পশ্চিমবঙ্গের খারিজি মাদ্রাসা এবং আমাদের করণীয়
রাজ্যে নতুন কোনো সরকার ক্ষমতায় এলেই খারিজি মাদ্রাসাগুলোকে বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হয়। এর পেছনে সরকারপক্ষের অজ্ঞতা এবং এক শ্রেণীর মানুষের সাম্প্রদায়িক মানসিকতা যদি দায়ী হয়, তবে বাঙালি মুসলমান সমাজের ভূমিকাও অনেকাংশে দায়ী। মুসলমান সমাজের হাফেজ, মাওলানা, মুফতি, মসজিদের ইমাম এই খারিজি মাদ্রাসাগুলো থেকেই পাওয়া যায়। হাফেজ, মাওলানা, মুফতি, মসজিদের ইমাম ছাড়া মুসলমান সমাজ অচল। কিন্তু শিক্ষিত, পয়সাওয়ালা মুসলমানদের ১%ও নিজেদের ছেলে-মেয়েদেরকে খারিজি মাদ্রাসায় পড়তে পাঠায় না। সমাজের একেবারেই হতদরিদ্র, অনাথ-এতিম, বিধবা বা স্বামীপরিত্যক্তা মায়ের সন্তানেরা মূলত খারিজি মাদ্রাসায় পড়তে আসে। ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি এখানে দুবেলা অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। সরকারি সাহায্য নয়, মুসলমানদের দেওয়া জাকাত, ফিতরা, কোরবানি, দান-সাদকা, হাদিয়া, বছরে একটা-দুটো জলসা এই মাদ্রাসাগুলোর আয়-ইনকামের একমাত্র উৎস। যে বা যারা এই মাদ্রাসাগুলোতে জাকাত বা দান করে থাকেন, তারা শুধুমাত্র পুণ্য অর্জনের জন্যই দান করে থাকেন, এছাড়া তাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। তাই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারা এই মাদ্রাসাগুলো নিয়ে তাদের কোনো চিন্তাভাবনাও নেই।
এই রাজ্যে মূলত তিন ধরনের মাদ্রাসা রয়েছে। এক, সরকারি অনুমোদন ও আর্থিক অনুদানপ্রাপ্ত। দুই, সরকারের স্বীকৃতি পেলেও অনুদান থেকে বঞ্চিত এবং তিন, সরকারি অনুমোদন নেই ও অনুদান পায় না এমন মাদ্রাসা। তৃতীয় ধারাটিই খারিজি বা নিজামিয়া মাদ্রাসা নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে খারিজি মাদ্রাসার সংখ্যা আনুমানিক ৫-৬ হাজারের মতো।
পশ্চিমবঙ্গে সরকারি অনুমোদন ও আর্থিক অনুদানপ্রাপ্ত মাদ্রাসাগুলি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থারই অংশ। সরকারি অনুমোদন ও অনুদান দুই-ই পায় এমন মাদ্রাসার সংখ্যা ৬১৪। এর মধ্যে ‘হাই মাদ্রাসা’ ৫১২টি, সিনিয়র মাদ্রাসা ১০২টি। এ সব মাদ্রাসা পরিচালনা করে মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদ। অন্যান্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের চেয়ে এখানে বাড়তি ইসলাম ধর্ম ও আরবি ভাষা শিক্ষার সুযোগ আছে।
পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের হিসেব অনুযায়ী, অনুমোদিত ৬১৪টি মাদ্রাসার মধ্যে ৫৫৪টি কো-এড, অর্থাৎ ছেলে-মেয়ে একসঙ্গেই পড়ে সেখানে। ৫৭টি শুধু মেয়েদের জন্য, তিনটি ছেলেদের জন্য। ১৭টি মাদ্রাসা উর্দু মাধ্যমের। অনুমোদিত মাদ্রাসার মধ্যে ১৮৩টিতে বৃত্তিমুখী শিক্ষা দেওয়া হয়। হাই মাদ্রাসা এবং সিনিয়র মাদ্রাসায় হিন্দু, মুসলমান, আদিবাসী—সব ধর্ম-সম্প্রদায়ের ছাত্র-ছাত্রীরা পড়ে, এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে অধিকাংশই হিন্দু ধর্মাবলম্বী।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে খারিজি মাদ্রাসাগুলি। পশ্চিমবঙ্গে খারিজি মাদ্রাসাগুলি অসংগঠিত, একটির সঙ্গে অপরটির যোগসূত্র নেই। এগুলি স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হয়। সরকারি অনুদান যেহেতু নেই, সেই কারণে এগুলির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণও নেই। এই মাদ্রাসাগুলি সম্পর্কে সরকারের কাছেও নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তাই রাজ্যে খারিজি মাদ্রাসার মোট সংখ্যা কত, সেটাও নির্দিষ্টভাবে বলা মুশকিল। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় আনুমানিক ৫-৬ হাজার খারিজি মাদ্রাসা রয়েছে। কেন্দ্রীয় বোর্ড বা পরিচালন পর্ষদ না থাকায় মাদ্রাসা বা শিক্ষার্থীর মোট সংখ্যা কত, তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না।
