আগামী আগস্ট মাসেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল পেশ হতে চলেছে। যেহেতু ভারতে রাষ্ট্রীয় স্তরে এখনো অভিন্ন দেওয়ানি আইন তৈরি হয়নি, তাই বিল তৈরির ক্ষেত্রে গুজরাটের ইউনিফর্ম সিভিল কোড বিল-২০২৬, আসামের ইউসিসি আইন এবং উত্তরাখণ্ডের ইউনিফর্ম সিভিল কোড আইন-২০২৪-কে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও আদিবাসী জনজাতি সমাজকে অভিন্ন দেওয়ানি আইনের আওতার বাইরে রাখা হচ্ছে।
দেওয়ানি আইন বলতে মূলত নাগরিকদের বিবাহ, বিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক ইত্যাদি বিষয় সংক্রান্ত আইনকে বুঝায়।
আদিবাসী সমাজে বিবাহ, বিচ্ছেদ রেজিস্টার করা হয় না, গ্রামের মোড়লরাই শেষ কথা। উত্তরাধিকার, দত্তক ইত্যাদি বিষয়ও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। পশ্চিমবঙ্গে আদিবাসী জনসংখ্যা প্রায় ৫৩ লক্ষ বা মোট জনসংখ্যার ৫.৮%। এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে অভিন্ন দেওয়ানি আইনের বাইরে রেখে কীভাবে ‘এক দেশ এক আইন’ হওয়া সম্ভব, সেটা একটি গবেষণার বিষয়।
এছাড়া পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো প্রথা যদি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকে, অনুমান করা যায় সেই সমস্ত প্রথাগুলিকে অভিন্ন দেওয়ানি আইনে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। যেমন উত্তরাখণ্ডে হিন্দুদের একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত দ্রৌপদী বিবাহ প্রথা, অর্থাৎ একজন স্ত্রীর একাধিক স্বামী থাকার প্রথাকে অভিন্ন দেওয়ানি আইনে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে সর্বপ্রথম যে প্রশ্নটা সামনে আসছে সেটা হচ্ছে —সারা দেশে ‘এক দেশ এক আইন’ বা অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু করা ভারতীয় জনতা পার্টির দীর্ঘদিনের সংকল্প। বর্তমানে বিজেপি ১৬টি রাজ্যে এবং ভারতীয় ইউনিয়নে অর্থাৎ কেন্দ্রে ক্ষমতায় রয়েছে। তাহলে বিজেপি সারা দেশে কেন্দ্রীয়ভাবে অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু না করে, মাত্র কতগুলো রাজ্যে আলাদা আলাদা করে অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু করছে কেন? এর ফলে সাধারণ মানুষ যে সমস্যায় পড়বে, তার সমাধান কীভাবে হবে?
যেমন ধরুন, যে সমস্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েরা বর্তমানে কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাঙ্গালোরে বা চেন্নাইতে থাকে, সেখানেই তাদের আধার কার্ড, ভোটার কার্ড রয়েছে, অর্থাৎ তারা বর্তমানে ব্যাঙ্গালোর বা চেন্নাইয়ের নাগরিক। সারা ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু না হয়ে শুধু মাত্র যদি পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু হয়, তবে সেই পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যু হলে তার উত্তরাধিকার কীভাবে বণ্টন হবে? কারণ ছেলে-মেয়েরা তো বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক নয়। বা যে দক্ষিণ ভারতীয় লোকেরা দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে রয়েছেন, তাঁরাও তো একই সমস্যার সম্মুখীন হবেন।
তাহলে কেন ভারতীয় জনতা পার্টি কেন্দ্রীয়ভাবে অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু না করে পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু করতে চাইছে?
এর উত্তরটা খুবই সহজ; বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকলেও এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয়ভাবে অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু করতে পারছে না, তাই চালু করছে না। কারণ ভারত সরকারের ল কমিশন অভিন্ন দেওয়ানি আইনকে অপ্রয়োজনীয় এবং অনুচিত বলে এর বিরোধিতা করেছে।
অভিন্ন দেওয়ানি আইন সম্বন্ধে ল কমিশনের অবস্থান
ল কমিশন অফ ইন্ডিয়া হলো ভারত সরকারের আইন ও বিচার মন্ত্রকের অধীনস্থ আইন সংক্রান্ত বিষয়ে সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক সংস্থা। এটি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বা কেন্দ্রীয় সরকারের অনুরোধে আইনি গবেষণা চালায় এবং আইনি সংস্কার, নতুন আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইন পর্যালোচনা করে সরকারকে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেয়।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে এবং সরকারের নির্দেশে ২১তম ল কমিশন গঠন করা হয়। সরকার ল কমিশনকে একটি অভিন্ন দেওয়ানি আইন তৈরি করতে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলি নিয়ে পর্যালোচনা করার নির্দেশ দান করে।
২১তম ল কমিশন ২০১৮ সালের আগস্টে ভারত সরকারের কাছে তাদের রিপোর্ট পেশ করে। এই রিপোর্টে কমিশন একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) “এই পর্যায়ে প্রয়োজনীয়ও নয়, কাম্যও নয়” বলে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করে। কমিশনের মতে, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য হচ্ছে ভারতের শক্তিশালী গণতন্ত্রের প্রাণ। ভারতীয় সংস্কৃতিতে যে বৈচিত্র্য রয়েছে, সে বৈচিত্র্য আমাদের উদযাপন করা উচিত। কিন্তু এর মধ্যে যে বৈষম্যগুলো রয়েছে, সেই বৈষম্যগুলো দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করা উচিত; কিন্তু বৈচিত্র্য মানেই বৈষম্য নয় এবং অভিন্ন দেওয়ানি আইন এনে সেই বৈচিত্র্যগুলিকে লুপ্ত করে দেওয়া কখনও উচিত নয়। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশই এখন সেই পথেই চলছে।
কমিশন বলে—
“While diversity of Indian culture can and should be celebrated, specific groups, or weaker sections of the society must not be dis-privileged in the process. Resolution of this conflict does not mean abolition of difference. This Commission has therefore dealt with laws that are discriminatory rather than providing a uniform civil code which is neither necessary nor desirable at this stage. Most countries are now moving towards recognition of difference, and the mere existence of difference does not imply discrimination, but is indicative of a robust democracy.”
