেখর, দামোদর, যশোরাজ খান (সকলেই পদকর্তা), মুকুন্দ (বৈদ্য), কেশব খান (ছত্রী) প্রভৃতি বিশিষ্ট হিন্দুগণ হোসেন শাহের অমাত্য, কর্মচারী, চিকিৎসক প্রভৃতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
ঐতিহাসিক ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদারের মতে “সৈফুদ্দীন ফিরোজ শাহই বাংলার প্রথম হাবশী সুলতান। অনেকের ধারণা হাবশী সুলতানরা অত্যন্ত অযোগ্য ও অত্যাচারী ছিলেন এবং তাহাদের রাজত্বকালে দেশের সর্বত্র সন্ত্রাস ও অরাজকতা বিরাজমান ছিল। কিন্তু এই ধারণা সত্য নহে। বাংলার প্রথম হাবশী সুলতান সৈফুদ্দীন ফিরোজ শাহ মহৎ, দানশীল এবং নানাগুণে ভূষিত ছিলেন। তিনি বাংলার শ্রেষ্ঠ সুলতানদের অন্যতম। অন্যান্য হাবশী সুলতানদের মধ্যেও এক মুজাফফর শাহ ভিন্ন আর কোন হাবশী সুলতানকে কোন ইতিহাসগ্রন্থে অত্যাচারী বলা হয় নাই।”
বাংলা সালতানাতের সর্বশেষ শাসক বংশ ছিল কররাণী বংশ। দাউদ খান কররানী (শাসনকাল ১৫৭২-১২ জুলাই ১৫৭৬) ছিলেন কররানী রাজবংশের এবং শাহী বাংলার সর্বশেষ সুলতান। তাঁর ৪০,০০০ অশ্বারোহী, ৩,৬০০ হাতি, ১১,৪০,০০০ পদাতিক ও ২০,০০০ কামানের এক বিশাল দুর্ধর্ষ শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী ছিল। কররাণীদের শাসন কালে মুঘলরা বাঙালি সালতানাতের অবসান ঘটাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে। ১৫৭৬ খ্রীষ্টাব্দের ১২ জুলাই সম্মিলিত মুঘল বাহিনীর সাথে সংঘটিত রাজমহলের এক ভয়াবহ রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলার কররানী বংশের সর্বশেষ শাসক দাউদ খান কররাণী পরাজিত ও বন্দী হন।
দাউদ খান কররানী প্রশংসনীয় সামরিক গুণসম্পন্ন শাসক ছিলেন। তাঁর সাম্রাজ্য হারানোর পেছনে মোগল সৈনিকদের সামরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের চেয়ে, যাদের ওপর সুলতান বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন তাদের বিশ্বাসঘাতকতাই বিশেষভাবে কাজ করেছে। রাজমহলের যুদ্ধে সুলতানের অন্যতম বিশ্বস্ত সেনাপতি শ্রীহরি কোন যুদ্ধই করেননি। সুলতানকে যুদ্ধে বন্দী করার পর তাঁকে, রাজপুত রাজাদের মত মুঘলদের অধীনতা স্বীকার করে নিলে, মুঘল সৈন্যবাহিনীতে মসনবদার পদ দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। সুলতান দাউদ খান দৃপ্ত কন্ঠে উত্তর দেন’ “বাংলার বাদশাহ এক আকাশের বাদশাহ ছাড়া আর কারও কাছে মাথানত করেন না।” তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় এবং তাঁর ছিন্ন মুন্ডু আকবরের নিকট প্রেরিত হয় ।
সুলতান দাউদ খান কররাণী প্রজাহিতৈষী জনপ্রিয় শাসক ছিলেন। এদেশের কবি তাঁর নামে বিখ্যাত সুগন্ধি চাল ও তাঁর পছন্দের খাওয়া নিয়ে কবিতা লিখেছেন,
“দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, চিনি-পাতা দৈ,
দু’টা পাকা বেল, সরিষার তেল, ডিমভরা কৈ।”
মুঘল অধীনে বাংলা
দাউদ খান কররাণীর পতনের সঙ্গে সঙ্গে ২০০ বছরের গৌরবজ্বল বাংলা সালতানাতের পতন হয়। স্বাধীন বাঙালি জাতি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরাধীনতার শিকলে বাঁধা পড়ে। এরপর ধীরে ধীরে প্রায় সমগ্র বাংলায় মুঘল আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ বা সুবায় পরিণত হয়। এবং এই সময় থেকে বাংলার উপর হিন্দুস্থানি শোষন শুরু হয়।
