Headlines

তিন তালাক – পদ্ধতি, প্রচারনা এবং বাস্তবতা।

Triple Talaq

তিন তালাক – পবিত্র কোরাণের আলোকেঃ

তিন তালাক নিয়ে আলোচনা করার আগে পবিত্র কোরান মজিদের বক্তব্য আমরা দেখে নেব। কোরানের মতে স্বামী-স্ত্রীদের মধ্যে সম্পর্ক আদর্শগত ভাবে ভালবাসার উপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত।

(৩০ঃ২১) আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই প্রজাতি থেকে সৃষ্টি করেছেন স্ত্রীগণকে, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পার। এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। অবশ্যই এর মধ্যে বহু নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা চিন্তা- ভাবনা করে।

স্বামী-স্ত্রীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেই গ্রহন করা উচিত। যখন বৈবাহিক শান্তি আর কোনভাবেই বজায় রাখা যায় না, তখন কোরাণ বৈবাহিক সম্বন্ধের সমাপ্তি করার উপদেশ এবং অনুমোদন দেয়। যদিও কোরাণের মতে ‘বিবাহ বিচ্ছেদ’ আল্লাহর কাছে সবচাইতে অপছন্দনিয় বৈধ কাজ।

(২ঃ২৩১) আর যখন তোমরা স্ত্রীদের তালাক দিয়ে দাও এবং তাদের ইদ্দত পূর্ণ হবার পর্যায়ে পৌছে যায় তখন হয় সোজাসুজি তাদেরকে রেখে দাও আর নয়তো ভালোভাবে বিদায় করে দাও ৷ নিছক কষ্ট দেবার জন্য তাদেরকে আটকে রেখো না ৷ কারণ এটা হবে বাড়াবাড়ি ৷ আর যে ব্যক্তি এমনটি করবে সে আসলে নিজের ওপর জুলুম করবে ৷ আল্লাহর আয়াতকে খেলা –তামাসায় পরিণত করো না ৷ ভুলে যেয়োনা আল্লাহ তোমাদের কত বড় নিয়ামত দান করেছেন ৷ তিনি তোমাদের উপদেশ দান করছেন, যে কিতাব ও হিকমাত তিনি তোমাদের ওপর নাযিল করেছেন তাকে মর্যাদা দান করো ৷ আল্লাহকে ভয় করো এবং ভালোভাবে জেনে রাখো, আল্লাহ সব কিছু জানেন।

কিন্তু এই বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। আগে স্বামী-স্ত্রীর উভয়পক্ষের আত্মীয়দের মধ্য থেকে সালিশ নির্ধারণ করে মীমাংসার চেষ্টা করতে হবে। এটা মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

(৪ঃ৩৫) আর যদি কোথাও তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বিগড়ে যাবার আশংকা দেখা দেয় তাহলে পুরুষের আত্মীয়দের মধ্য থেকে একজন সালিশ এবং স্ত্রীর আত্মীয়দের মধ্য থেকে একজন সালিশ নির্ধারণ করে দাও। তারা দুজন  সংশোধন করে নিতে চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসা ও মিলমিশের পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবেন ৷ আল্লাহ সবকিছু জানেন, তিনি সর্বজ্ঞ।

হঠকারি বিবাহ বিচ্ছেদ থেকে দুরে থাকতে পবিত্র কোরাণ আরো ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছে। কোন লোক যদি তার স্ত্রীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক না রাখার প্রতিঞ্জা করে বসে, তাহলে তাকে চার মাস সময় দেওয়া হচ্ছে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য।

(২ঃ২২৬) যেসব লোক নিজেদের স্ত্রীদের সাথে সম্পর্ক না রাখার কসম খেয়ে বসে তাদের জন্য রয়েছে চার মাসের অবকাশ ৷ যদি তারা রুজ করে (ফিরে আসে ) তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু ৷