মূলত রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রামের গরিব, অশিক্ষিত বা অল্প-শিক্ষিত অভিভাবক তাঁর ছেলে-মেয়েকে আবাসিক খারিজি মাদ্রাসায় ভর্তি করেন, কারণ এখানে পড়াশোনা করার সঙ্গে সঙ্গে দু-বেলা পেট ভরে খেতে পাওয়া যায়। অবশ্য এমন অনেক অভিভাবকও রয়েছেন, যারা প্রজন্ম পরম্পরায় এই শিক্ষাব্যবস্থার শরিক। তাই তারা নতুন প্রজন্মকেও খারিজি মাদ্রাসায় পাঠাতে পছন্দ করেন।
ইতিহাস
ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সাফা পর্বতের পাদদেশে জায়েদ-বিন-আরকামের বাড়িতে—যেখানে স্বয়ং হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছিলেন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী ছিলেন তাঁর কয়েকজন নওমুসলিম অনুসারী।
হিজরতের পর মদিনায় মসজিদে নববীর পাশে স্থাপিত হয় মাদ্রাসা আল-সুফফাহ। এটা প্রথমদিকে মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আদেশ দেন এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দিতে, তখন থেকে এটা পরিচিতি পায় আল-সুফফাহ নামে; এর অর্থ ছায়া।
গৃহহীন এবং অবিবাহিত মুহাজির, যাদের কোনো আত্মীয় ছিল না মদিনা নগরীতে, আল-সুফফায় বাস করে তারা প্রধানত কুরআন এবং সুন্নাহ শিখতে থাকেন। এই লোকেরা “আসহাব আল-সুফফাহ” নামে পরিচিত ছিল। আল-সুফফাহ ইসলামের ইতিহাসে প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল। মুহাম্মদ (সা.) তাদের সাথে ওঠা-বসা করতেন, একসঙ্গে আলাপ করতেন এবং তাদের খাবার খেতে নিজের বাড়িতে ডেকে আনতেন ও নিজের পানীয় তাদের সঙ্গে ভাগ করে খেতেন। সাহাবিরা আসহাবে সুফফার দুই বা তিনজন করে সদস্যকে নিজেদের ঘর থেকে খাবার খাওয়াতেন।
আল-সুফফাহ মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন উবাদা-ইবন সামিত, আর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন আবু হুরাইরা (রা.), মুয়াজ-ইবন জবল (রা.), গিফারি (রা.) প্রমুখের মতো বিখ্যাত সাহাবিরা। সেকালের মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে ছিল—কোরআন, হাদিস, ফিকাহ, প্রাথমিক চিকিৎসা, বংশশাস্ত্র, তাজবিদ (শুদ্ধভাবে পড়া) ইত্যাদি। এছাড়া অশ্বচালনা, যুদ্ধবিদ্যা, হস্তলিপি বিদ্যা, শরীরচর্চা ইত্যাদিও পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সুন্নাহ শিক্ষা ছিল আল-সুফফাহ মাদ্রাসার গুরুত্বপূর্ণ দিক। যেহেতু সে সময়ে মসজিদে নববী থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা হতো, তাই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, কূটনৈতিক, সামরিক ইত্যাদি সবকিছুরই ব্যবস্থাপনা এবং নীতি নির্ধারণ আল্লাহর রসুল (সা.) এখান থেকেই করতেন এবং আল-সুফফাহর ছাত্ররা সেখানে উপস্থিত থেকে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করতে পারতেন। এ-সবকিছুই সুন্নাহ শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ধারণা করা হয় যে মোট ৩০০ থেকে ৪০০ জন সদস্য আল-সুফফায় ছিলেন। মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পরলোকগমনের আগে এটি প্রায় নয় বছর স্থায়ী ছিল। পরে, আল-সুফফাহর ছাত্রদের প্রত্যেককেই বিভিন্ন প্রদেশের শাসক বা আমির হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল।