বাংলা সন
খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য মুঘলরা নতুন এক ফসলি সন চালু করেছিল। বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়ের পর এদেশে তৎকালীন প্রচলিত শকাব্দের পাশাপাশি প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে হিজরি সনের প্রচলন শুরু হয়। এই হিজরি সন চান্দ্রমাস অনুযায়ী হওয়ার ফলে ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থার সামঞ্জস্য আনা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছিল না। সমস্যার সমাধানের জন্য সম্রাট আকবরের নির্দেশে রাজজ্যোতিষী ফতেহউল্লাহ সিরাজি চান্দ্রমাস ও সৌরমাস ভিত্তিক এক নতুন ক্যালেন্ডার তৈরি করেন।
আকবর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে বা ৯৬৩ হিজরিতে। তাই যদিও এই নতুন ক্যালেন্ডার ১৫৮৪ সালে চালু হয়, কিন্তু সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের স্মৃতিকে ধরে রাখতে ফতেহউল্লাহ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ বা ৯৬৩ হিজরি সনকে মূল ধরে নতুন সাল ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ প্রণয়ন করেন। গণণা করার সময় ফতেউল্লাহ সিরাজি চান্দ্রমাসের আরবীয় মডেল ব্যবহার না করে, সৌরমাস ভিত্তিক পারস্য মডেল ব্যবহার করেন। ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ফতেহউল্লাহ সিরাজি প্রবর্তিত এই নতুন সাল ‘ফসলি সন’ নামে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপক ভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে এ ফসলি সনই বাংলা সাল বা ‘বঙ্গাব্দ’ নাম ধারণ করে।
আদিতে তারিখ-ই-ইলাহির মাসগুলো ছিল যথাক্রমে ফরওরদিন, অর্দিবিহিষ্ট, খুরর্দাদ, তির, অমুরদাদ, শারেবার, মিহ্র, আবান, আজর, দয়, বহ্মন এবং ইস্ফন্দারমজ্। সম্রাট শাহজাহানের সময় মাসগুলোর নাম বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ইত্যাদিতে পরিবর্তন করা হয়।
ইদানীং কতিপয় উগ্র ‘হিন্দুত্ববাদী’ বঙ্গাব্দ প্রবর্তনের কৃতিত্ব ব্রহ্মণ্যবাদী সম্রাট শশাঙ্ককে দিতে উঠে-পড়ে লেগেছেন। ঐতিহাসিক ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ‘বঙ্গ, বাংলা ও ভারত’-এ তিনি লিখেছেন, “..শশাঙ্কের রাজ্যের সর্বাপেক্ষা বিস্তৃত সীমানার মধ্যে তাঁর পরবর্তীকালীন এক হাজার বৎসরের মধ্যে তারিখ যুক্ত যে বিরাট সংখ্যক লেখ আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলিতে বঙ্গাব্দ ব্যবহারের চিহ্নই নেই।”
মুঘল আমলে কৃষি ও ব্যবসা বাণিজ্য
মুঘল আমলে সুবা বাংলা কৃষিতে ও ব্যবসা বাণিজ্যে প্রভূত উন্নতি করেছিল। পূর্বের সুলতানি আমলের কৃষি নীতি মুঘলরাও অনুসরন করে। দক্ষিণ বঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন-জঙ্গল কেটে কৃষি জমিতে রুপান্তরিত করা হয়। একাজে ধর্মপ্রচার করতে আসা মুসলমান সুফি-সাধকরাই অগ্রণী ভূমিকা গ্রহন করে। মুঘলরা উৎসাহ দেওয়ার জন্য নতুন কৃষি জমির কয়েক বছরের খাজনা মকুব করে দিত। এতে ধানের উৎপাদন এতো বেড়ে যায় যে সারা ভারতে এবং ভারতের বাইরেও প্রচুর ধান-চাল রপ্তানি করা হত।