কোরআন উল্লেখযোগ্যভাবে প্রাক-ইসলামী আরবের মধ্যে বিদ্যমান তালাক এবং অন্যান্য লিঙ্গ বৈষম্যকে সংস্কার করেছে। ইসলামের আগে, আরবদের মধ্যে তালাক উপজাতিদের প্রথাগত আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যা অঞ্চল ও গোত্র অনুযায়ি পরবর্তিত হত। এই সিস্টেমে, বিবাহ এবং বিচ্ছেদ, সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ব্যপারে নারীদের কোন অধিকার ছিল না। কোরান ইসলামের অনুসারি সমস্ত অঞ্চল এবং গোত্রের জন্য একই আইন চালু করে। নারীদেরকে সম্পত্তীর উত্তরাধিকার এবং বিবাহ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার দান করে। ইসলামের পূর্বে পুরুষ তার স্ত্রীকে ইচ্ছামতো যতোবার খুশি তালাক দিতো আবার ফিরিয়ে নিতো, এইভাবে নারীদের কাছে বিবাহিত জীবনকে পতিতাবৃত্তির পর্যায়ে নিয়েগিয়েছিল। কোরাণ এই তালাক দিয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার সংখ্যা সর্বোচ্চ তিন বারে নির্দিষ্ট করেদেয়। যার পর অন্য কোন পুরুষের সাথে সেই মহিলার বিবাহ এবং বিচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত সে আর তার স্ত্রীকে ফিরে পাবেনা। কিন্তু অন্য পুরুষের সাথে এই বিবাহ ও বিচ্ছেদ কখনই পূর্বপরিকল্পিত এবং ষড়যন্ত্রমূলক হবে না।

ইসলামি আইন – শরিয়ত

মূল শরিয়তি আইনগুলি প্রাথমিকভাবে পবিত্র কোরাণ এবং হাদিস থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। শরিয়তি আইনে বিষেশঞ্জদের মুফতি বলা হয়। সাধারণ মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ি মুফতিরা বিনা পারিশ্রমিকে বিভিন্ন বিষয়ে আইনি মতামত বা ফতোয়া দিয়ে থাকেন। একই আইনগত বিষয়ে বিভিন্ন মুফতির মতামত  বা ফতোয়া বিভিন্ন হতে পারে। সেক্ষেত্রে মানুষ নিজের জ্ঞান বুদ্ধি বিবেক অনুযায়ি যে কোন একটি মতামত বা ফতোয়া গ্রহন করেন। ফতোয়া মেনে চলা সাধারণ মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক নয়, ঐচ্ছিক। একটা সময় ছিল যখন ইসলামি শরিয়তি আইনে গভির জ্ঞান সম্পন্ন ‘কাজি’ পারিবারিক, দেওানি এবং ফৌজদারি সবধরনের বিচার পরিচালনা করতেন। বর্তমানে কেবলমাত্র বিবাহ সংক্রান্ত বিবাদের মিমাংসার দায়িত্ব ‘কাজি’দের হাতে ন্যস্ত রয়েছে।

তালাক – বর্জন। অর্থাৎ পুরুষদের স্ত্রী বর্জন।

পুরুষ তার স্ত্রীকে দুই ভাবে তালাক দিতে পারে।-

১) তালাক-এ-সুন্নাহ্। অর্থাৎ রসুল সাঃ যেভাবে তালাক দেওয়ার কথা বলেছেন। এই তালাক আবার দুই প্রকার – (ক) তালাক-এ-আহসান বা সর্বাধিক অনুমোদিত পদ্ধতি এবং (খ) তালাক-এ-হাসান বা অনুমোদিত পদ্ধতি।

২) তালাক-এ-বেদাত। বা বায়েন তালাক, এটা রসুল সাঃ পূর্নভবে সমর্থন করেন নি। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাঃ এর সময় থেকে এটা বিশেষ ভাবে প্রচলিত হয়েছে।

তালাক-এ-আহসানঃ

এই তালাক দেওয়ার পদ্ধতি রসুল সাঃ এর সময় থেকেই প্রচলিত রয়েছে এবং এটা রসুল সাঃ দ্বারা সর্বাধিক অনুমোদিত পদ্ধতি। এই তালাক-এ-আহসান এর বৈশিষ্ট হলোঃ-

ক)  স্বামী বা স্বামীর প্রতিনিধী একবার পরিস্কারভাবে  তালাক ঘোষনা করবেন।

খ)  এই তালাক ঘোষনাটা স্ত্রীর স্বাভাবিক মাসিক পবিত্র অবস্থার সময়ে হতে হবে। স্ত্রী যখন তার মাসিক অপবিত্র অবস্থার মধ্যে থাকবে, তখন তালাক বললে তালাক হবে না।

গ)  স্বামী যদি তার স্ত্রীকে সত্যই তালাক দিতে চান তবে তালাক ঘোষনার পর থেকে তিন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। আল্লাহ কোরানে বলেন –