বাংলায় মাদ্রাসা
বাংলার প্রথম মুসলিম শাসক ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলার রাজধানী গৌড়ে একটি মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ করেন। তারপর থেকে গৌড়ের সুলতান, মুঘল সুবেদার এবং মুর্শিদাবাদের নবাবেরা সারা বাংলা জুড়ে অসংখ্য মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ করেন। বাংলার প্রায় প্রত্যেক গ্রামে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৮৩৫-৩৮ সালের অ্যাডামস রিপোর্টে উইলিয়াম অ্যাডামস বলেন যে, তিনি নিজে বাংলাতে এরকম ১ লক্ষ বিদ্যালয় দেখেছেন। মুসলমান শাসনামলে মাদ্রাসা পরিচালনার জন্য সরকার এগুলির জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লাখেরাজ (নিষ্কর) জমি বরাদ্দ দিত। মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের জন্য সরকার ভাতা ও বৃত্তি দিত। মাদ্রাসায় হিন্দু, মুসলমান—সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ছাত্ররা বিনামূল্যে পড়তে পারত।
সুলতানি আমলে মাদ্রাসার পাঠক্রমে ছিল কোরআন, হাদিস, ফিকাহ (আইনশাস্ত্র), তাসাউফ (অতীন্দ্রিয়বাদ), ভাষা (বাংলা, আরবি, ফারসি), সাহিত্য, অলঙ্কারশাস্ত্র, বাগবিধি, রূপতত্ত্ব, জ্ঞানতত্ত্ব, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, নির্মাণবিদ্যা, বাস্তুবিদ্যা, ব্যাকরণ, পাটিগণিত, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, বক্তৃতাশাস্ত্র ইত্যাদি।
ইংরেজরা ক্ষমতা দখলের পর বাংলায় সরকারি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়। ইংরেজ সরকার আবিষ্কার করে যে বাংলার প্রায় ২৫ শতাংশ জমি লাখেরাজ হয়ে আছে। ব্রিটিশ সরকার এই সমস্ত লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেয়। তার ফলে মাদ্রাসাগুলো বন্ধ হয়ে যায়, সারা বাংলাতে অশিক্ষার অন্ধকার ঘনিয়ে আসে, এবং এই মাদ্রাসাগুলোর ওপর নির্ভরশীল কয়েক লক্ষ মানুষ রাতারাতি কর্মহীন বেকার হয়ে পড়ে, বহু শিক্ষিত পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়।
উইলিয়াম হান্টার লিখেছেন, এর ফলে “শত শত মুসলমান পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল এবং তাদের শিক্ষাপ্রণালী, যা এতদিন লাখেরাজ ওয়াকফের জমিজমার ওপর নির্ভরশীল ছিল, মারাত্মক আঘাত পেল। মুসলমান আলিম-সমাজ প্রায় আঠারো বছরের হয়রানির পর একেবারে ধ্বংস হয়ে গেল।”
বাংলার গভর্নর লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এই মাদ্রাসাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারের জন্য কিছুসংখ্যক মুসলিম আইন অফিসার তৈরি করা।
কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি নতুন ধারা প্রবর্তন করে। এই মাদ্রাসার প্রথম প্রধান মৌলভি বাহরুল উলুম (বিদ্যাসাগর) মোল্লা মজদুদ্দীন। তিনি দরসে নিজামির পাঠক্রম দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সেই আদলে নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করেন। হেস্টিংস কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে তিনি এই পাঠক্রমে ইসলামী আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেন।