বাংলাতে অনেক পরিমাণ রেশম ও রেশমের বস্ত্র প্রস্তুত হত। নৌকা-নির্মাণ আর একটি বড় শিল্প ছিল। ট্যাভার্নিয়ারের বিবরণ থেকে জানা যায় যে ঢাকায় নদীতীরে দুই ক্রোশ স্থান ব্যাপি কেবলমাত্র বড় বড় নৌকানির্মাণকারী সূত্রধরেরা বাস করত । শঙ্খ ঢাকার একটি বিখ্যাত শিল্প ছিল। এ-ছাড়া সোনারূপা ও দামী পাথরের অলঙ্কার নির্মাণেও খুবই উৎকর্ষ লাভ করেছিল।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিদেশী লেখকদের বিবরণে লৌহ শিল্পের বহু উল্লেখ আছে। বীরভূমে লোহার খনি ছিল। সিউড়ি থেকে ১৬ মাইল দূরে খনি থেকে লৌহপিণ্ড নিষ্কাশন করে দামরা ও ময়সারাতে কারখানায় লৌহ তৈরী হত। মুল্লারপুর পরগনায় এবং কৃষ্ণনগরে লোহার খনি ছিল এবং দেওচা ও মুহম্মদবাজারে লৌহ তৈরীর কারখানা ছিল।
কলিকাতা ও কাশিমবাজারে এদেশী লোকেরা কামান তৈরী করত। কামানের বারুদও এদেশেই তৈরী হোত। শীতকালে বাংলা দেশে কৃত্রিম উপায়ে বরফ তৈরী হতো। গরম জল সারা রাত্রি মাটির নীচে গর্ত করে রেখে বরফ তৈরীর ব্যবস্থা ছিল।
সপ্তদশ খ্রীষ্টাব্দে বার্ণিয়ার লিখেছেন যে “অনেকে বলেন পৃথিবীর মধ্যে মিশর দেশই সর্বাপেক্ষা শস্যশালিনী। কিন্তু এ খ্যাতি বাংলারই প্রাপ্য। এদেশে এত প্রচুর ধান হয় যে ইহা নিকটে ও দূরে বহু দেশে রপ্তানি হয়। সমুদ্রপথে ইহা মসলিনপন ও করমণ্ডল উপকূলের অন্যান্য বন্দরে, এমন কি লঙ্কা ও মালদ্বীপে চালান হয়।
বাংলায় চিনি এত হয় যে দক্ষিণ ভারতে গোলকুণ্ডা ও কর্ণাটে, এবং আরব, পারস্য ও মেসোপটেমিয়ায় চালান হয়।
যদিও এখানে গম খুব বেশী পরিমাণে হয় না ; কিন্তু তাহা এ দেশের লোকের পক্ষে পর্যাপ্ত। উপরন্তু তাহা হইতে সমুদ্রগামী ইউরোপীয় নাবিকদের জন্য সুন্দর সস্তা বিস্কুট তৈরী হয়।
এখানে সুতা ও রেশম এত পরিমাণে হয় যে কেবল ভারতবর্ষ ও নিকটবর্তী দেশ নহে সুদূর জাপান এবং ইউরোপেও এখানকার বস্ত্র চালান হয়।
এই দেশ হইতে উৎকৃষ্ট লাক্ষা, আফিম, মোমবাতি, মৃগনাভি, লঙ্কা সমুদ্রপথে বহু স্থানে চালান হয়।”
সে সময় ইউরোপিয় বণিকদের কাছে বাংলা ছিল সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে সমৃদ্ধশালী বাণিজ্যিক অঞ্চল। আধুনিক গবেষকদের মতে মুঘল আমলে বিশ্বের মোট উৎপাদনের (জিডিপির) ১২ শতাংশ উৎপন্ন হত সুবাহ বাংলায়, যা সে সময় সমগ্র ইউরোপের জিডিপির চেয়ে বেশি ছিল।
হিন্দুস্থানি শোষন-লুঠ
কিন্তু এই অর্থ সম্পদের প্রায় সবটাই হিন্দুস্থানি মুঘলদের হাতে লুঠ হয়ে যেত। মুঘল আমলে বাংলার সুবাদার ও অভিজাতরা নিজেদের হিন্দুস্তানী বলে পরিচয় দিতেন, বাঙালি বলে তারা নিজেদের পরিচয়ও দিতেন না । মুঘল সম্রাটরা দিল্লি থেকে সুবেদার পাঠিয়ে বাংলা শাসন করতেন। বাংলার আবহাওয়া এই সুবেদারদের পছন্দ ছিলনা।