এছাড়াও ল কমিশন তাদের রিপোর্টে এই সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তাদের সুচিন্তিত মতামত জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছে।
কমিশন জাতির সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কাঠামো গঠনকারী বৈচিত্র্য এবং বহুত্বকে সর্বোত্তমভাবে রক্ষা ও সংরক্ষণ করার চেষ্টা করার কথা বলেছে।
কমিশনের মতে, এমন অনেক বিষয়ও রয়েছে যা জনবিতর্কে প্রায়শই উঠে আসে, কিন্তু আইনের মাধ্যমে সেগুলোর সমাধান করা যায় না এবং করার প্রয়োজনও নেই।
ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটির অর্থ তখনই থাকে, যখন তা এও নিশ্চিত করতে পারে যে, শুধু ধর্মীয় নয়, আঞ্চলিক—যেকোনো ধরনের ‘ভিন্নতার’ প্রকাশ যেন সংখ্যাগরিষ্ঠের জোরালো কণ্ঠস্বরের কাছে চাপা না পড়ে; এবং একই সাথে কোনো বৈষম্যমূলক প্রথা যেন বৈধতা পাওয়ার জন্য ‘ধর্মের’ আড়ালে লুকিয়ে না থাকে।
ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার সারমর্ম হলো বিভিন্ন ভাষাভাষী ও ভিন্ন বিশ্বাসী নানা ধরনের মানুষকে স্বীকৃতি ও সংরক্ষণ করা এবং তাঁদের একত্রিত করে একটি অখণ্ড ও ঐক্যবদ্ধ ভারত গঠন করা।
কমিশন ভারতবাসীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে —
আইন প্রণয়নের সময় এটি অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে আমাদের অভিন্নতার আকাঙ্ক্ষাই যেন দেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার জন্য হুমকির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।
কিন্তু কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ২১তম ল কমিশনের সুপারিশ হিমঘরে পাঠিয়ে দিয়ে ২০২৩ সালের জুন মাসে ২২তম ল কমিশন গঠন করে এবং কেন্দ্রীয় সরকার ২২তম ল কমিশনকে অভিন্ন দেওয়ানি আইন নিয়ে আবার নতুন করে চিন্তাভাবনা করে রিপোর্ট দিতে বলে।
২২তম ল কমিশন অভিন্ন দেওয়ানি আইন নিয়ে তাদের কোনো মতামত না জানিয়ে, কোনো রিপোর্ট না দিয়ে ৩১শে আগস্ট ২০২৪-এ তাদের মেয়াদ শেষ করে।
এর অর্থ এটা হতে পারে যে, ২২তম ল কমিশন পূর্বের ২১তম ল কমিশনের রিপোর্টকে সমর্থন করছে, অথবা বিজেপি সরকার কমিশনের উপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে—তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি, তাই তারা কোনো মতামত জানায়নি।
বর্তমানে ২৩তম ল কমিশন নিয়োগের সময় হয়ে গেছে, কিন্তু বিজেপি সরকার এখনও ২৩তম ল কমিশন নিয়োগ করে উঠতে পারেনি।
এমন পরিস্থিতিতে বিজেপি সরকার সারা ভারতে কেন্দ্রীয়ভাবে অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু করতে না পেরে, নিজেদের উগ্রপন্থি হিন্দুত্ববাদী ভোট ব্যাংক ধরে রাখার জন্য এখন পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু করতে চাইছে।
ভারতে আইন সংক্রান্ত বিষয়ে সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক সংস্থা, ভারতের ল কমিশনের সুপারিশকে অগ্রাহ্য করে পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু করা কতখানি যুক্তিসঙ্গত হবে, সে ব্যাপারে বাংলার মানুষের মনে যথেষ্ট সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।
অভিন্ন দেওয়ানি আইনের মধ্যে যে মূল বিষয়গুলি নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলি নিয়ে আমরা এবার আলোচনা করব।
বিবাহ (Marriage)
ভারতে হিন্দু এবং অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে সাধারণ ধারণা রয়েছে যে — ইসলামি শরিয়তের আওতায় মুসলমান মহিলারা অত্যন্ত করুণ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন। সবাই না হলেও বেশিরভাগ মুসলমান পুরুষ চারটি করে বিয়ে করেন এবং যখন খুশি ‘তালাক’ ‘তালাক’ ‘তালাক’ বলে স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দেন। তাই অভিন্ন দেওয়ানি আইন বলবৎ করলে মুসলমান পুরুষদের একাধিক বিবাহ বন্ধ হবে এবং মুসলিম মহিলাদের সামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে।
২০১৬ সালের নভেম্বরে ২১তম ল কমিশন যখন অভিন্ন দেওয়ানি আইন নিয়ে জনগণের মতামত জানতে চেয়েছিল, তখন তারা ৭৫,৩৭৮টিরও বেশি উত্তর পায়। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এই উত্তরগুলোর অধিকাংশই মুসলমান সম্প্রদায়ের তিন তালাক নিয়ে আলোচনা করেছে। ভারতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪-২০% এবং এদের মধ্যে বেশিরভাগই ল কমিশনে নিজেদের মতামত জানানোর সামর্থ্য রাখেন না। তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে, মুসলমানদের ব্যক্তিগত আইন নিয়ে যারা ল কমিশনকে চিঠি দিয়েছিল, তারা বেশিরভাগই সংখ্যাগুরু বা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক।
এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে, সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা ভারতে মুসলমান সমাজের আইনকানুন, রীতি-নীতি নিয়ে খুবই চিন্তিত, কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘটে চলা অন্যায়, অনৈতিক আচার-আচরণ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
এই ভারতে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মানবাধিকার বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তারা নানা অজুহাতে শারিরিক ও মানষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, নিম্নবর্ণের হিন্দু মহিলেদেরকে উচ্চবর্ণের পুরুষদের অস্থাবর সম্পত্তি হিসাবে গণ্য করা হয়।
মধ্যপ্রদেশের মোরেনা জেলা (জানুয়ারি ২০২৫): জমি সংক্রান্ত বিবাদের জেরে উচ্চবর্ণের লোকজন এক দলিত নারী ও তার মেয়েকে প্রকাশ্যে রাস্তায় নির্মমভাবে মারধর করে এবং টেনে হিঁচড়ে হেনস্থা করে।
উত্তরপ্রদেশের হাথরস জেলা (সেপ্টেম্বর ২০২০): ঠাকুর সম্প্রদায়ের চার ব্যক্তির বিরুদ্ধে এক তরুণী দলিতকে নির্মমভাবে গণধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ ওঠে। প্রমাণ লোপাটের জন্য পুলিশ পরিবারের অনুপস্থিতিতে মধ্যরাতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
তামিলনাড়ুর ভিলুপুরম জেলা: রেশন দোকানে উচ্চবর্ণের এক মহিলার গায়ে ‘দুর্ঘটনাবশত’ হাত লাগানোর কারণে এক দলিত মহিলাকে মারাত্মকভাবে প্রহার করা হয় এবং তার শ্লীলতাহানি করা হয় বলে নথিবদ্ধ হয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) ও অন্যান্য সংগঠনের গবেষণা অনুযায়ী, প্রায়শই বিচার ব্যবস্থায় সামাজিক পক্ষপাতিত্ব এবং স্থানীয় চাপে নিম্নবর্ণের মহিলারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হনএবং অপরাধের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর (NCRB) তথ্য অনুযায়ী, ভারতে দলিত এবং আদিবাসী নারীদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনসহ অন্যান্য অপরাধের সংখ্যা প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই ভারতে অনেক রাজ্যে হিন্দুদের মধ্যে আজও দেবদাসী প্রথা রয়েছে। ২০০৮ সালে কর্ণাটকে ৪০,৬০০ জন দেবদাসীকে খুঁজে পাওয়া গেছে। ২০১৪-তে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসেছে, তারপরও ২০২১ সালে কর্ণাটকে ৯০ হাজারের বেশি দেবদাসী ছিল, যাদের মধ্যে ২০% এর বয়স ১৮ বছরের কম। ২০২১ সালের একটা রিপোর্টে বলছে তখনও সারা ভারতে প্রায় ৪,৫০,০০০এর বেশি দেবদাসি ছিল. আজকে এই ২০২৬ সালেও হিন্দুদের মধ্যে দেবদাসী প্রথা আছে।
এই ভারতে হিন্দু এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে এখনো ডাইনি বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে; প্রতি বছর ডাইনি সন্দেহে অনেক নিরীহ, নিরাপরাধ বৃদ্ধা মহিলাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়।
এই ভারতে হিন্দুদের মধ্যে এখনও নরবলি, শিশুবলি প্রথা প্রচলিত রয়েছে,
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, এই সব বিষয়গুলি নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায় থেকে কোনো লোক ল কমিশনে অভিযোগ জানাতে যায়নি, তাদের যত উদ্বেগ মুসলিম সমাজের, ৪টি বিবাহ এবং তিন তালাক প্রথা নিয়ে।
কিন্তু সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের এই উদ্বেগ কতখানি যুক্তিযুক্ত?