সেই সময় কিছু শিক্ষিত বিত্তবান মুসলমান অবিভক্ত বাংলা অঞ্চলে আরও কয়েকটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এগুলো সব তখন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার পাঠক্রম অনুযায়ী পরিচালিত হতো। এই পাঠক্রম অনুযায়ী একজন ছাত্রকে ১৭/১৮ বছর বয়সেই আরবি ও ফার্সি ভাষায় লিখিত নির্বাচিত ৯৯টি গ্রন্থের অন্তত একটি পড়ার ও অনুধাবনের যোগ্যতা অর্জন করতে হতো। ধর্মীয় পাঠ্যক্রম ছাড়া এই পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত ছিল ইউনানি চিকিৎসাবিদ্যা, কুটির শিল্প ও কারিগরি প্রশিক্ষণ। মোট শিক্ষাকাল ৯ বছর।
রাজা রামমোহন রায়, মুন্সি প্রেমচাঁদ, প্যারীচাঁদ মিত্র, ভারতেন্দু হরিশচন্দ্র, পণ্ডিত রামচন্দ্র শুক্ল, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ, ড. সচ্চিদানন্দ সিনহা এবং আরও অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব মাদ্রাসায় বা পারিবারিক পরিবেশে মাদ্রাসার শিক্ষকদের কাছে শিক্ষা লাভ করেছিলেন।
সেই সময়, অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে কলকাতার ভদ্রলোকদের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু ছাত্রদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল, এমনকি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়েও মুসলমান এবং নিচু জাতের হিন্দু ছাত্র-ছাত্রীরা পড়তে পারত না। তখন মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু ছাত্রদের জন্য মাদ্রাসা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের একমাত্র মাধ্যম। নমশূদ্র মতুয়া সম্প্রদায়ের গুরুচাঁদ ঠাকুরও মাদ্রাসাতে শিক্ষালাভ করেছিলেন। ইতিহাসের অষ্টম আশ্চর্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে এই যে, এই নিচু জাতের হিন্দুরাই আজকের দিনে মাদ্রাসা বন্ধ করার জন্য আন্দোলন করছে।
১৮১৯ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন আয়রনকে প্রথম সচিব হিসেবে নিয়োগ করে। তিনি ১৮৪২ সাল পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন।
ক্যাপ্টেন আয়রন একাধিক সংস্কার কার্যকর করেন। ১৮২৭ সালের ১৫ আগস্ট মাদ্রাসার প্রথম বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ১৮২৬ সালে চিকিৎসাবিদ্যার অধ্যাপক পিটার ব্রেটনের অধীনে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় আধুনিক ভারতের প্রথম মেডিকেল ক্লাস চালু করা হয়। দশ বছর ধরে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় মেডিকেল ক্লাস চালু ছিল। পরে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য মাদ্রাসার প্রশাসন পৃথক মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার মেডিকেলের শিক্ষক এবং ছাত্রদের নিয়ে ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৮৩৬ সালে।
ক্যাপ্টেন আয়রনের প্রশাসনিক সময়েই ১৮২৬ সালে কলেজে প্রাথমিক ইংরেজি শিক্ষা চালু করা হয়। নবাব আবদুল লতিফ এবং ওয়াহিদুন্নবী এই কলেজের প্রথম ইংরেজি-শিক্ষিত ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর মাদ্রাসা শিক্ষার ওপর আঘাত নেমে আসে। কারণ ব্রিটিশ সরকার সঠিকভাবে অনুমান করেছিল যে, ওয়াহাবি বিদ্রোহের মতো ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহেও মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের ইন্ধন রয়েছে। ব্রিটিশ সরকার বাংলার মুসলিম সমাজকে ক্রমবর্ধমান সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে।
কলকাতা মাদ্রাসা কলেজ বা আলিয়া মাদ্রাসাকে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য একাধিক প্রস্তাব বিবেচনা করা হয় এবং ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