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাদের কোন টান ছিল না। জনগণের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে দিল্লির দরবার পাঠানোই ছিল তাদের কাজ। তারা কিছুদিন বাংলায় থেকে ফিরে যেত, যাওয়ার সময় ব্যক্তিগত ভাবে লক্ষ লক্ষ টাকার অর্থ সম্পদ সঙ্গে নিয়ে যেত। এই ভাবে ক্রমে ক্রমে বাংলা অর্থ-সম্পদ শূন্য হতে লাগল। অপর দিকে বাঙালির রক্ত শোষন করে দিল্লিতে, আগ্রাতে শাহি অট্টলিকা, প্রাসাদ, দুর্গ তৈরি হতে লাগল।
মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব দীর্ঘ ২৫ বছর দাক্ষিণাত্য অভিযান চালিয়েছিলেন, তার এই সামরিক ব্যায়ভার বাংলাকে বহন করতে হয়েছিল। “বাংলাদেশ হইতে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর আমলে উদ্বৃত্ত রাজস্ব গড়ে এক কোটি টাকা প্রতি বৎসর বাদশাহের নিকট পাঠান হইত। শুজাউদ্দীন প্রতি বৎসর এক কোটি পঁচিশ লক্ষ টাকা পাঠাইতেন। তাঁহার ১২ বৎসর রাজত্বকালে মোট ১৪,৬২, ৭৮,৫৩৮ টাকা দিল্লীতে প্রেরিত হয়। পূর্বেকার সুবাদারগণও এইরূপ রাজস্ব পাঠাইতেন এবং পদত্যাগ করিয়া যাইবার সময় সঞ্চিত বহু টাকা সঙ্গে লইয়া যাইতেন।
শায়েস্তা খাঁ বাইশ বৎসরে আটত্রিশ কোটি এবং আজিমুদ্দীন (আজিমুসসান) নয় বৎসরে আট কোটি টাকা সঞ্চয় করিয়াছিলেন এবং এই টাকাও বাংলা দেশ হইতে দিল্লীতে গিয়াছিল। অন্যান্য সুবাদার ও কর্মচারীরা কত টাকা বাংলা দেশ হইতে লইয়া গিয়াছিলেন তাহা সঠিক জানা যায় না । এই পরিমাণ রূপার টাকা গাড়ী বোঝাই হইয়া দিল্লীতে চলিয়া যাইত। এইরূপ শোষণের ফলে বাংলাতে রৌপ্যমুদ্রার চলন অত্যন্ত কমিয়া যায়।”
মুর্শিদকুলী খান বাংলার নবাব হওয়া পর একপ্রকার স্বাধীন ভাবে বাংলা শাসন করতেন, যদিও তাকে প্রতিবছর এক কোটি টাকা দিল্লিতে পাঠাতে হতো।
জমিদারী প্রথা
পূর্বের স্বাধীন সুলতানি আমলে যেখানে সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার করা হতো, সেখানে মুঘল আমলে সরকারি কাজে ফার্সীকে প্রাধান্য দেওয়া হতে লাগল। নবাব মুর্শিদকুলী খানের আমলে ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ প্রভৃতি শ্রেণীর হিন্দুরা ফার্সী ভাষা শিখে নবাবের দরবারে উচ্চপদ অধিকার করতে লাগলেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ নবাবের অনুগ্রহে জমিদারী লাভ করে রাজা, মহারাজা খেতাব পেলেন।
মুর্শিদকুলী খানের পরবর্তী নবাবেরাও এই নীতি অনুসরণ করায় অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এক হিন্দু অভিজাত সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হল। মুর্শিদকুলীর অধীনে ষোল জন খুব বড় জমিদার ছিলেন এবং ৬১৫টি পরগনার খাজনা তাঁরাই আদায় করতেন । ছোট ছোট জমিদার ও তালুকদারদের হাতে আরও প্রায় ১৬০০ পরগনার খাজনা আদায়ের ভার ছিল। ছোট বড় জমিদারদের প্রায় তিন চতুর্থাংশ এবং তালুকদারদের অধিকাংশই হিন্দু ছিল ।
আজকাল হিন্দুদের মধ্যে খান, দস্তিদার, সরকার, বক্সী, কানুনগো, চাকলাদার, তরফদার, লস্কর, হালদার, গোলদার, চোপদার, জোয়ারদার, তালুকদার, দস্তিদার, পোদ্দার, সিকদার, মজুমদার, অধিকারী, খান, নায়েক, চৌধুরি, দেওয়ান, কানুনগো, খাসনবিশ প্রভৃতি উপাধিধারীদের পূর্বপুরুষেরা মুর্শিদকুলীর আমলে বা তাঁর পরবর্তী কালে ঐ সব রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন।