(২ঃ২২৮) তালাক প্রাপ্তাগণ তিনবার মাসিক ঋতুস্রাব পর্যন্ত নিজেদেরকে বিরত রাখবে ৷ আর আল্লাহ তাদের গর্ভাশয়ে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তাকে গোপন করা তাদের জন্য বৈধ নয় ৷ তাদের কখনো এমনটি করা উচিত নয় , যদি তারা আল্লাহও পরকালে বিশ্বাসী হয়, তাদের স্বামীরা পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনে প্রস্তুত হয়, তাহলে তারা এই অবকাশ কালের মধ্যে তাদেরকে নিজের স্ত্রী হিসেবে ফিরিয়ে নেবার অধিকারী হবে ৷  নারীদের জন্যও ঠিক তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার আছে যেমন পুরুষদের অধিকার আছে তাদের ওপর ৷ তবে পুরুষদের তাদের ওপর একটি মর্যাদা আছে ৷ আর সবার ওপরে আছেন আল্লাহ সর্বাধিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী , বিচক্ষণ ও জ্ঞানী ৷

এই তিন মাস সময়কে ইদ্দত বলে। এই ইদ্দত সময়ের মধ্যে স্বামী উক্ত স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করবেন না। স্ত্রী যদি গর্ভবতী থাকেন তবে এই ইদ্দত সময় সন্তানের জন্ম হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ হবে।এই ইদ্দত সময়ের মধ্যে স্বামী তার সিদ্ধান্ত পূনর্বিবেচনা করবেন, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তারপর এই সময়ের মধ্যে স্বামী যদি চান তবে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবেন। অথবা এই সময়ের মধ্যে স্বামী যদি উক্ত স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করেন তবে আর তালাক হবে না। এবং  ইদ্দত চলাকালিন স্ত্রী স্বামীর কাছথেকে ভরন-পোষন পাওয়ার পূর্ন অধিকার রাখেন।

ইদ্দত সময়ের মধ্যে স্বামী যদি স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেন বা স্ত্রী সহবাস না করেন তবে ইদ্দত সময়ের পরে স্বাভাবিক ভাবে তালাক-এ-আহসান পূর্ন হয়েযাবে। তালাক দেওয়ার ঘোষনা বা তালাক ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষনা মৌখিকও হতে পারে আবার লিখিতও হতে পারে। তবে শিয়া মতে লিখিত তালাক গ্রহন যোগ্য নয় এবং তালাক দানের সময় কমপক্ষে দুজন যোগ্য সাক্ষির উপস্থিতি বাধ্যতামুলক।

এরপরেও ভবিষ্যতে বিবাহ বিচ্ছিন্ন স্বামী-স্ত্রী যদি পুনরায় পরস্পরকে বিয়ে করতে চান, তবে করতেই পারেন, কোন বাধা নেই। তাই এই তালাক-এ-আহসানকে সর্বোত্তম তালাক বলে।

তালাক-এ-হাসানঃ

তালাক-এ-হাসান ও রসুল সাঃএর অনুমোদিত তবে তালাক-এ-আহসান-এর তুলনায় কম অনুমোদিত। প্রাক ইসলামিক যুগে পুরুষ তার স্ত্রীকে ইচ্ছামতো যতোবার খুশি তালাক দিতো আবার ফিরিয়ে নিতো। এই প্রথা বন্ধ করার জন্য আল্লাহ সুবহানাহুতালা পবিত্র কোরাণে ঘোষনা করলেন –

(২ঃ ২২৯) তালাক দু’বার ৷ তারপর সোজাসুজি স্ত্রীকে রেখে দিবে অথবা ভালোভাবে বিদায় করে দেবে৷ আর তাদেরকে যা কিছু দিয়েছো বিদায় করার সময় তা থেকে কিছু ফিরিয়ে নেয়া তোমাদের জন্য বৈধ নয় ৷  তবে এটা স্বতন্ত্র , স্বামী-স্ত্রী যদি আল্লাহ নির্ধারিত সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না বলে আশংকা করে, তাহলে এহেন অবস্থায় যদি তোমরা আশংকা করো, তারা উভয়ে আল্লাহ নির্ধারিত সীমার মধ্যে অবস্থান করতে পারবে না , তাহলে স্ত্রীর কিছু বিনিময় দিয়ে তার স্বামী থেকে বিচ্ছেদ লাভ করায় কোন ক্ষতি নেই ৷ এগুলো আল্লাহ নির্ধারিত সীমারেখা, এগুলো অতিক্রম করো না ৷ মূলত যারাই আল্লাহ নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করবে তারাই জালেম ৷