তবে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ প্রশাসন আলিয়া মাদ্রাসাকে চালু রাখার অনুমতি দেয়, কিন্তু সেখানে শুধু আরবি ভাষা ও শরিয়াহ আইন শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়। তখন থেকেই বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষা তার গুরুত্ব হারিয়ে শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয়।
বর্তমান অবস্থা
স্বাধীনতার পরেও বাংলার খারিজি মাদ্রাসাগুলোতে শুধু ধর্মশাস্ত্র পাঠের ওপর জোর দেওয়া হতো। এখন পরিস্থিতি বদলেছে, বেশিরভাগ আবাসিক খারিজি মাদ্রাসা পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ ছাত্র-ছাত্রীরা আবাসিক খারিজি মাদ্রাসায় থেকে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি মাদ্রাসা বোর্ডের সিলেবাস অনুযায়ী পড়াশোনা করে এবং মাদ্রাসা বোর্ড থেকে পরীক্ষা দিয়ে থাকে।
তবে রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এখনো কিছু খারিজি মাদ্রাসা রয়েছে, যা মাদ্রাসা বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত নয়। এই মাদ্রাসাগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে বাংলা, উর্দু, ইংরেজি এবং পাটিগণিত শিক্ষা দেওয়া হয়।
খারিজি মাদ্রাসা থেকে পাশ করার পর ছাত্ররা ইসলাম ধর্ম ও সমাজব্যবস্থার মধ্যে নিজেদের সম্পৃক্ত করে নেয়। খারিজি মাদ্রাসা থেকে পাশ করা ছাত্ররা নিজেদেরকে হাফেজ, মাওলানা, ক্বারি, মুফতি প্রভৃতি পরিচয়ে চিহ্নিত করে থাকেন। কিন্তু উচ্চশিক্ষা বা সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে খারিজি মাদ্রাসার সার্টিফিকেটের কোনো মূল্য নেই। মাদ্রাসাগুলোতে বৃত্তিমূলক শিক্ষারও কোনো পরিকাঠামো নেই। তাই এখানকার পড়ুয়ারা শেষ পর্যন্ত মসজিদের স্বল্প বেতনের ইমাম বা মোয়াজ্জিন হওয়াকে তাদের জীবিকা হিসেবে বেছে নিতে একপ্রকার বাধ্য হন।
ব্রিটিশ রাজের বিরোধিতায় মাদ্রাসার ছাত্ররাই সবার আগে এগিয়ে এসেছিল। সারা ভারতে, বিশেষ করে অবিভক্ত বাংলার মেদিনীপুর ও পাটনা জেলার মাদ্রাসার হাজার হাজার ছাত্র ব্রিটিশবিরোধী ওহাবি আন্দোলনে যোগ দিয়ে জেলে গিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন। বস্তুত ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ সেই জায়গাগুলোতে কিছুটা সফল হয়েছিল, যেখানে ওয়াহাবি মাদ্রাসা ছাত্রদের ঘাঁটি ছিল, বহু জায়গাতে মাদ্রাসা ছাত্ররা বিদ্রোহী সিপাহিদের নেতৃত্ব দিয়েছিল।
বর্তমানে বাংলার সীমান্ত অঞ্চলের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে অজুহাত করে দেশবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি খারিজি মাদ্রাসাগুলোকে বন্ধ করে দিতে চাইছে। যারা একসময় ব্রিটিশবিরোধী ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল, তারা যে আজকে মাদ্রাসা শিক্ষার বিরোধিতা করবে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
ভারতীয় সংবিধান সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র চালানোর অধিকার দিয়েছে। তাই রাজ্য সরকার খারিজি মাদ্রাসাগুলোর জন্য রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করতে পারে, কিন্তু কোনো সরকার খারিজি মাদ্রাসা শিক্ষাকে সংবিধানবিরোধী বলতে পারবে না, বন্ধ করতে পারবে না।
আমাদের করণীয়
বাংলার মানুষ যদি মনে করে যে সমাজে মাওলানা, হাফেজ, ক্বারি, মুফতিদের প্রয়োজন রয়েছে, তবে গা-ছাড়া মনোভাব দূরে সরিয়ে রেখে সমাজের শিক্ষিত এবং পয়সাওয়ালা মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে। খারিজি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে তার প্রাথমিক আদর্শগত অবস্থা, অর্থাৎ আল-সুফফাহর আদর্শে গড়ে তুলতে হবে। যেখানে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে, একজন পেশাজীবী বা একজন সফল ব্যবসায়ী বা একজন উচ্চপদস্থ সরকারি আমলাও তাঁর ছেলে-মেয়েকে দ্বিধাহীনভাবে খারিজি মাদ্রাসাতে পড়তে পাঠাবেন। আল-সুফফাহর সদস্যরা প্রত্যেকেই বিভিন্ন প্রদেশের আমির অর্থাৎ শাসক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। কোরআন-হাদিসের জ্ঞানের সাথে সাথে তাঁদের প্রশাসনিক এবং সামরিক দক্ষতাও ছিল বলেই সেটা সম্ভব হয়েছিল। যেমন আবু হুরাইরা (রা.) প্রথমে বাহরাইন এবং পরে একাধিকবার মদিনার শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। বাংলার খারিজি মাদ্রাসাগুলিকেও এই আদর্শেই গড়ে তোলা উচিত।
সেই সঙ্গে সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায়ের মনের সন্দেহ দূর করে আস্থা ফিরিয়ে আনতে আরও কতগুলি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
- প্রতিটি খারিজি মাদ্রাসাকে অবশ্যই রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
- খারিজি মাদ্রাসার পাঠক্রমে রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, পুরাণ অর্থাৎ প্রাচীন ভারতীয় মিথোলজিকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
- প্রতিটি খারিজি মাদ্রাসাতে খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং খারিজি মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীদের জেলা স্তরে, রাজ্য স্তরে এবং জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে হবে।
- খেলাধুলা বলতে শুধুমাত্র ব্যয়বহুল ক্রিকেট বা ফুটবলের দিকে না গিয়ে অ্যাথলেটিকস, জিমন্যাস্টিকস, বক্সিং, মার্শাল আর্ট, রাইফেল শুটিং, সাঁতারের মতো ব্যক্তিগত খেলার দিকে গেলে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক খেলায় ভালো ফল করার আশা করা যায়।
- প্রতিটি খারিজি মাদ্রাসায় ভারত সরকারের NCC বা ভারত স্কাউটস অ্যান্ড গাইডস (BSG) ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা থাকা উচিত।
উপসংহার
বর্তমানে বাংলার খারিজি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা এমন যে, এখানে ধর্মশিক্ষা ছাড়া অন্য সব শিক্ষা বন্ধ হয়ে গেছে। তারপরেও এখান থেকে পাশ করা মাওলানা, হাফেজ বা মুফতিরা নিজের মাতৃভাষায় জুমআ বা দুই ঈদের খুতবা (বক্তৃতা) দেওয়ার সাহস পর্যন্ত রাখেন না। বর্তমানে মক্কায় হজের খুতবা যখন বাংলা ভাষায় হচ্ছে, তখন বাংলার আলেম সমাজ হাজার বছরের পুরোনো আরবি কবিতা মুখস্থ পড়ে খুতবার আনুষ্ঠানিকতা পালন করছেন। মুসলমান সমাজের শিক্ষিত এবং পয়সাওয়ালা লোকেরা নিজেদের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে না এলে এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন—“নিশ্চয় আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।”
বাংলা এবং বাঙালির জন্য লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের সাহায্য করুন।
আমরা কোনো কোটিপতি বা বড় কোনো কোম্পানি নই – আমাদের পাঠকরাই আমাদের সমর্থন করেন। আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ এবং সাহসী প্রচেষ্টার জন্য অনুদান দিয়ে আমাদের পাশে থাকুন।