ভারত সরকারের ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য আমাদের সামনে রয়েছে —
২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী ভারতের মোট জনসংখ্যা ছিল ১২১,০৮,৫৪,৯৭৭ জন
হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ৯৬,৬২,৫৭,৩৫৩ জন – মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০%
এবং মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ১৭,২২,৪৫,১৫৮ জন – মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪%
ভারতে বিবাহিত নারী-পুরুষের মোট সংখ্যা ছিল ৫৭,৯৫,৮৪,৭৮৩ জন – মোট জনসংখ্যার ৪৮%
যেখানে হিন্দু বিবাহিত নারী-পুরুষের সংখ্যা ছিল ৪৭,১৩,৯৭,৯০০ জন – মোট হিন্দু জনসংখ্যার ৪৯%, যা জাতীয় গড় ৪৮%এর চাইতে বেশি।
অপর দিকে মুসলিম বিবাহিত নারী-পুরুষের সংখ্যা ছিল ৭,৩৬,৮১,৯০১ জন – মোট মুসলিম জনসংখ্যার ৪৩%, যা কিনা শতাংশের হিসাবে হিন্দুদের থেকে এমনকি জাতীয় গড়ের থেকেও অনেক কম।
আমরা জানি ভারতে কয়েক কোটি হিন্দু সাধু রয়েছেন, অনেক হিন্দু রাজনীতিবিদ রয়েছেন যারা বিবাহ করেন না—মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে যেটা সাধারণত দেখা যায় না। তারপরেও বিবাহিত হিন্দু নারী-পুরুষের শতাংশ বিবাহিত মুসলিম নারী-পুরুষের শতাংশের থেকে অনেক বেশি। এটি সত্যিই একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার। যদি হিন্দু বিবাহিত পুরুষরা সবাই একটাই বিয়ে করে সন্তুষ্ট থাকত এবং মুসলিম পুরুষদের বেশিরভাগ লোক একটার বেশি বিয়ে করত, তাহলে এই ফলাফলটা উল্টো হতো। অর্থাৎ শতাংশের বিচারে বিবাহিত মুসলিমদের জনসংখ্যা বিবাহিত হিন্দু জনসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি হতো। এর থেকে বোঝা যায় হিন্দু পুরুষদের একাধিক বিবাহ আইনত নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে হিন্দু পুরুষদের একাধিক বিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি, এবং তাদের শতাংশের বিচারে মুসলিমদের থেকে তাদের সংখ্যা বেশি।
ভারতের ২১তম ল কমিশনও তাদের রিপোর্টে এই ব্যাপারটা উল্লেখ করেছে—
“Anthropological evidence has shown that bigamous arrangements among Hindus continue to exist and have local recognition despite their being a law against it.” (নৃতাত্ত্বিক প্রমাণে দেখা গেছে যে, এর বিরুদ্ধে আইন থাকা সত্ত্বেও হিন্দুদের মধ্যে দ্বি-বিবাহ প্রথা এখনও বিদ্যমান এবং স্থানীয়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।)
ল কমিশন আরও বলেছে যে—
“Although polygamy is permitted within Islam, it is a rare practice among Indian Muslims, on the other hand it is frequently misused by persons of other religions who convert as Muslims solely for the purpose of solemnising another marriage rather than Muslim themselves.” (যদিও ইসলামে বহুবিবাহ অনুমোদিত, ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে এটি একটি বিরল প্রথা। অন্যদিকে, অন্য ধর্মের ব্যক্তিরা প্রায়শই এর অপব্যবহার করে, যারা নিজেরা প্রকৃত মুসলিম হওয়ার পরিবর্তে শুধুমাত্র অন্য একটি বিবাহ সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।)
ভারত সরকারের ২০১৯-২১ সালের স্যাম্পল ডেটা (NFHS-5, 2019-21) অনুযায়ী ভারতে বহুবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি আদিবাসী (Scheduled Tribes বা ST) জনগোষ্ঠীর মধ্যে (১.৫%) এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে এর হার সবচেয়ে বেশি, মেঘালয়ে (৬.১%), মিজোরামে (৪.১%) এবং অরুণাচল প্রদেশে (৩.৯%)। এবং আমরা জানি এই রাজ্যগুলোতে মুসলমান সম্প্রদায়ের উপস্থিতি নেই বললেই চলে।
অভিন্ন বিবাহ বিধিতে আপত্তির কারণ
শুধু আইন করে পুরুষের একাধিক বিবাহ বন্ধ করলে সমাজে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ব্যভিচার বৃদ্ধি পাবে। হিন্দু বিবাহ আইনে একজন হিন্দু পুরুষের একই সময়ে একাধিক স্ত্রী রাখা আইনত দণ্ডনীয় হলেও, হিন্দু পুরুষদের একাধিক বিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি — ২১তম ল কমিশনের রিপোর্টে তার উল্লেখ রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি সংবাদপত্রে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কলকাতার গড়িয়া এলাকার (কৌশিক দত্ত এবং দুই বোন ঝুমা ও সোমা) কিংবা মহারাষ্ট্রের সোলাপুরের যমজ দুই বোনের এক পাত্রকে বিয়ে করার খবরগুলো আমরা দেখেছি, উত্তরপ্রদেশের অমরোহ জেলার হাসানপুরের ধৌরিয়া গ্রামের বাসিন্দা সরোজ, সাবিত্রী এবং সন্তোষ তিন বোন গত ১৭ জুলাই ২০২৬, চামুণ্ডা মাতা মন্দিরে বিকাশ নামের এক যুবকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। হিন্দু আইনে সম্পূর্ণ অবৈধ হলেও সামাজিকভাবে সেগুলো ঘটেছে।
গুড়গাঁওয়ের একটা ঘটনা সামনে এসেছে যেখানে পারিবারিক আদালত একজন হিন্দু পুরুষকে একসঙ্গে একজন স্ত্রী এবং একজন লিভ-ইন পার্টনার রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
অভিন্ন দেওয়ানি আইন পুরুষের বহুবিবাহকে নিষিদ্ধ করলেও বিবাহিত বা অবিবাহিত নারী-পুরুষের বহুগামিতাকে নিষিদ্ধ করে না। বর্তমানে যৌনসেবা ভারতে একটি আদালত স্বীকৃত পেশা। ২০২২ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটি ঐতিহাসিক নির্দেশনায় জানায় যে, যৌন ব্যবসাও একটি ‘পেশা’ এবং অন্যান্য নাগরিকদের মতো যৌনকর্মীরাও আইনের চোখে সমান সুরক্ষা ও সম্মানের অধিকারী। পুলিশ যেন স্বেচ্ছায় এই কাজ করা প্রাপ্তবয়স্ক যৌনকর্মীদের হেনস্থা বা ফৌজদারি মামলায় না জড়ায়।
একটা রিপোর্টে কলকাতাকে এশিয়ার বৃহত্তম যৌন বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু কলকাতাতেই ৬০,০০০ এর বেশি মহিলা যৌনকর্মী রয়েছেন, সারা পশ্চিমবঙ্গে এই সংখ্যাটা ৪,৫৫,০০০ এর বেশি এবং এদের গ্রাহকদের মধ্যে বিবাহিত পুরুষদের সংখ্যাই বেশি। অনুমান করা যেতে পারে প্রত্যহ কয়েক লক্ষ পুরুষ গ্রাহক হিসেবে এদের কাছে যাতায়াত করে এবং এটি আইনত কোনো অপরাধ নয়।
অভিন্ন দেওয়ানি আইন একাধিক বিবাহ বন্ধ করার কথা বললেও পরকীয়া বন্ধ করার কথা বলে না। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ নম্বর ধারা বাতিল করে দেয়। এর ফলে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়া ভারতে এখন কোনো ফৌজদারি অপরাধ (Criminal Offence) নয়। অর্থাৎ, এই কারণে পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারে না বা কোনো জেল-জরিমানা হয় না।
সুপ্রিম কোর্টের মতে, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ ভারতের প্রত্যেক নাগরিককে নিজস্ব জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা দিয়েছে। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কার সাথে থাকবেন, সেটি তাঁদের একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
সাধারন মানুষের আপত্তিটা ঠিক এখানেই। যেখানে পুরুষ যদি তার যৌন প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বিবাহ করে বসে, তবে সেটাকে আইনত অপরাধ হিসাবে গণ্য় করা হচ্ছে। অথচ ব্যভিচারী হওয়া, লিভ-ইন সম্পর্কে থাকা, পরকীয়া করা বা যৌনকর্মীর কাছে যাওয়া, আইনত কোনো অপরাধ নয়।
পাকিস্তান, বাংলাদেশ সহ বেশিরভাগ মুসলিম দেশে লিভ-ইন সম্পর্ক, পরকীয়া, যৌনকর্মী পেশা আইনত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তার জন্য কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে।
ভারতের ২১তম ল কমিশন এইসব কিছু বিবেচনা করে, তার ১৮তম প্রতিবেদনে অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু করে মুসলমান পুরুষদের একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে, তাতে কিছু কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করার কথা বলেছে। এবং ল কমিশন এই প্রথমবার ইসলামী আইনের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটকে স্বীকার করে এব্যাপারে পাকিস্তানে প্রচলিত আইনকে অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছে—
পাকিস্তান কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে বহুবিবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে সফল হয়েছে। ২০১৭ সালে লাহোরের একটি আদালত রায় দেয় যে, বর্তমান স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করা ‘আইন ভঙ্গের’ শামিল। লাহোর আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ২,০০,০০০ পাকিস্তানি রুপি জরিমানা প্রদানের আদেশ দেয়।
পাকিস্তানে সাধারণভাবে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ, কিন্তু যদি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় বিবাহ করতে হয়, তবে সালিশি পরিষদের কাছে লিখিতভাবে একটি আবেদন করতে হবে। এই আবেদনের জন্য বর্তমান স্ত্রী/স্ত্রীদের কাছ থেকে আগেথেকে অনুমতি নিতে হবে। সালিশি পরিষদ আবেদনটি মঞ্জুর করবে কি না, সে বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করবে এবং এই সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। তবে, স্বামী যদি সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করেন, তাহলে তিনি অবিলম্বে তাঁর বর্তমান স্ত্রী/স্ত্রীদেরকে দেনমোহরের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন এবং অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি এর জন্য দণ্ডিত হতে পারেন।
মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে এই ধরনের সংস্কার, অর্থাৎ বহুবিবাহের উপর কঠোর শর্ত আরোপ করে একবিবাহ প্রথা বলবৎ করা, পাকিস্তান ছাড়াও মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিশর, সিরিয়া, লেবাননের মতো বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়িত হয়েছে।
লিভ-ইন সম্পর্ক বা একত্রবাস
ভারতে জাতীয় স্তরে এখনও কোনো অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হয়নি। তবে উত্তরাখণ্ড, গুজরাট ও আসাম অর্থাৎ যে রাজ্যগুলো এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি পাস করেছে, সেখানে লিভ-ইন রিলেশনশিপকে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে এবং নিবন্ধন (Registration) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, অন্যথায় শাস্তির বিধান রয়েছে। সেই সঙ্গে বিবাহিত নারী-পুরুষ, অথবা বর্তমানে লিভ-ইন সম্পর্কে রয়েছেন এমন কেউ নতুন করে লিভ-ইন রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন না, তার বিধান রয়েছে। অনুমান করা যায় পশ্চিমবঙ্গেও একই ধরনের বিধান আসতে চলেছে।
আপত্তির কারণ:
অভিন্ন দেওয়ানি আইনে লিভ-ইন রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হলেও পরকীয়া বন্ধ করার কথা বলা হয়নি।
২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ নম্বর ধারা বাতিল করে দেয়। এর ফলে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়া ভারতে এখন কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। অর্থাৎ, এই কারণে পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারে না বা কোনো জেল-জরিমানা হয় না।
সুপ্রিম কোর্টের মতে, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ ভারতের প্রত্যেক নাগরিককে নিজস্ব জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা দিয়েছে। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কার সাথে থাকবেন, সেটি তাঁদের একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
অভিন্ন দেওয়ানি আইনে লিভ-ইন সম্পর্কের উপর কঠোরতা আরোপ করে প্রকারান্তরে পরকীয়াকেই উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
কাজিন ম্যারেজ (আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ)
ইসলাম ধর্মে কাজিন ভাই-বোনদের বিবাহ বৈধ এবং প্রথম থেকেই প্রচলিত রয়েছে, তবে একসঙ্গে দুই বোন কে বিবাহ করা যায় না। যে রাজ্যগুলিতে অভিন্ন দেওয়ানি আইন পাস হয়েছে, সে রাজ্যগুলিতে কাজিন ম্যারেজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গেও কাজিন ম্যারেজ নিষিদ্ধ হতে চলেছে।
হিন্দু ম্যারেজ আইনে কাজিন ম্যারেজ উত্তর ভারতে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও দক্ষিণ ভারতের অনেক অংশে কাজিন ম্যারেজ আইনত বৈধ। যেমন তামিলনাড়ুর হিন্দুদের মধ্যে মামা এবং ভাগ্নির মধ্যে বিবাহ বৈধ এবং এই বিবাহকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয়। দীর্ঘকালের ঐতিহ্য বলে যেখানে দ্রৌপদী বিবাহ প্রথাকে বহাল রাখা হয়েছে, মামা-ভাগ্নির বিবাহ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা হয় না, সেখানে মুসলমানদের কাজিন ভাই-বোনদের বিবাহ নিষিদ্ধ করা রাজনৈতিক দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছু নয়।
একটা সময় ছিল, যখন মুসলমান সমাজে কাজিন ভাই-বোনদের বিবাহকে উৎসাহ দেওয়া হতো। এর পিছনে কোনো ধর্মীয় কারণ ছিল না। সে সময় কৃষি জমি ছিল গ্রামীণ আয়ের প্রধান উৎস। মূলত পারিবারিক কৃষিজমি যাতে হস্তান্তর না হয়ে যায়, তার জন্যই কাজিন ভাই-বোনদের বিবাহকে উৎসাহ দেওয়া হতো। বর্তমানে আগের পরিস্থিতি আর নেই, তাই কাজিন ভাই-বোনদের বিবাহতে মানুষের উৎসাহও আর নেই।
বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে মুসলমানরা বেশিরভাগই কাজিন ম্যারেজ করে এবং সে জন্য মুসলমানদের মধ্যে জিনগত রোগ বেশি দেখা যায়। কিন্তু এই ধারণার স্বপক্ষে কোনো প্রামাণ্য তথ্য নেই। বেশিরভাগটাই হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান। মুসলমানদের মধ্যে কাজিন ম্যারেজ রয়েছে, তাই মুসলমানদের মধ্যে জিনগত রোগ বেশি — এই ধারণা পুরোপুরি ভুল। ভারত সরকারের তথ্য সেই কথাই বলছে।
ভারতে সম্প্রদায়, জাতি এবং উপজাতি ভিত্তিক জিনগত রোগের (Genetic Disorders) ইতিহাস ও পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। ইসলাম বা মুসলমানদের কাজিন ম্যারেজের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন—
ক) বিটা-থ্যালাসেমিয়া (Beta-Thalassemia)
- সিন্ধি, লোহানা এবং কচ্ছের ভানুশালী সম্প্রদায়: এদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়ার বাহকের হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৮% থেকে ১৫%।
- পাঞ্জাবি এবং খত্রী সম্প্রদায়: এদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়ার বাহকের হার প্রায় ৪% থেকে ৬.৫%।
- পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ও কায়স্থ সম্প্রদায়: কিছু আঞ্চলিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের নির্দিষ্ট কিছু গ্রামীণ মুসলিম পকেট এবং কিছু উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে এই বাহকের হার ৪% থেকে ৮% পর্যন্ত পৌঁছায়।
খ) সিকল সেল অ্যানিমিয়া (Sickle Cell Anemia) এটি মূলত ভারতের আদিবাসী (Scheduled Tribes) এবং নির্দিষ্ট কিছু অনগ্রসর সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
- আদিবাসী বেল্ট: মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড় এবং महाराष्ट्रের আদিবাসী জনসংখ্যায় সিকল সেল জিনের বাহকের হার ১০% থেকে ৪০% পর্যন্ত হতে পারে।
- কেন্দ্রীয় সরকারের ডেটা অনুযায়ী, ভারতের প্রতি ৮-১০ জন আদিবাসী শিশুর মধ্যে ১ জন সিকল সেল অ্যানিমিয়ার বাহক হিসেবে জন্মায়।
ক্ষুদ্র সম্প্রদায় ভিত্তিক রোগ (Founder Effect)
- পার্সি সম্প্রদায় (Parsis): G6PD ডেফিসিয়েন্সি—এদের মধ্যে এই এনজাইমের ঘাটতি প্রায় ১২% থেকে ১৫% পুরুষের মধ্যে দেখা যায়, যার ফলে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ খেলে রক্তকণিকা ভেঙে যায়। এছাড়া এদের মধ্যে স্তন ও প্রোস্টেট ক্যান্সারের জিনগত প্রবণতা বেশি।
- অশোকেনাজি ইহুদি (Ashkenazi Jews): টে-সাক্স রোগ (Tay-Sachs Disease)—একটি মারাত্মক স্নায়বিক রোগ, যা এই সম্প্রদায়ের জিনগত বৈশিষ্ট্যের সাথে যুক্ত।
- আগরওয়াল ও বৈশ্য সম্প্রদায়: সিউডোকোলিনএস্টারেজ ডেফিসিয়েন্সি (Pseudocholinesterase Deficiency)—এই সম্প্রদায়ের মানুষের অস্ত্রোপচারের সময় সাধারণ অ্যানেস্থেশিয়া (যেমন- সাক্সামেথোনিয়াম) দিলে শরীর তা সহজে বিপাক করতে পারে না, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।
- কমতি বা আর্য বৈশ্য সম্প্রদায়: অ্যানেস্থেশিয়ার প্রতি একই ধরনের মারাত্মক সংবেদনশীলতা এদের মধ্যেও পরিসংখ্যানগতভাবে অনেক বেশি দেখা গেছে।
- জাঠ ও গুজ্জর সম্প্রদায়: উত্তর-পশ্চিম ভারতের (পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান) গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি সৃষ্টিকারী জিনগত মিউটেশন (MYBPC3 deletion) জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে, যা তরুণ বয়সে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার (Sudden Cardiac Arrest) কারণ হতে পারে।
উপরের তথ্য থেকে একথা পরিষ্কার যে, ভারতে আদিবাসী এবং হিন্দু তফসিলি জাতিদের মধ্যেই জিনগত রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। অথচ দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের (custom) দোহাই দিয়ে তাদের মধ্যে কাজিন ম্যারেজকে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
এমনটাও নয় যে বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে কাজিন ম্যারেজ আইনত নিষিদ্ধ তাই কাজিন ম্যারেজ একেবারেই হয় না। এই প্রবন্ধের লেখকের অল্প বয়সের (ক্লাস ৫ থেকে ক্লাস ৯) গৃহশিক্ষক ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত বংশীয় নিষ্ঠাবান বাঙালি হিন্দু ব্রাহ্মণ, স্বর্গীয় দুর্গা ভট্টাচার্য মহাশয়। তিনি তাঁর মামাতো বোনকে বিবাহ করেছিলেন; সেই অপরাধে তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রীকে (মামাতো বোন) ত্যাজ্য পুত্র করে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।
আবার এই প্রতিবেদনের লেখক আরও একজন নিষ্ঠাবান হিন্দু ব্রাহ্মণকে জানতেন, যিনি তাঁর পিসতুতো বোনের সঙ্গে আজীবন লিভ-ইন সম্পর্কে কাটিয়ে দিলেন, কিন্তু আইনের বেড়াজালে বিবাহ করতে পারেন নি।
তাই আইন যখন দুজন প্রাপ্তবয়স্ক কাজিন নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বা একত্রবাস বন্ধ করতে পারে না, তখন অভিন্ন দেওয়ানি আইনে জোর করে কাজিন ম্যারেজকে নিষিদ্ধ করার কোনো প্রয়োজন নেই, এবং উচিৎও নয় ।
বিচ্ছেদ (Divorce)
ভারতে হিন্দুদের মধ্যে একটা বিকৃত ধারণা রয়েছে যে, মুসলমান পুরুষরা নিজেদের ইচ্ছামতো যখন খুশি তালাক দিয়ে থাকে, তাই মুসলমানদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা হিন্দুদের থেকে অনেক গুণ বেশি।
কিন্তু ভারত সরকারের পরিসংখ্যান সেকথা বলে না। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ভারতে বিবাহবিচ্ছিন্ন মানুষের জনসংখ্যা ছিল মোট ১৩৬২৩১৬ জন – মোট জনসংখ্যার ০.১১% এবং বিবাহবিচ্ছিন্ন নয় কিন্তু আদালতের রায়ে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকে এমন মানুষের সংখ্যা ছিল মোট ৩৫৩৫২০২ জন – মোট জনসংখ্যার ০.২৯%। অর্থাৎ বিবাহবিচ্ছিন্ন ও আলাদা থাকে এমন মানুষের সংখ্যা (০.১১+০.২৯ =) ০.৪%।
মোট হিন্দু বিবাহবিচ্ছিন্ন মানুষ ছিল ৯৬২৮১০ জন – মোট হিন্দু জনসংখ্যার ০.১%, আদালতের রায়ে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকে এমন হিন্দুর মোট সংখ্যা ছিল ২৮৭০৬৮৫ – মোট হিন্দু জনসংখ্যার ০.৩%। বিবাহবিচ্ছিন্ন ও আলাদা থাকে এমন হিন্দুর সংখ্যা (০.১+০.৩ =) ০.৪%।
মোট মুসলিম বিবাহবিচ্ছিন্ন মানুষ ছিল ২৬৯৬০৯ – মোট মুসলিম জনসংখ্যার ০.১৬%। আদালতের রায়ে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকে এমন মুসলিমদের সংখ্যা ছিল ৩৮৪৭৩৮ – মোট মুসলিম জনসংখ্যার ০.২২%। বিবাহবিচ্ছিন্ন ও আলাদা থাকে এমন মুসলিমদের সংখ্যা (০.১৬+০.২২ =) ০.৩৮%, যা হিন্দুদের তুলনায় এবং জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক কম।
তাই মুসলিম পুরুষরা স্ত্রীদেরকে যখন খুশি ইচ্ছেমতো তিন তালাক দিয়ে নারী জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে—এটা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়। ভারত সরকারের নিজেরই জনগণনা রিপোর্ট সেই কথাই বলছে।
ভারতে মুসলিমদের তাৎক্ষণিক তিন তালাক আগেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে (যা বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ সমস্ত মুসলিম দেশে অনেক আগে থেকেই নিষিদ্ধ ছিল)। তাৎক্ষণিক তিন তালাক নিষিদ্ধ হলেও, তালাক-এ-আহসান এবং তালাক-এ-হাসান প্রচলিত রয়েছে।
সংক্ষেপে তালাক-এ-আহসান:
- স্বামী বা স্বামীর প্রতিনিধি একবার পরিষ্কারভাবে তালাক ঘোষণা করবেন।
- এই তালাক ঘোষণাটা স্ত্রীর স্বাভাবিক মাসিক পবিত্র অবস্থার সময়ে হতে হবে। স্ত্রী যখন তার মাসিক অপবিত্র অবস্থার মধ্যে থাকবে, তখন তালাক বললে তালাক হবে না।
- স্বামী যদি তার স্ত্রীকে সত্যই তালাক দিতে চান, তবে তালাক ঘোষণার পর থেকে তিন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন।
- এই তিন মাস সময়কে ‘ইদ্দত’ বলে। এই ইদ্দত চলাকালীন স্ত্রী চাইলে স্বামীর বাড়িতেই থাকতে পারবেন, তাকে জোর করে স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া যাবে না। এই ইদ্দত সময়ের মধ্যে স্বামী উক্ত স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করবেন না। স্ত্রী যদি গর্ভবতী থাকেন, তবে এই ইদ্দত সময় সন্তানের জন্ম হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ হবে। এই ইদ্দত সময়ের মধ্যে স্বামী তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তারপর এই সময়ের মধ্যে স্বামী যদি চান তবে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবেন। অথবা এই সময়ের মধ্যে স্বামী যদি উক্ত স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করেন, তবে আর তালাক হবে না। এবং ইদ্দত চলাকালীন স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে ভরণ-পোষণ পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখেন।
- ইদ্দত সময়ের মধ্যে স্বামী যদি স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেন বা স্ত্রী সহবাস না করেন, তবে ইদ্দত সময়ের পরে স্বাভাবিকভাবে তালাক-এ-আহসান পূর্ণ হয়ে যাবে। তালাক দেওয়ার ঘোষণা বা তালাক ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা মৌখিকও হতে পারে আবার লিখিতও হতে পারে। তবে শিয়া মতে লিখিত তালাক গ্রহণযোগ্য নয় এবং তালাক দানের সময় কমপক্ষে দুজন যোগ্য সাক্ষীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।
এরপরেও ভবিষ্যতে বিবাহবিচ্ছিন্ন স্বামী-স্ত্রী যদি পুনরায় পরস্পরকে বিবাহ করতে চান, তবে করতেই পারেন, কোনো বাধা নেই। তাই এই তালাক-এ-আহসানকে সর্বোত্তম তালাক বলে। অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু হলে এই সমস্ত বিবাহ বিচ্ছেদ পদ্ধতি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে এবং বিবাহ বিচ্ছেদ একমাত্র আদালতের মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে।
নিকাহ্ হালাল
নিকাহ্ হালাল বিধি মুসলিম নারী-পুরুষের একই ব্যক্তিকে বারবার বিবাহ এবং বারবার বিচ্ছেদের অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করে। একই নারী-পুরুষের মধ্যে পরপর তিনবার বিবাহ এবং বিচ্ছেদ হয়ে গেলে উক্ত নারী-পুরুষ চতুর্থবার আর দুজন দুজনকে বিবাহ করতে পারবেন না। যদি এমনটা করে, তবে সে বিবাহ হারাম বা নিষিদ্ধ বলে গণ্য হবে। তবে চতুর্থবার বিবাহ করার আগে তাদের সঙ্গে যদি অন্য কোনো পুরুষ বা নারীর বিবাহ হয় এবং সেখানেও যদি বিচ্ছেদ হয়ে যায় বা বিধবা হয়ে যায়, তবেই তারা প্রথমবারের মতো আবার নতুন করে বিবাহ জীবন শুরু করতে পারবে—এই বিবাহ তখন বৈধ বা হালাল। একেই নিকাহ্-হালাল বলে।
অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু হলে নিকাহ্ হালাল বিধি বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ তখন একজোড়া নারী-পুরুষ যতবার ইচ্ছা ততবার পরস্পরকে বিবাহ করতে এবং বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারবে, কাউকে জবাবদিহি করতে হবে না।
আপত্তির কারণ
অনেকের ধারণা নেই যে, মুসলিম পুরুষদের মতো মুসলিম নারীরাও উপযুক্ত কারণে নিজের থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারে—একে বলে ‘খুল’ বা ‘খুলা’। অতীতে একটা সময় ছিল যখন মুসলিম সমাজে তালাকের থেকে খুলার সংখ্যা বেশি ছিল।
অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু হলে মুসলমান পুরুষের তালাক দেওয়ার অধিকার যেমন কেড়ে নেওয়া হবে, তেমনি নারীদের খুলা নেওয়ার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হবে। সর্বাবস্থায় বিচ্ছেদ কেবল আদালতের নির্দেশেই সম্পন্ন হবে।
আদালতের দীর্ঘসূত্রিতাই আপত্তির মূল কারণ। প্রায় ১১.৪ লক্ষ বিবাহ বিচ্ছেদ জনিত মামলা ভারতের আদালতগুলিতে ঝুলে রয়েছে। তালাক-এ-আহসানের মাধ্যমে মুসলিম নারী-পুরুষ যেখানে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বিচ্ছেদ জনিত সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়ে আবার নতুন করে বিবাহ করে নতুন সংসার জীবন শুরু করতে পারেন, সেখানে আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ পেতে নারী-পুরুষের বেশ কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।
এর জন্য সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়বেন মুসলিম মহিলারা। কারণ কোনো মুসলিম মহিলা যদি আদালতে বিচ্ছেদের মামলা করেন, তবে যতদিন না আদালত তার ফায়সালা শোনাচ্ছে, ততদিন ঐ মহিলা নতুন বিবাহ করতে পারবেন না, কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন না, কোনো খোরপোশ দাবি করতে পারবেন না। বাধ্য হয়ে তাকে তার সেই স্বামীর গৃহেই থাকতে হবে, যার বিরুদ্ধে সে বিচ্ছেদের মামলা করেছে। এর ফলে মহিলাটিকে কতখানি সমস্যা এবং মানসিক যন্ত্রনা সহ্য করে দিন কাটাতে হতে পারে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।
তাই অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু করে যারা মুসলিম মহিলাদের স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলছেন, তারা একবার ভেবে দেখবেন তারা ঠিক কী করতে চলেছেন।
ইতিমধ্যেই অমুসলিম সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যাপারে আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা জীবনের একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। সেক্ষেত্রে অমুসলিম পুরুষ বা নারী নতুন জীবনসঙ্গী খুঁজে পেলে তার সঙ্গে লিভ-ইন সম্পর্কে থাকেন এবং আদালত এতে কোনো আপত্তি করে না। উপরন্তু তাদের বর্তমানের এই লিভ-ইন সম্পর্ক পূর্বের জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ পেতে সাহায্য করে।
কিন্তু ইসলাম ধর্মে বিবাহ না করে নারী-পুরুষের একত্রবাস পুরোপুরি নিষিদ্ধ। তাই যতদিন পর্যন্ত না আদালত বিবাহ বিচ্ছেদের অনুমতি দিচ্ছে, ততদিন—হয়তোবা তাদের বাকি পুরোটা জীবন নতুন করে বিবাহিত জীবন শুরু করার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এটি মানব জীবনের প্রতি একধরনের নিষ্ঠুরতা ছাড়া আর কিছু নয়।
সরকারের উচিৎ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক অর্থাৎ ব্যভিচারকে নিষিদ্ধ করে বিবাহকে সহজ করা। বিবাহকে সহজ করতে হলে বিবাহ বিচ্ছেদকেও সহজ করতে হবে।
অভিন্ন দেওয়ানি আইন আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদকে দীর্ঘসূত্রী করে বিবাহকেই নিরুৎসাহিত করে এবং মানুষকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক গড়ে তুলতে পরোক্ষে উৎসাহিত করে। এক্ষেত্রে অভিন্ন দেওয়ানি আইন নিয়ে আপত্তির যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
উত্তরাধিকার (Succession)
প্রাথমিক অংশীদার: ইসলাম ধর্মে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং গাণিতিকভাবে বিন্যস্ত, যা সরাসরি কুরআনের নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। শরিয়া আইনে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী অথবা স্বামী, বাবা, মা, ভাই, বোন, দাদু, নাতি ইত্যাদি অর্থাৎ পরিবারের সবার অধিকার নির্দিষ্ট অংশানুপাতে সুরক্ষিত রয়েছে।
যেমন, বর্তমানে একজন মুসলিম ব্যক্তি মারা গেলে তার সম্পত্তিতে তার স্ত্রী পাবেন ১/৮ অংশ (স্বামী হলে ১/৪ অংশ), বাবা পাবেন ১/৬ অংশ, মা পাবেন ১/৬ অংশ, বাকি সম্পত্তি ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ২:১ অনুপাতে ভাগ হবে। যদি মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে না থাকে, একটিমাত্র মেয়ে থাকে, তবে মেয়ে পাবে ১/২ অংশ; একাধিক মেয়ে থাকলে মেয়েরা সবাই মিলে পাবে ২/৩ অংশ এবং বাকি সম্পত্তি মৃত ব্যক্তির ভাইদের মধ্যে ভাগ হবে।
কিন্তু অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু হওয়ার পর যদি কোনো ব্যক্তি উইল না করে মারা যান, তবে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি শুধুমাত্র তার স্ত্রী বা স্বামী, এক বা একাধিক সন্তান, মৃত ব্যক্তির মা এবং মৃত ব্যক্তির বাবা—এই ৪টি পক্ষের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। মৃত ব্যক্তি সন্তান যদি মৃত ব্যক্তির আগেই মারা যান, তবে তার সন্তানেরা (মৃত ব্যক্তির নাতি-নাতনি) তাদের বাবার প্রাপ্য অংশটি পাবেন।
দত্তক
হিন্দু ধর্মের মতো ইসলাম ধর্মে সন্তান দত্তক নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। তবে একজন মুসলিম ব্যক্তি অপরের সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো করে লালন-পালন করে, ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করতেই পারেন, তাতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু তার এই সন্তান কখনও তার বায়োলজিক্যাল সন্তানদের মতো আইনত সমান উত্তরাধিকারী হয় না। এমনকি এই সন্তানকে তার প্রকৃত বাবা-মায়ের পরিচয় জানিয়ে দিতে হয় এবং মুসলিম সমাজে তার প্রকৃত বাবা-মায়ের নামেই তার পরিচয় হয়। লালন-পালনকারী ব্যক্তি শুধুমাত্র তার অভিভাবক হিসেবে গণ্য হন।
অভিন্ন দেওয়ানি আইনে হিন্দুদের মতো একজন মুসলিম ব্যক্তিও চাইলে সন্তান দত্তক নিতে পারবেন এবং এই দত্তক নেওয়া সন্তান তার প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য হবে।
উইল
ইসলামি শরিয়া আইনে একজন ব্যক্তি তাঁর মোট সম্পত্তির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ (১/৩ অংশ) নিজের ইচ্ছামতো কাউকে উইল (ওসিয়ত) করে দিয়ে যেতে পারেন এবং বাকি দুই-তৃতীয়াংশ আইনি উত্তরাধিকারীদের জন্যই রাখতে হয়।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে একজন ব্যক্তিকে তাঁর নিজের উপার্জিত সম্পত্তির ওপর ১০০% উইলের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, একজন মানুষ চাইলে তাঁর সম্পূর্ণ সম্পত্তি কোনো ট্রাস্টকে, কোনো নির্দিষ্ট সন্তানকে বা অন্য যে কাউকে উইল করে দিয়ে যেতে পারেন।
আপত্তির কারণ
অভিন্ন দেওয়ানি আইনে উত্তরাধিকারের বিধি-বিধান তৈরি করা হয়েছে মূলত শহুরে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তদের কথা ভেবেই। প্রান্তিক গরিব মানুষদের সমস্যার কথা এখানে ভাবা হয়নি।
উদাহরণস্বরূপ: ধরা যাক, একজন শহুরে মধ্যবিত্ত ব্যক্তি মারা যাওয়ার সময় তিনি ৫০ লক্ষ টাকা রেখে গেছেন। তার স্ত্রী, একজন ছেলে, একজন মেয়ে, তার বাবা এবং মা রয়েছেন। অভিন্ন দেওয়ানি আইন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির ৫ জন উত্তরাধিকারী প্রত্যেকেই ১০ লক্ষ টাকা করে পাবেন। তার বসতবাড়িটির মূল্য ধরে ৫ জনের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
এবার ধরা যাক, একজন প্রান্তিক গ্রামীণ চাষি বা দিনমজুর মারা যাওয়ার সময় সম্পত্তি বলতে তার বসতবাড়ি এবং কষ্ট করে কোনোমতে একটা সংসার চলার মতো একটুকরো জমি রেখে গেছেন। এবং তার স্ত্রী, একজন নাবালক ছেলে, একজন বিবাহিত মেয়ে রয়েছেন; তার বাবা, মা জীবিত রয়েছেন এবং মৃত ব্যক্তির অন্য ভাই-বোনদের নিয়ে তাদের আলাদা সংসার রয়েছে। এক্ষেত্রে তার এই ফেলে যাওয়া সম্পত্তি ৫ জনের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে প্রত্যেকে নিজের নিজের অংশ নিয়ে আলাদা হয়ে গেলে, তার বিধবা স্ত্রী এবং নাবালক ছেলেকে পথে বসতে হবে। তখন এক জটিল আর্থ-সামাজিক সমস্যার জন্ম হতে পারে। ইসলামি শরিয়া আইনে যেভাবে উত্তরাধিকার বণ্টনের কথা বলা হয়েছে, সেভাবে অংশ ভাগ হলে এই ধরনের আর্থ-সামাজিক সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কম হয়।
শরিয়া আইনের বিরোধীরা অভিন্ন দেওয়ানি আইনে ছেলে-মেয়ের সমান অধিকারের কথা বলেন। কিন্তু শরিয়া আইনে মেয়েরা শুধু বাবার অংশ পায় না, স্বামীর কাছ কাছ থেকে দেনমোহরও পায়—বিবাহের সময় চেষ্টা করা হয় যাতে এই দেনমোহর যত বেশি পরিমাণে সম্ভব ধার্য করা যায় এবং সে স্বামীর সম্পত্তিরও অংশীদার হয়। তাই শরিয়া আইনকে কোনো ভাবেই বৈষম্যমূলক বলা যায় না, বরং ভারসাম্যমূলক বলা যায়।
অভিন্ন দেওয়ানি আইনে একজন ব্যক্তিকে তার সম্পত্তির ১০০% উইল করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। তাই ব্যক্তি যদি মারা যাওয়ার আগে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি তাঁর একমাত্র ছেলেকে লিখে দিয়ে যান, তবে কারও কিছু করার থাকবে না। এরফলে ভারতের পুরুষশাসিত সমাজে অভিন্ন দেওয়ানি আইনে মেয়ে সন্তানদের বঞ্চিত হওয়ার পুরোপুরি সম্ভাবনা রয়েছে।
শরিয়া আইনে যেহেতু একজন ব্যক্তি তার মোট সম্পত্তির মাত্র ১/৩ অংশ উইল করতে পারে, তাই সে চাইলেও তার মেয়েকে বা কোনো উত্তরাধিকারীকে পুরোপুরি বঞ্চিত করতে পারে না।
উপসংহার
ভারতে হিন্দু বিবাহ আইনে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করেও, হিন্দু পুরুষদের বহুবিবাহ বন্ধ করা যায়নি, অনেক যায়গায় এটা সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করেছে।
অথচ পাকিস্তান, মরোক্কোর মত ৯৫% মুসলমান প্রধান দেশে ইসলামি শরিয়তি আইনের উপর কঠোরতা আরোপ করে বহুবিবাহ নিয়ন্ত্রনে সফলতা পাওয়া গেছে।
এর পরেও ২১তম ল কমিশনের পরামর্শকে উপেক্ষা করে রাজ্যগুলির অভিন্ন দেওয়ানি আইন হিন্দু – মুসলিম নির্বিশেষে সকল পুরুষের একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ করেছে, লিভ-ইন সম্পর্কে কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে, অখচ পরকীয়া বন্ধ করার জন্য কোনো ব্য়বস্থা গ্রহণ করা হয়নি, যৌন পেশাকে নিযিদ্ধ করা হয়নি।
মুসলিম নারীদের কাছ থেকে খুলা-র অধিকার কেড়ে নিয়ে, তাদেরকে এক জন্ত্রনাময় জীবন উপহার দেওয়া হয়েছে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথাগুলিকে (যেমন—উত্তর ভারতে দ্রৌপদী বিবাহ প্রথা) প্রাচীন ঐতিহ্যের নামে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
‘এক দেশ এক আইন’ এবং মহিলাদের সামাজিক মর্যাদার কথা বলা হলেও ভারতের বিরাট সংখ্যক আদিবাসী সমাজ, যাদের মধ্যে বহুবিবাহ ও জিনগত রোগ সবচেয়ে বেশি, তাদেরকে অভিন্ন দেওয়ানি আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে উত্তরাধিকারীদের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও ১০০% উইল করার অধিকার দিয়ে পুরুষশাসিত সমাজে নারীর উত্তরাধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
আজ পর্যন্ত যে তিনটি রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হয়েছে, সেগুলি ভালো করে পর্যালোচনা করলে বুঝা যায়, এই আইনের বিধি-বিধান তৈরি করার সময় যুক্তি, তথ্য ও বাস্তবতা কম গুরুত্ব পেয়েছে। এই আইনে সুস্থ গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার পরিবর্তে সংখ্যাগুরুবাদের ঔদ্ধত্যের প্রকাশ ঘটেছে।