(২ঃ২৩০) অতপর যদি (দু’বার তালাক দেবার পর স্বামী তার স্ত্রীকে তৃতীয় বার) তালাক দেয়, তাহলে ঐ স্ত্রী তার জন্য হালাল হবে না ৷ তবে যদি দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির সাথে তার বিয়ে হয় এবং সে তাকে তালাক দেয় , তাহলে এ ক্ষেত্রে প্রথম স্বামী এবং এই মহিলা যদি আল্লাহর সীমারেখার মধ্যে অবস্থান করতে পারবে বলে মনে করে তাহলে তাদের উভয়ের জন্য পরস্পরের দিকে ফিরে আসায় কোন ক্ষতি নেই৷ এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা ৷ (এগুলো ভংগ করার পরিণতি ) যারা জানে তাদের হিদায়াতের জন্য এগুলো সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন ৷

তালাক-এ-হাসানএর নিয়ম-

ক)  স্বামী বা স্বামীর প্রতিনিধি স্ত্রীর মাসিক পবিত্র অবস্থার সময় একবার তালাক ঘোষনা করবেন। তারপর এক মাস অপেক্ষা করবেন। এই একমাস সময়ের মধ্যে স্বামী ভালোকরে চিন্তাভাবনা করবেন, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। যদি স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চান তবে ফিরিয়ে নিতে পারেন। নতুবা স্ত্রী সহবাস থেকে নিজেকে বিরত রাখবেন এবং এই একমাস পর স্ত্রীর পরবর্তী দ্বিতীয় মাসিক পবিত্র অবস্থার সময় দ্বিতীয়বার তালাকের ঘোষনা দিবেন। তারপর পূর্বের মত আবারো এক মাস আপেক্ষা করবেন, চিন্তাভাবনা করবেন এর মধ্যে যদি স্বামী যদি স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চান তবে ফিরিয়ে নিতে পারবেন। নতুবা স্ত্রী সহবাস থেকে নিজেকে বিরত রাখবেন এবং স্ত্রীর পরবর্তী তৃতিয় মাসিক পবিত্র অবস্থার সময় তৃতিয়বার তালাকের ঘোষনা দিবেন। এই তৃতিয়বার তালাকের ঘোষনার সঙ্গে সঙ্গে তালাক-এ-হাসান পূর্ন হয়ে যাবে এবং স্ত্রীকে আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবেনা।

তালাক-এ-বেদাত বা তাৎক্ষনিক তিন তালাকঃ

কোনরকম সময়ের অপেক্ষা না করে স্ত্রীর মাসিক পবিত্র অবস্থার সময় একসঙ্গে তিনবার তালাক উচ্চারন করে যেমন ‘আমি তোমাকে তালাক দিলাম’,  ‘আমি তোমাকে তালাক দিলাম’,  ‘আমি তোমাকে তালাক দিলাম’, বা একসঙ্গে তিন তালাকের কথা বলে যেমন ‘আমি তোমাকে তিন তালাক দিলাম’, বা স্ত্রীর এক মাসিক চক্রের মধ্যেই তিনবার তালাকের ঘোষনা করে যে তালাক দেওয়া হয়, তাকে তালাকে-এ-বেদাত বা তাৎক্ষনিক তিন তালাক বা সংক্ষেপে তিন তালাক বলে। তিনবার তালাক বলার সময় প্রকৃতপক্ষে তিনবার তালাক দেওয়ার ইচ্ছাটাও থাকতে হবে, যদি শুধু মাত্র উচ্চারনে জোর দেওয়ার জন্য তিনবার তালাক বলা হয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পুরুষের মনে একবার তালাক দেওয়ার ইচ্ছা থাকে, তবে তিন তালাক না হয়ে এক তালাক হবে। কিন্তু যদি তিনবার তালাক বলার সময় সত্য সত্যই মনের মধ্যে তিন তালাক দেওয়ার ইচ্ছা থাকে, তবে তিন তালাক হবে।

ইসলামে বেদাত তাকেই বলা হয় যা নবী মুহম্মদ সাঃএর পরবর্তীকালে ইসলামে অনুপ্রবেশ করেছে। শিয়া মতবাদ অনুযায়ি তাৎক্ষনিক তিন তালাক কার্যকরি নয় অর্থাৎ তালাক হবে না কিন্তু সুন্নি মতবাদ অনুযায়ি তিন তালাক কার্যকরি অর্থাৎ তালাক হয়ে যাবে তবে এটা গুরুতর পাপ তাই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাঃ সময় থেকে পরবর্তী খলিফাদের সময়েও, যারা তাৎক্ষনিক তিন তালাক দিতো তাদের প্রহার করে শাস্তি দেওয়া হতো তবে তালাক হয়েযেতো। বর্তমানে বাংলাদেশ, পাকিস্থান সহ বিশ্বের প্রায় সব মুসলিম দেশেই আইন করে তাৎক্ষনিক তিন তালাককে নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছে।

নিকাহ্ হালালাঃ

পুরুষ যদি তার স্ত্রীকে তালাক-এ-হাসান পদ্ধতিতে পুরোপুরি তালাক দিয়েদেয় বা তালাক-এ-বেদাত পদ্ধতিতে তাৎক্ষনিক তিন তালাক দিয়েদেয়, তার পরে আর তার পরিত্যক্ত স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারে না। যদিনা উক্ত স্ত্রী এর মধ্যে অপর কোন পুরুষকে বিয়ে করে বিবাহ বিচ্ছন্না হয় বা বিধবা হয়। নারীর এই অন্তরবর্তি বিবাহ কে নিকাহ্ হালালা বলে। কিন্তু এই নিকাহ্ হালালা পূর্ব পরিকল্পিত হবে না। অর্থাৎ স্ত্রী তার পূর্ব স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য পরিকল্পনা করে অপর পুরুষকে বিয়েকরে বিবাহ বিচ্ছিন্না হতে পারবেন না বা কোন পুরুষও এই পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ি তাকে বিয়ে করে তালাক দিয়ে সাহায্য করতে পারবেন না। যে পুরুষ পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ি এই নিকাহ্ হালালা করে এবং যার জন্য নিকাহ্ হালালা করা হয়, অাল্লাহর রসুল সাঃ তাদের উভয়ের জন্যই কঠোর সতর্ক বানী উচ্চারন করেছেন।

খুল – বাঁধন খুলেফেলা। অর্থাৎ স্ত্রীদের স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করাঃ

স্ত্রী যখন নিজের থেকে স্বামীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের উদ্দোগ নেয়, তাকে খুল বলে। যেহেতু উদ্দোগটা স্ত্রীর পক্ষথেকে নেওয়া হয়, তাই স্ত্রী ক্ষতিপুরন স্বরুপ তার দেন মোহরের কিছুটা বা পুরোটাই স্বামীকে ফেরত দেয়। পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে ইদ্দত সময়কালীন স্ত্রীর ভরনো-পোষন ছাড় দেওয়া যেতে পারে।  তবে এই ক্ষতি পুরনের পরিমান কখনই দেন মোহরের বেশী হবে না। পুরুষ দেন মোহরের অর্থ ফিরে পাওয়ার উদ্দেশ্যে বা ভরন-পোষনে ছাড় পাওয়ার উদ্দেশ্যে  নিজে স্ত্রীকে তালাক না দিয়ে স্ত্রীকে খুল নেওয়ার জন্য জোর করতে পারবেন না। তিনবার খুল হয়ে যাওয়ার পর নিকাহ্ হালালা না হলে আর পরস্পরকে পুনরায় বিয়ে করা যাবে না।

তফয়িদ – প্রতিনিধিত্বমূলক বিবাহবিচ্ছেদঃ

পুরুষ যখন নিজের থেকে স্ত্রীকে বিবাহ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার দান করে, তাকে তফয়িদ বা প্রতিনিধিত্বমূলক বিবাহবিচ্ছেদ বলে। নারী স্বাধীনতার জন্য শরীয়তের এটা একটা গুরুত্বপূর্ন পদক্ষেপ। বিয়ের রেজিস্ট্রির সময়েই মহিলারা পুরুষের উপর নানাবিধ সর্ত আরোপ করেন, যে সর্ত পূরন না হলে মহিলা পুরুষের কাছ থেকে বিবাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। যেমন, ইসলাম যেহেতু পুরুষের একাধিক এবং সর্ব্বাধিক চারটি বিয়ে করার অনুমতি দেয়, তাই বিয়ের রেজিস্ট্রি করার সময়েই মহিলারা পুরুষের কাছ থেকে এই প্রতিশুতি নিয়ে রাখে যে, পুরুষ যদি আবারো কাউকে বিয়ে করে তবে সে পুরুষের কাছ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেবে।

শপথ – শপথের দ্বারা বিবাহ বিচ্ছেদঃ

স্বামী যদি তার স্ত্রীর সঙ্গে কোনরকম সম্পর্ক না রাখার শপথ করে বসেন, তবে তাকে চার মাস সময় দেওয়া হয়, এই চার মাসের মধ্যে যদি শপথ ভঙ্গ না করেন তবে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে।

অাবার স্বামী যদি স্ত্রীর উপর ব্যভিচারের অভিযোগ আনেন এবং নিজের অভিযোগের সত্যতার উপর শপথ করেন তাহলেও বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে, একে লেয়ান বলে।

পূর্বের অবস্থাঃ

গবেষনায় দেখাগেছে মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্বে তালাকের তুলনায় খুলের ব্যবহার বেশি ছিল। বিয়ের সময় মহিলারা পুরুষদের কাছথেকে ভাল অঙ্কের দেন মোহর আদায় করতো, অন্যদিকে পৈতৃিক সম্পত্তির অংশও পেত। এই অর্থ পরিবারের জন্য খরচকরা মহিলাদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল না। তারা এই অর্থ স্বামীদেরকে ধার দিত। সেই জন্য স্ত্রীদের তালাক দেওয়া পুরুষদের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তাই ঐতিহাসিকভাবে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তালাক কখনও বিবাহ বিচ্ছেদের প্রধান মাধ্যম ছিলনা। খুল ছিল বিবাহ বিচ্ছেদের প্রধান মাধ্যম।

তিন তালাক – আধুনিক ভারতে অভ্যাস এবং পরিস্থিতিঃ

ভারতে হিন্দু এবং অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে সাধারণ ধারনা রয়েছে যে – ইসলামি শরিয়তের আওতায় মুসলমান মহিলারা অত্যন্ত করুণ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। সবাই না হলেও বেশীরভাগ মুসলমান পুরুষ চারটি করে বিয়ে করে এবং যখন খুশি তালাক তালাক তালাক বলে স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দেয়। স্ত্রীর এখানে কোনরকম কোনকিছু বলার অধিকার নাই।

কিন্তু ভারত সরকারের ২০১১ সালের অাদম শুমারির তথ্য অন্য কথা বলছে। ২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ি ভারতের মোট জনসংখ্যা ছিল ১২১০৮৫৪৯৭৭ জন। হিন্দু জনসংখ্যা ছিল  ৯৬৬২৫৭৩৫৩ জন – মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০%। এবং মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ১৭২২৪৫১৫৮ জন – মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪%।

ভারতে বিবাহিত নারী-পুরুষের মোট সংখ্যা ছিল ৫৭৯৫৮৪৭৮৩ জন – মোট জনসংখ্যার ৪৮%। যখন হিন্দু বিবাহিত নারী-পুরুষের সংখ্যা ছিল ৪৭১৩৯৭৯০০ জন -মোট হিন্দু জনসংখ্যার ৪৯%। যা জাতীয় গড়ের চাইতে বেশী। যদিও আমরা জানি ভারতে কয়েক লক্ষ সাধু রয়েছেন, অনেক রাজনিতীর কারবারি রয়েছেন যারা বিয়ে করেন না।অপর দিকে মুসলিম বিবাহিত নারী-পুরুষের সংখ্যা ছিল ৭৩৬৮১৯০১ জন – মোট মুসলিম জনসংখ্যার ৪৩%। যা কিনা শতাংশর হিসাবে হিন্দুদের থেকে এমনকি জাতীয় গড়ের থেকেও অনেক কম। যদি হিন্দু বিবাহিত পুরুষরা সবাই একটাই বিয়ে করে সন্তুষ্ট থাকতো এবং মুসলিম পুরুষদের বেশীরভাগ লোক একটার বেশী বিয়ে করতো তাহলে এই ফলাফলটা উল্টো হতো। অর্থাৎ শতাংশের বিচারে বিবাহিত মুসলিমদের জনসংখ্যা বিবাহিত হিন্দুজনসংখ্যার অনেক বেশী হতো।

আবার ভারতে বিবাহ বিচ্ছিন্ন মানুষের জনসংখ্যা ছিল মোট ১৩৬২৩১৬ জন – মোট জনসংখ্যার ০.১১% এবং বিবাহ বিচ্ছিন্ন নয় কিন্তু আদালতের রায়ে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকে এমন মানুষের সংখ্যা ছিল মোট ৩৫৩৫২০২ জন – মোট জনসংখ্যার ০.২৯%। অর্থাৎ বিবাহ বিচ্ছিন্ন ও আলাদা থাকে এমন মানুষের সংখ্যা (০.১১+০.২৯ =) ০.৪%।

মোট হিন্দু বিবাহ বিচ্ছিন্ন মানুষ ছিল ৯৬২৮১০ জন – মোট হিন্দু জনসংখ্যার ০.১%, আদালতের রায়ে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকে এমন হিন্দুর মোট সংখ্যা ছিল ২৮৭০৬৮৫ – মোট হিন্দু জনসংখ্যার ০.৩%। বিবাহ বিচ্ছিন্ন ও আলাদা থাকে এমন হিন্দুর সংখ্যা (০.১+০.৩ =) ০.৪%।

মোট মুসলিম বিবাহ বিচ্ছিন্ন মানুষ ছিল ২৬৯৬০৯ – মোট মুসলিম জনসংখ্যার ০.১৬%। আদালতের রায়ে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকে এমন মুসলিমদের সংখ্যা ছিল ৩৮৪৭৩৮ – মোট মুসলিম জনসংখ্যার ০.২২%। বিবাহ বিচ্ছিন্ন ও আলাদা থাকে এমন মুসলিমদের সংখ্যা (০.১৬+০.২২ =) ০.৩৮%। যা হিন্দুদের তুলনায় এবং জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক কম।

তাই মুসলিম পুরুষরা স্ত্রীদেরকে যখন খুশি ইচ্ছেমত তিন তালাক দিয়ে নারী জীবন দুর্বিসহ করে তুলছে – এটা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়। ভারত সরকারের নিজেরই জনগননা রিপোর্ট সেই কথাই বলছে।

উপসংহারঃ

ভারতে মুসলমানদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা যদিও অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়ের লোকেদের তুলনায় অনেক কম,  কিন্তু ভারতে মুসলমানরা বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য তালাক-এ-বেদাত বা সংক্ষেপে তিন তালাককেই বেশী ব্যবহার করে। বেশীরভাগ মুসলমানরা তো তালাক-এ-আহসান বা তালাক-এ-হাসানের কথা জানেই না, তারা তালাক-এ-বেদাতকেই তালাকের একমাত্র পদ্ধতি বলে জানে। কিন্তু শিয়া মতে তালাক-এ-বেদাত বলে কোন তালাক হয় না। আবার সুন্নি মতে তালাক-এ-বেদাত গুরুতর পাপ কিন্তু তালাক কার্যকরি হয়।পৃথিবির বেশীর ভাগ দেশেই তালাক-এ-বেদাত নিষিদ্ধ হয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তালাক-এ-বেদাত কে নিষিদ্ধ এবং শাস্তি যোগ্য করতে চলেছে। সংখ্যা গরিষ্ঠ সুন্নি মতাবলম্বি মুসলমানদের মতে – নিষিদ্ধ ঘোষনা করার পরেও কোন পুরুষ যদি স্ত্রীকে তাৎক্ষনিক তিন তালাক দেয়, তবে শরিয়ত অনুযায়ি তালাক হয়ে যাবে। তখন কোর্ট বা সরকার তালাক-এ-বেদাত দান কারী পুরুষকে শাস্তী দানের ব্যবস্থা করতে পারে, কেননা তা শরিয়ত সম্মত, কিন্তু শাস্তিটা অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়ের নাগরিকদের ক্ষেত্রে যে বিধান রয়েছে তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই হতে হবে, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। এবং কোর্ট বা সরকার কিন্তু তালাক-এ-বেদাত দানকারী পুরুষকে তার তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করতে বাধ্য করতে পারে না, কারণ হানাফি মত অনুযায়ি শরিয়তের বিচারে তখন সেটা ব্যভিচার। তাই ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এই রায় পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

————-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *