Headlines

বাংলা ভাগের কারিগর

The Architect of the Partition of Bengal The Architect of the Partition of Bengal

স্বাধীনতার এত বছর পরেও বাংলা ভাগের জন্য কেবল মাত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মুসলিম লিগকে দায়ী করা হয়। কিন্ত বাংলা ভাগের পেছনে কলকাতা কেন্দ্রিক ভদ্রলোকদের যে এক বিরাট ভূমিকা ছিল, সেই কথাটা আলোচনায় কখনও আসে না। 

বাংলা ভাগের পটভূমি

১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে পলাশির যুদ্ধে বাংলার শেষ মুঘল নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতন হয়। সেই সঙ্গে বাংলার মাটিতে দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ শতাব্দির মুসলমান শাসনের অবসান ঘটে। 

মধ্যযুগের সুলতানি আমল ছিল বাংলার জন্য স্বর্ণযুগ।এই সময়েই সুলতান শামসুদ্দিন ইলায়াস শাহের দূরদর্শিতা ও প্রচেষ্টার ফলে সর্বপ্রথম বাঙালি একটি সতন্ত্র জাতি হিসাবে আত্ম প্রকাশ করে। সেসময় অর্থনৈতিক অবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প সাহিত্য সবদিক থেকে বাঙালি জাতি উন্নতির শিখরে উঠেছিল। হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ জৈন ব্রাহ্মণ চণ্ডাল সবার মিলিত অবদানে তা সম্ভব হয়েছিল। সুলতান ধর্মে মুসলমান হলেও, রাজকার্য, খাজনা আদায়, সৈন্যবাহিনী সবেতেই হিন্দুদের প্রাধান্য ছিল। হিন্দু ধর্ম গ্রন্থ রামায়ণ, মহাভারত, মঙ্গলকাব্য মুসলমান সুলতানদের আদেশ উৎসাহ ও অর্থসাহায্যের ফলেই বাংলা ভাষায় রচনা করা সম্ভব হয়েছিল। হিন্দু বাঙালিদের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার নামের সঙ্গে আরবি-ফার্সী পদবী যুক্ত রয়েছে । মুসলমান শাসকদের দেওয়া সেই পদবীগুলো বাঙালি হিন্দুরা আজও বংশ পরস্পরায় তাদের নামের সঙ্গে যুক্ত করে তাদের বংশের মর্যাদা রক্ষা করে চলেছেন। এই পদবীগুলো মধ্যযুগে বাংলার হিন্দু-মুসলমানের মিলিত বাঙালি সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।

কিন্তু হিন্দু অভিযাতদের একটা শ্রেণী মুসলমান শাসনকে মন থেকে কখনও মেনে নিতে পারেনি। সুলতানের দরবারে ব্রাহ্মণ-চণ্ডালের একই মর্যাদা, হিন্দু মুসলমান, ব্রাহ্মণ শুদ্র অপরাধির একই শাস্তি, বাংলা ভাষায় রামায়ণ মহাভারত রচনা – এগুলো তাদের কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছিল। তারা সুলতানদের দেওয়া, রাজা মহারাজা খেতাব নিয়ে সুযোগ সুবিধা সম্মান ভোগ করত কিন্তু ভিতরে ভিতরে মুসলমান শাসনের অবসান ঘটানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। 

সর্বপ্রথম তারা সে চেষ্টা করে রাজা গনেশকে সামনে রেখে। কিন্তু রাজা গনেশের নিজের ছেলে যুবরাজ যদু তাদের সে প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দেন। যুবরাজ যদু রাজা গনেশকে হত্যা করে,  নিজে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সুলতান জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহ নাম নিয়ে বাংলার সিংহাসনে বসেন।

দ্বিতীয়বার বাংলার মাটি থেকে মুসলমান শাসনের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করা হয় সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সময়ে। কিন্তু সুলতানের দাপটে সে চেষ্টাও ব্যার্থ হয়েযায়।


বর্গী হানা

অনুমান করা হয়, নবাব আলীবর্দী খানের সময় সুবে বাংলা থেকে কিছু লোক গিয়ে মারাঠা প্রধানমন্ত্রী ভাস্কর পণ্ডিতের সঙ্গে দেখা করে তাকে বাংলা আক্রমণ করতে উৎসাহিত করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল বাংলা থেকে মুসলমান নবাবি শাসনের অবাসন ঘটানো। ভারত চন্দ্র রায়ের অন্নদামঙ্গল কাব্যে এ সমন্ধে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 

আছয়ে বর্গির রাজা গড় সেতারায়।
আমার ভকত বড় স্বপ্ন কহ তায়।।
সেই আসি যবনেরে করিবে দমন।

এর পরিণামে মারাঠা বর্গি লুঠেরা বাহিনী পর পর ৬ বার বাংলা আক্রমণ করে। মারাঠা বর্গিরা বাংলার উপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার নির্যাতন চালিয়েছিল, মানব সভ্যতার ইতিহাসে সেরকমটি খুব বেশি দেখা যায়নি।

লুঠি বাঙ্গালার লোকে করিল কাঙ্গাল।
গঙ্গা পার হৈল বান্ধি নৌকার জাঙ্গাল।।
কাটিল বিস্তর লোক গ্রাম গ্রাম পুড়ি।
লুঠিয়া লইল ধন ঝিউড়ী বহুড়ী।।

এক হিসাব অনুযায়ী, দশ বছরব্যাপী মারাঠা আক্রমণের ফলে বাংলায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রায় ৪,০০,০০০ অধিবাসী প্রাণ হারায়। দশ বছরব্যাপী বাংলা আক্রমণকালে অসংখ্য নারী মারাঠাদের হাতে নির্যাতিত হয়। মারাঠারা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সুন্দরী নারীদের অপহরণ করে। অসংখ্য নারী মারাঠা সৈন্যদের হাতে গণধর্ষণের শিকার হয়। সমসাময়িক সূত্রসমূহের বর্ণনানুযায়ী, মারাঠা সৈন্যরা হিন্দু নারীদের মুখে বালি ভরে দিত, তাদের হাত ভেঙ্গে দিত এবং পিছমোড়া করে বেঁধে তাদেরকে গণধর্ষণ করত।

‘‘কারু হাত কাটে, কারু নাক কান,
একি চোটে কারু বধ এ পরাণ।
ভাল ভাল স্ত্রীলোক যত ধইরা লইয়া জাএ
আঙ্গুষ্ঠে দড়ি বাঁধি দেয় তার গলা এ।
একজনে ছাড়ে তারে আর জনে ধরে
রমণের ডরে ত্রাহি শব্দ করে’’।

পশ্চিমবাঙ্গলার গ্রামগুলি বরাবরই হিন্দু প্রদান ছিল, এখনও তাই। শিব ভক্ত মারাঠাদের অত্যাচারের হাত থেকে হিন্দু বাঙালির বিষ্ণু মোণ্ডবও রেহাই পেত না।

বাঙ্গালা চৌআরি জত বিষ্ণু মোণ্ডব ৷
ছোট বড় ঘর আদি পোড়াইল সব।।

শেষপর্যন্ত নবাব আলীবর্দী কৌশল করে ভাস্কর পণ্ডিতকে হত্যা করেন। এবং মুসলমান নবাবির অবসান ঘটানোর জন্য় হিন্দুত্ববাদী অভিজাতদের এই প্রচেষ্টাও চরম ব্যর্থতায় পর্যবষিত হয়। 


অবশেষে দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ শতাব্দী ধরে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু অভিজাতরা যে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল, বিদেশী ইংরেজ বণিক সে সুযোগ এনে দিল। ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে পলাশির যুদ্ধে বাংলার শেষ মুঘল নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতন হল। ইংরেজ রাজ পুরুষদের উপস্থিতিতে প্রতিমা পুজার মাধ্যমে ধুমধাম করে সে বিজয় উৎযাপন করা হল।  ষড়যন্ত্রে চুক্তির শর্ত মত ইংরেজরা মির্জাফরকে পুতুল নবাব করে মসনদে বসাল।  ষড়যন্ত্রের পুরস্কার স্বরূপ কৃষ্ণচন্দ্রকে রাজা থেকে মহারাজা খেতাব দেওয়া হল। বাংলার মসনদে ক্ষমতাহীন পুতুল নবাব বসিয়ে ইংরেজ শক্তি এবার বিনা বাধায় বাণিজ্যের নামে সর্বব্যাপি লুণ্ঠন চালাতে থাকল।


পলাশির যুদ্ধের পর ইংরেজ শাসনকে সুবিধাবাদি অভিজাত শ্রেণীর বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় স্বাগত জানিয়েছিল। নবাবি আমলে আরবি ফারসী শিখে সরকারি চাকরির উঁচু উঁচু পদগুলো তারাই দখল করে রেখেছিল।  এখন তারা ইংরেজের প্রভুত্বকে শুধু স্বাগত জানাল তাই নয়, ইংরেজি শিক্ষা, তাদের সংস্কৃতি, তাদের জীবন-দর্শনকে সম্পূর্ণরূপে করায়ত্ত করবার জন্য উঠে পড়ে লাগল। ওদিকে ইংরেজরা তাদের রাজত্ব কেড়ে নিয়েছে, তাই শত্রুর শিক্ষা-সংস্কৃতি-সভ্যতার প্রতি মুসলমান সম্প্রদায় বিমুখ হয়ে রইল। 


ওয়াহাবি বিদ্রোহ

শিক্ষা অর্থনিতী রাজনিতীতে পিছিয়ে পড়া বঙ্গের মুসলমান সম্প্রদায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে শুরু করে। ১৮২০ খৃষ্টাব্দে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ওয়াহাবি আন্দোলন শুরু হোল। ওয়াহাবিদের লড়াই ভারতের আদিতম এবং সর্বাধিক দীর্ঘস্থায়ী ব্রিটিশ বিরোধী লড়াইগুলির মধ্যে অন্যতম। গোটা ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় ইতিহাসের সব থেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় ওয়াহাবিদের ব্রিটিশ বিরোধী লড়াই। ওয়াহাবিরা ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছিল। এই সময় যে সব ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অসংখ্য ষড়যন্ত্রকারীর বিচার হয়েছে এবং বিচারের রায়ে যাঁদের ফাঁসি হয়েছে তাঁরা প্রায় সকলেই ছিলেন ওয়াহাবি সম্প্রদায়ভুক্ত। 

তারপর তিতুমীরের বিদ্রোহ, ভারতের সিপাহী বিদ্রোহ, বাংলার ফকির বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ বা সাঁতাল হুল, মেদিনীপুরে চুয়াড় বিদ্রোহ, একরকম একটার পর একটা বিদ্রোহ আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভিত নড়িয়ে দিয়েছিল। গ্রাম বাংলার সাধারন মানুষ হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে এই বিদ্রোহে যোগ দিয়ে এগুলোকে ব্রিটিশ বিরোধী গণবিদ্রোহের রূপ দিয়েছিল। কিন্তু কলকাতার ব্রিটিশ অনুগ্রহ প্রাপ্ত তথাকথিত ভদ্রলোক বাবু সম্প্রদায় এই সমস্ত বিদ্রোহ আন্দোলনের বিরোধিতাই করেছিল। 

১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে এদেশের জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই কমবেশি অংশ গ্রহণ করেছে। কিন্তু অংশ গ্রহণ করেনি কলকাতার বর্ণহিন্দুরা।  বস্তুতঃ দেশের জনগণ যখন বিদেশী ইংরেজের নাগপাশ ছিন্ন করতে মরণপণে শূন্য হাতেই লড়ছে এবং স্বাধীনতা লাভের আশায় সমগ্র দেশে সমরানল জ্বলে উঠেছে, তখন কলিকাতার সংস্কৃতিমনা উচ্চবর্ণ সম্প্রদায় সখের বাগান বাড়িতে, নাট্যশালায়, বাইজির নাচ আর অভিনয় দেখে কাটিয়েছে। 

সিপাহী বিপ্লবের ব্যর্থতায় বাংলার হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। মুসলমানদের প্রতি ধিক্কার জানিয়ে গদগদ ভাষায় তারা ইংরেজ শাসকদের প্রতি তাদের আনুগত্য নিবেদন করেন। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র সংবাদ ভাস্কর-এ লিখলেন: হে পাঠক, সকলে উদ্বাহু হইয়া ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়া জয়ধ্বনি করিতে করিতে নৃত্য কর। আমাদের প্রধান সেনাপতি মহাশয় সক্ষম হইয়া দিল্লী প্রবেশ করিয়াছেন। পাঠকগণ জয় জয় বলিয়া নৃত্য কর, হিন্দু প্রজা সকল, দেবালয়ে পূজা দেও, আমাদের রাজ্যেশ্বর শত্রুজয়ী হইলেন।

 


আধুনিক শিক্ষার প্রসার

ধীরে ধীরে বাংলার মুসলমান নেতৃত্ব বাস্তবকে বুঝতে শুরু করল। ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর বিশ্বের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে আগের মত আর নেই, একথা তারা অনুধাবন করতে পারল। আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করতে পারল। কিন্তু ততদিনে বাংলার সাধারন মুসলমান জনসাধারনের জন্য আধুনিক শিক্ষা লাভের রাস্তা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

মুসলমান আমলে সুলতান ও নবাবেরা গ্রাম বাংলায় সাধারণ শিক্ষার জন্য অনেক পাঠশালা, মক্তব, মাদ্রাসা, টোল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। হিন্দু মুসলিম ব্রাহ্মণ শুদ্র সবাই বিনা খরচাতে এই  বিদ্যালয়গুলোতে পড়তে পারত। বাংলার প্রায় প্রত্যেক গ্রামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৮৩৫-৩৮ সালের অ্যাডামস রিপোর্টে উইলিয়াম অ্যাডামস বলেন যে, তিনি নিজে বাংলাতে এরকম ১লক্ষ বিদ্যালয় দেখেছেন।  তখন, ব্রিটেনে স্কুল ছিল মাত্র ২-৩ হাজার। ব্রিটেনের ২-৩ হাজার স্কুলে যা পড়ানো হতো, বাংলার লক্ষাধিক বিদ্যালয়ে তারচেয়ে বেশি ভাল বিদ্যা পড়ানো হতো। ব্রিটিশরা যখন স্কুলে পড়ত মাত্র এক বছর, বাংলার ছাত্ররা পড়ত টানা কয়েক বছর। খরচ চালানোর জন্য বিদ্যালয়গুলিকে ভূমি দান করা হয়েছিল। এই জমির জন্য সরকারকে কোন খাজনা দিতে হোত না। তাই  এই জমিগুলোকে লাখেরাজ সম্পত্তি বলা হতো। 

ইংরেজ সরকার আবিষ্কার করেন যে বাংলার প্রায় ২৫শতাংশ জমি লাখেরাজ হয়ে আছে। ব্রিটিশ সরকার এই সমস্ত লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেয়। তার ফলে বিদ্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে যায়, সারা বাংলাতে অশিক্ষার অন্ধকার ঘনিয়ে আসে, এবং এই বিদ্যালয়গুলোর উপর নির্ভরশীল কয়েক লক্ষ মানুষ রাতারাতি কর্মহীন বেকার হয়ে পড়ে, বহু শিক্ষিত পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। 

উইলিয়াম হান্টার লিখেছেন, এর ফলে “শত শত মুসলমান পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল এবং তাদের শিক্ষাপ্রণালী, যা এতদিন লাখেরাজ ওয়াকফের জমিজমার উপর নির্ভরশীল ছিল, মারাত্মক আঘাত পেল। মুসলমান আলিম-সমাজ প্রায় আঠারো বছরের হয়রানির পর একেবারে ধ্বংস হয়ে গেল।” বাঙালি জাতির এতো বড় সর্বনাশ এর আগে কেউ করেনি। কিন্তু ইংরেজদের অনুগ্রহপ্রাপ্ত সেই সময়ের কলকাতার ভদ্রলোকদের লেখা ইতিহাসে, সাহিত্যে এর কোন উল্লেখ্ আমরা দেখেতে পায় না।

হিন্দু ভদ্রলোকদের উদ্যোগে এই সময় কলকাতায় কিছু স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, কিন্তু সেগুলোতে মুসলমান ছাত্রতো দুরের কথা নিম্ন বর্ণের হিন্দু ছাত্রদেরও প্রবেশাধিকার ছিল না। এমনকি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রতিষ্ঠিত স্কুলেও এই ভেদাভেদ প্রতিষ্ঠিত ছিল। অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছেন “বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত কলেজে মুসলমান ছাত্রদের ভর্তি হওয়ার সুযোগ ছিল না। মুসলমান ছাত্ররা লেখাপড়ার সুযোগ পেলে কারও কাছে পিছিয়ে থাকত না।” 

স্কুলগুলোতে পড়তে গেলে বেতন দিতে হত, তাই কেবলমাত্র উচ্চবর্ণের পয়সাওয়ালা অভিজাত শ্রেণির ছাত্ররাই এই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পেত। যদিও হাজী মুহাম্মদ মহসীন প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল, হিন্দু-মুসলমান সব ছাত্ররাই বিনা বেতনে এখনে পড়তে পারত। 

পরবর্তীকালে কতগুলি সরকারি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু সেগুলোতেও মুসলিম ছাত্ররা ভর্তি হতে পারত না। কারণ কলকাতার বর্ণহিন্দু ভদ্রলোকেরা প্রতিবেশী মুসলমানদের স্বার্থকে কোন হিসাবের মধ্যেই আনতেন না। ১৮৫৫ এবং ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অধীনে কোলকাতা ও হুগলীতে স্থাপিত দুটি সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে একজনও বাঙালি মুসলমান ছাত্র ভর্তি হতে সক্ষম হয়নি। কারণ ভর্তিচ্ছু ছাত্রদের যে ৩টি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হত তা হচ্ছে (১) সীতাবৌদ্ধ শকুন্তলা (২) বেতালপঞ্চ বিংশতি এবং (৩) সংস্কৃত ব্যাকরণ উপক্রমণিকা।  ফলে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও আলোচ্য স্কুল দুটিতে স্বাভাবিকভাবেই বাঙালি মুসলমান ছাত্রদের জন্য দরজা বন্ধ ছিল । 

পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে নবাব আবদুল লতিফ, স্যার সৈয়দ আমির আলী’র মতো কিছু অভিজাত ব্যক্তি বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে উদ্যোগী হন। ধিরে ধিরে মুসলমান সমাজের মধ্যেও শিক্ষার প্রসার লাভ করতে থাকে এবং একসময় তারা পূর্বের থেকে এগিয়ে থাকা হিন্দু বাঙালির সঙ্গে চাকরি, ব্যবসা, রাজনিতী সর্বক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়। 

কলকাতার ভদ্রলোকেরা এইসময় ইচ্ছাকৃতভাবে বাঙালি মুসলমানকে শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে রাখার চক্রান্তে লিপ্ত ছিল। ১৯০০ খৃষ্টাব্দে‘শেরে বাংলা’ শিক্ষামন্ত্রী হয়ে লক্ষ্য করলেন মুসলমান শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয় কিন্তু পাশ করে না। কেন শিক্ষার্থীরা পাশ করছে না জানার জন্য তিনি তদন্ত কমিটি গঠন করলেন। তদন্তে বেরিয়ে আসলো উচ্চবর্ণের হিন্দু শিক্ষকরা মুসলমান নাম দেখলেই কেটে দিতেন। আর ফেল করেই তারা হারিয়ে যেতো। সে কারণেই  উচ্চ শিক্ষায় মুসলিম শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া যেতো না। এভাবেই ইচ্ছা থাকা সত্বেও শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানরা পিছিয়ে পড়ছিল। শেরে বাংলা শিক্ষার্থীদের নাম বাদ দিয়ে নতুন পদ্ধতিতে রোল নাম্বার দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। এতে প্রত্যাশিত সাফল্য পাওয়া গেল। নতুন পদ্ধতি প্রয়োগের প্রথম বছরেই ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হন হুমায়ুন কবির, তিনি পরবর্তীতে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হন।


হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ

পাাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ও পাশ্চাত্য ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হিন্দু ভারতীয়দের মধ্যে ক্রমে ক্রমে জাতীয়তাবাদী ধ্যান ধারানার প্রসার ঘটতে থাকে, এই ব্যাপারে বাঙালি হিন্দুরাই ছিল অগ্রণী। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এসময় থেকে জাতি বলতে কেবল মাত্র হিন্দু ও জাতীয়তাবাদ বলতে হিন্দু পুনর্জাগরণ বুঝানো হতে লাগল। ভারতীয়ত্ব ও হিন্দুত্বকে এক করে ফেলার দর্শন প্রচার হতে লাগল।

অরবিন্দ ঘোষ ইংল্যান্ডে পাড়ি দিলেন এবং লন্ডন ও কেমব্রিজে লেখাপড়া করে দেশে ফিরে তিনি যে ‘রাজনৈতিক বেদান্ত’ দর্শনের বিকাশ সাধন করেন, তাতে সেখানে জাতীয় পরিচিতির সাথে দেবী মাতা কালীকে যুক্ত করেন। এ সময়ে বিপিনচন্দ্র পাল ও সরলা দেবী জাতীয় কর্মসূচিতে কালীপূজা ও শিবাজী উৎসব অন্তর্ভুক্ত করেন। 

এই সময় বিভিন্ন মনগড়া নতুন নতুন তত্ত্ব প্রচার করা হতে লাগল।  ভদ্রলোকেরা নিজেদের আর্যবংশদ্ভুত বলে দাবী করে আর্য শ্রেষ্ঠত্বের প্রচার করতে লাগলেন। 

বাল গঙ্গাধর তিলক লিখলেন  “আর্য হিন্দুরা দেবলোক থেকে এসে প্রথম মর্তে নামেন উত্তর মেরুতে, তারপর ইয়োরোপের মধ্য দিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েন পৃথিবীকে একটি সুসভ্য ও সংস্কৃতিবান গ্রহরূপে তৈরি করবার জন্য এবং তাঁরাই স্বর্গ থেকে মর্তে আসবার সময়ে চতুর্বেদ স্বর্গ থেকে বহন করে আনেন।” তিনি শিবাজি উৎসব ও গণপতি উৎসবের মধ্য দিয়ে হিন্দু ধর্মের আদর্শকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বপন করেছিলেন এবং এইভাবে সমগ্র অ-হিন্দু সমাজের রাজনৈতিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বসলেন।

আর্য তথা ব্রাহ্মণ্যাবাদী শ্রেষ্ঠত্বের প্রচার করতে গিয়ে ভারতবর্ষের প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করা হল। বলা হল, আর্য-হিন্দুরা চিরদিন শান্তিপ্রিয় এবং আবহমানকাল ধরে তাঁরাই পৃথিবীতে শান্তির বাণী বহন করে এনেছেন, অতীতে আর্য-হিন্দুরাই সর্বপ্রথম বিশ্বমৈত্রীর বন্ধনে সমগ্র বিশ্বকে সম্মিলিত করবার ব্রত নিয়েছিল। 

কিন্তু ইতিহাস বলে, এদেশে আর্যদের জীবনপ্রভাত শুরু হয়েছিল নিরীহ শান্তিপ্রিয় অনার্য অর্থাৎ দাস বা দস্যুজাতির রক্তসিঞ্চনে। বেদের বহু মন্ত্রে দাস ও দস্যু জাতিকে হত্যা করবার শক্তি ও সুযোগ প্রার্থনা করা হয়েছে দেবতার কাছে। বিশেষত ঋক্ বেদ ও অথর্ব বেদে। 

ন্যায়বিচারের ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু অস্বীকার করে এদেশে ব্রাহ্মণ ও শূদ্রের মধ্যে দণ্ডবিধি প্রয়োগের পৃথক মাপকাঠির ব্যবস্থা করেছিল। অশোকের দণ্ড-সমতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল। “উচ্চশ্রেণীর লোকেরা নিম্নশ্রেণীর লোকদের উপর অত্যাচার করিলে দণ্ড কম হইবে, কিন্তু বিপরীত ঘটনাক্ষেত্রে দণ্ড অধিক হইবে- এই আইন পুনঃপ্রচলিত হয়। 

নাম এবং জাতি তুলিয়া শুদ্র যদি দ্বিজ জাতির উপর আক্রোশ প্রকাশ করে, তবে একটি জ্বলন্ত দশ অঙ্গুলী পরিমিত লৌহ শঙ্কু উহার মুখে নিক্ষেপ করা কর্ত্তব্য; দর্পের সহিত শুদ্র যদি ব্রাহ্মণকে ধৰ্ম্মোপদেশ দেয় তাহা হইলে রাজা তাহার মুখে ও কর্ণে তপ্ত তৈল নিক্ষেপ করাইবেন; শুদ্র যদি শ্রেষ্ঠ জাতির প্রতি কোন প্রকার হিংসামূলক কার্য্য করে তাহা হইলে তৎকৃত অপরাধের জন্য হস্ত বা পদচ্ছেদ, পাছা কাটিয়া দেওয়া অথবা ওষ্ঠাধর ছেদন করা প্রভৃতি হইবে !”

নারী ধর্ষণ করলে ব্রাহ্মণের শাস্তি ছিল কিঞ্চিৎ অর্থদণ্ড এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাও নয়। কিন্তু শুদ্রের বেলায় শাস্তি নির্বাসন এবং সকল সম্পত্তির অধিকার লোপ। ব্রাহ্মণ নারী ধর্ষণ করলে ১০০০ মুদ্রা দণ্ড দিতে হত ব্রাহ্মণকে, কিন্তু শুদ্র-রমণী ধর্ষণ করলে ব্রাহ্মণের দণ্ড ছিল ৫০০ মুদ্রা। কোনো অপরাধেই, এমনকি নরহত্যার অপরাধেও ব্রাহ্মণকে মৃত্যু দণ্ডতো দুরের কথা, কোনো দৈহিক শাস্তি দেবার আইনও ছিল না।

ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক গতিকে যাঁরা জাতিভেদের প্রাচীর দিয়ে এদেশে রূদ্ধ করে দিয়েছিলো, তাঁরা কি করে বিশ্বমৈত্রীর আদর্শকে সফল করতে পারত তার কোন সদুত্তর নেই। সমগ্র পৃথিবীতে এমন দৃষ্টান্ত কোথাও নেই, যেখানে মানুষে মানুষে রক্তের মিলন সংঘটিত হতে দেওয়া হয় না।

প্রায় ৭০০ বছরের মুসলমান শাসনের ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাসকে পুরোপুরি অস্বীকার করা হল। বলা হতে লাগল জগতে আর্য-হিন্দুরাই একমাত্র পরমত, পরধর্ম সহিষ্ণু জাতি। শুধুমাত্র হিন্দুদের এই পরধর্ম সহিষ্ণুতার জন্যই ইসলাম ধর্ম এখনও এদেশে টিকে আছে। কিন্তু বৌদ্ধ-জৈন ধর্মমত কি কারনে এদেশ থেকে বিলুপ্ত প্রায় হয়ে গেল তার কোন সদুত্তর তাদের কাছে নেই। 

‘শঙ্কর বিজয়ে’ আছে -“দুষ্ট মতাবলম্বী বৌদ্ধ জৈনদের তর্কে পরাজিত করিয়া তাহাদের মস্তক ছেদন করতঃ ঢেঁকিতে কুটিয়া দুষ্টমত ধ্বংস করিবে।”   ইতিহাস বলে যে ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনরুত্থানের সময় শঙ্করাচার্য্যের গুরু কুমারীল ভট্ট একজন ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজাকে প্ররোচিত করে কয়েক সহস্র বৌদ্ধদের হত্যা করিয়েছিল। “শঙ্কর দিগ্বিজয়ে” আছে – বৌদ্ধ গুরু বধের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ যখন কুমারিল ভট্ট তুষানলে প্রবেশ করেন, সে-সময়ে শঙ্কর তাঁর নিকট উপস্থিত হ’লে কুমারিল বলেছিলেন “বৌদ্ধেরা সমস্ত দেশ অধিকার করে নিয়েছে, বৈদিক মার্গ ও লুপ্তপ্রায় অবস্থা।” এই কথা শুনে শঙ্কর কুমারিলের সামনে ভারত থেকে বৌদ্ধ নির্মুলের প্রতিজ্ঞা করল এবং কুমারিলের মৃত্যুর পর দলবল নিয়ে বৌদ্ধ নিধনে বেরিয়ে পড়ল। গৌড়ের সম্রাট শশাঙ্ক বোধিবৃক্ষ উৎপাটিত করেছিলেন।

এমন সব তত্ত হাজির করা হতে লাগল যেন লঙ্কার অনার্য রাজা রাবণ পরস্ত্রী হরন করেছিল, তারপর মুসলমান সুলতান আর বাদশাহরা যুদ্ধ জয় করার পর পরস্ত্রী হরন নিজেদের অভ্যাসে পরিনত করেছিল এবং প্রাচীন কালের আর্য-হিন্দু রাজারা “মাতৃবৎ পরদারেষু” নীতিতে অবিচল ছিল। 

কিন্তু খজুরাহোতে পাওয়া ১০০২ খৃষ্টাব্দের শিলালিপিতে চন্দেল-রাজ ধঙ্গের দিক্‌বিজয় সম্বন্ধে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে: “তুমি কে ? কাঞ্চী রাজপত্নী ! তুমি কে ? অন্ধ্রাধিপত্নী ! তুমি কে ? রাঢ়ারাজপত্নী ! তুমি কে ? অঙ্গরাজপত্নী ! সমর বিজয়ী রাজা ধঙ্গের কারাগারে সজল নয়নে শত্রুপত্নীগণের মধ্যে এইরূপ কথোপকথন হইয়াছিল।” এর থেকে বোঝা যায়, পরাজিত শত্রুরাজার রাণীকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়ার অভ্যাস সেই প্রাচীন হিন্দু যুগেও ছিল। 

এইসব বিকৃত ধ্যান-ধারণা একটা নতুন ‘হিন্দু’ রাজনৈতিক পরিচিতি সৃষ্টি করল। কলকাতার বাবু ভদ্রলোকেরা এই সময় থেকে নিজেদেরকে বাঙালি মুসলমানদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করতে লাগল। কলকাতার ভদ্রলোক হিন্দুদের এই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, বাঙলার মুসলমানেরা কম-বেশি হিন্দু সমাজের নীচু শ্রেণীর ছোটজাতগুলির লোকদের থেকে ধর্মান্তরিত। তাই নীচু জাতের বাঙালি হিন্দু ও উপজাতীয়দের প্রতি ভদ্রলোকদের সহজাত ঘৃণা বাঙালি মুসলমানদের প্রতিও বিস্তৃত হল।  

সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাসের বিকৃতি সাধন করে কেন্দ্রীয় মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে আঞ্চলিক রাজপুত, মারাঠা, শিখ শক্তির যুদ্ধকে হিন্দু-মুসলমানের যুদ্ধ হিসাবে উত্থাপন করা হল। বস্তুত মধ্যযুগের ইতিহাসে সারা ভারত ব্যাপি নিরন্তর যুদ্ধবিগ্রহ হলেও তাতে সাম্প্রদায়িকতা ছিল না, এগুলো ছিল পরস্পর বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির লড়াই। হিন্দু-মুসলমান সৈন্য-সেনাপতিরা উভয়পক্ষের হয়েই যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু এখন থেকে ইতিহাসের যে নতুন ব্যাখ্যা দেওয়া হতে লাগল, তাতে প্রতিটা যুদ্ধকে মুসলমান আক্রমনকারীর বিরুদ্ধে হিন্দুদের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ হিসাবে দেখানো হতে লাগল। 

ভদ্রলোকেরা তাদের রচিত সাহিত্যে, কাব্যে, উপন্যাসে এই সময় মুসলমানদের উদ্দেশ্যে যবন, ম্লেচ্ছ, পাতকী, পাষণ্ড, পাপিষ্ঠ, পাপাত্মা, দুরাত্মা, দূরাশয়, নরাধম, নরপিশাচ, বানর,  নেড়ে,  ধেড়ে, এঁড়ে, অজ্ঞান, অকৃতজ্ঞ প্রভৃতি বাছা বাছা বিশেষন ব্যবহার করতেন। কলকাতার ভদ্রলোক বাবুদের রচিত গল্প-উপন্যাসে ইসলাম ধর্মাবলম্বী প্রত্যেক শাসককেই আবশ্যিকভাবে নৃশংস অত্যাচারী, হিন্দু মন্দির ধ্বংসকারি, হিন্দু নারী ধর্ষনকারী হিসাবে দেখানো হল। আর বাঙালি জাতির উপর দীর্ঘ দশ বছর ধরে নৃশংস ভয়ঙ্কর লুঠতরাজ চালানো, হিন্দুনারী ধর্যনকারী যুদ্ধপরাধি শিব ভক্ত বর্গি মারাঠা আক্রমণকে বঙ্কিমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র বা পরবর্তীকালে শরৎচন্দ্রের মতো জনপ্রিয় স্বনামধন্য সাহিত্যিক উপন্যাসিকরা বেমালুম চেপে গেলেন। 

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমল থেকেই হিন্দুরা বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুরা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পেশাগত একচেটিয়া অধিকারের কায়েমি স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। পূর্ববাঙলা ও আসামের কিয়দংশ মুসলমান প্রধান হওয়া সত্বেও সেখানে আইন ব্যবসা, ডাক্তারি, চা ও পাটের ব্যবসায়ে হিন্দুরা নিজেরাই অথবা ইংরেজ বণিক কোম্পানীর প্রতিনিধি হয়ে পেশাগুলিতে একচেটিয়া কর্তৃত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। 

কলকাতার বাবু ভদ্রলোকদের প্রায় প্রত্যেকেরই পূর্ববঙ্গে ছোট-বড় জমিদারি ছিল, কিন্তু নিজেদের জমিদারি এলাকার প্রজাসাধারণের শিক্ষা-সংস্কৃতি বা আর্থিক অবস্থার উন্নতি নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যাথা ছিল না। গ্রাম বাংলাকে শোষন করেই কলকাতা হয়ে উঠেছিল যাবতীয় উন্নয়নমুখি কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্ব কবি জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেও তাঁর নিজের জমিদারি এলাকায় একটা প্রাইমারি স্কুল তো দূরের কথা একটা নলকুপও প্রতিষ্ঠা করেন নি। 

এর ফলে মুসলমান প্রধান পূর্ববঙ্গ ক্রমেই পিছিয়ে পড়তে থাকে এবং হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ ক্রমশই বাড়তে থাকে। ১৮৯৯ সালে ভারতের বড়লাট হয়ে লর্ড কার্জন ভারতীয় সমাজের এই বিস্ফোরণোন্মূখ অবস্থাটির কথা সম্যকরূপে উপলব্ধি করে তার প্রতিবিধানের চেষ্টা করলেন।  বাংলা প্রদেশকে দুটি ভাগে ভাগ করে মুসলমানপ্রধান পূর্ব বাংলায় মুসলমানদের শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি করে দিলেন। 

কিন্তু পূর্ব বাঙলা মুসলমানদের কর্তৃত্বাধীনে চলে গেলে কলকাতার ভদ্রলোকদের একচেটিয়া অধিকারে বাধা পড়বে বলে বঙ্গ-ভঙ্গ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা হল।


বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন

১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন শুধু বাংলায় নয়, সারা ভারতবর্ষে সৃষ্টি করলো দুটি জাতীয়তাবাদ – একটি হিন্দু অপরটি মুসলমান। বিদেশী দ্রব্য বয়কট ও বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্বের প্রথম সারিতে দাঁড়ালেন, যেমন—তিলক, অরবিন্দ, বিপিন পাল -এরা এমন একটা রাজনৈতিক আদর্শের প্রচার আরম্ভ করলেন যাতে মুসলমানের স্থান পাওয়া অসম্ভব ছিল। এরা প্রত্যেকেই রাজনৈতিক আদর্শের ভিতর দিয়ে হিন্দু ধর্মীয় আদর্শকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার কাজে লিপ্ত ছিলেন।

এই সময়ে বাঙলার বিপ্লবী দলগুলো প্রধানত পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত লোকদের মধ্য থেকে দলীয় সদস্য সংগ্রহ করলেও যুবক অনুসারীদের শাক্ত দর্শন দ্বারা অনুপ্রাণিত ধর্মীয় শপথে আবদ্ধ করত। দেবী প্রতিমার সামনে হিন্দু ধর্মীয় আচার মেনে শপথ নিতে হত। তাদের কাছে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে সংগঠিত করার আসল লক্ষ্য ছিল দীর্ঘকালব্যাপী স্থবির হিন্দু জাতির পুনর্জাগরণ ও নতুন করে তাকে সবল করা। স্বভাবতই বাঙালি মুসলমান যুবকেরা এইসব বিপ্লবী দলগুলোতে যোগদান করা থেকে বিরত থাকত। যদিও তারা বিপ্লবীদের ব্রিটিশ বিরোধী কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করত।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজাফফর আহমেদের লেখা “কমিউনিস্ট পার্টি ও আমার জীবন” বইতে দেখিয়েছেন যে, “সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের অন্যতম মুখ্য প্রতিষ্ঠান অনুশীলন সমিতির লিখিত প্রচারপত্রে লেখা থাকতো যে, সমিতির অন্যতম উদ্দেশ্য মুসলমানদের দাবিয়ে রাখা, এবং সমিতির নিয়ম ছিল কোন অহিন্দু সমিতির সভ্য হতে পারবে না।” 

অনুশীলন সমিতির একটি ইশতেহারে প্রকাশ্যভাবে মুসলমানদের সম্বন্ধে উল্লেখ করা ছিল “যতদুর দেখা যাচ্ছে তাতে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে দু-এক বছরের মধ্যেই সমগ্র মুসলমান জাতি হিন্দুদের নিকট বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হবে। কিন্তু তখন যদি হিন্দুরা তাদের দৃঢ়তা ও জাতীয় গৌরব বিসর্জন দিয়ে অতীব অধোগামী হয়ে মুসলমানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তাদের সঙ্গে হাত মেলায় তাহলে মুসলমানদের বাড় বেড়ে যাবে এবং তাতে মঙ্গল না হয়ে অমঙ্গলই হবে”। এই সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরাই ১৯০৫-এই বঙ্গ-বিভাগ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

যদিও হিন্দু শিক্ষিতেরা এটা এখনও স্বীকার করতে রাজি নন যে এই বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ছিল সন্দেহাতীতভাবে মুসলমান বিরোধী এবং গভীরভাবে পূর্ব বঙ্গের মুসলমান স্বার্থের পরিপন্থী। এই আন্দোলনের তাগিদে যে সকল বিপ্লববাদী নেতা কর্মক্ষেত্রে প্রকাশিত হলেন, তাঁরা সকলেই ছিলেন গভীরভাবে মুসলমান  বিরোধী। মৌলানা আবদুল কালাম আজাদ তাঁর ‘ইণ্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ বইতে লিখেছেনঃ “বিপ্লববাদীরা যে শ্রেণী থেকেই আসুন না কেন, প্রত্যেকেই ছিলেন মুসলমান বিরোধী।”

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে দেশের হিন্দু নেতারা যে অন্ধ রাজনীতির অনুসরণ করেছিলেন, তার নিন্দা করে ডঃ আম্বেদকর লিখেছেনঃ ‘বাঙালী হিন্দুদের বাংলা বিভাগের বিরোধিতা করার প্রধান কারণ ছিল, পূর্ববঙ্গে বাঙালী মুসলমানেরা যাতে যোগ্য স্থান না পেতে পারে সেই আকাঙ্ক্ষার দরুণ। বাঙালী হিন্দুরা স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি যে, বাংলা বিভাগের বিরোধিতা করে এবং সেই সঙ্গে স্বরাজলাভের দাবি করে তাঁরা একদিন মুসলমানদের পূর্ব ও পশ্চিম উভয় বঙ্গের শাসক করে তুলবেন।’ (পাকিস্তান অর পার্টিশন অফ ইণ্ডিয়া-ইংরেজির অনুবাদ, ১১০ পৃঃ)

বাংলার মুসলমানদের অবস্থা এই দাঁড়িয়েছিল যে তারা জমিদার বাড়িতে গেলে ঘরের ফরাস তুলে তাদের মাটিতে বসতে দেওয়া হত অথবা চেয়ার থাকা সত্ত্বেও তাতে না বসে তাদের দাঁড়িয়ে থাকা ব্যবস্থা মেনে নিতে হত। এখন তারা যদি একটি ভিন্ন প্রদেশ গঠন করে তাদের নিজস্ব সমাজ-দর্শনকে বিনা বাধায় বিকশিত করতে চায় তা করতে দেওয়া হল না। 

বঙ্গভঙ্গ রদ হলে মুসলমান শিক্ষিত সমাজ বুঝতে পারল হিন্দু শিক্ষিত সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও চক্রান্তের পারদর্শিতার কাছে তাদের ভবিষ্যত অন্ধকারেই থাকবে। তারা হিন্দু শিক্ষিত সমাজের কাছে চাকরি-বাকরি ও অন্যান্য সামাজিক সুবিধা লাভের বেলায় এঁটে উঠতে পারবে না। মুসলিম শিক্ষিত সমাজের স্বার্থ রক্ষার জন্য তারা ১৯০৬ সালে মুসলিম লিগ গঠন করল ঢাকায়।

সুলতানি আমলের শাহি বাঙ্গালহ বা স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্রের মুঘল আমলে নামকরণ করা হয়ে ছিল সুবা বাংলা। কার্জন এই সুবা বাংলাকে আসাম ও বাংলা প্রদেশে ভাগ করতে চেয়েছিলেন। ভদ্রলোকেরা আন্দোলন করে কার্জনের বাংলা বিভাগকে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তখনই সেই ঐতিহাসিক কাল থেকে বাঙালি জাতির বাসভূমি বলে পরিচিত, রাজমহল,  সাঁওতাল পরগনা,  ছোটনাগপুর, মানভূম, ধলভূম, কেঞ্জার, ময়ূরভঞ্জের খনিজ সম্পদ – বজনজ সম্পদ সমৃদ্ধ শৈলময় অরণ্যময় মালভূমি অঞ্চলকে বাংলা থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়। অথচ তার বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন হল না। 

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বড় বড় নেতা যেমন অরবিন্দ, তিলক, লাজপত রায়  জাতীয়তাবাদের সঙ্গে হিন্দু ধর্ম দর্শনের একটা সংমিশ্রণের প্রয়াস চালাবার দরুণ মুসলিম শিক্ষিত সমাজ এর থেকে দূরে সরে রইল। গান্ধী প্রথমে এই বিপত্তির কথা বুঝতে পেরে হিন্দু ও মুসলমানকে পাশাপাশি দাঁড় করাবার প্রত্যাশায় খিলাফৎ আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিলেন।

মুসলমান খিলাফত কর্মিদের জন্য অসহযোগ আন্দোলনের যে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী তৈরি করা হয়েছিল, তার অনুসরণে মুসলমানদের নধ্যে যে অভূতপূর্ব সাড়া জেগেছিল, হিন্দুদের মধ্যে কিন্তু গান্ধীজীর অসহযোগের কর্মসূচীর পক্ষে ততটা সাড়া জাগেনি। সেই সময় মুসলমান নেতারা সবাই খিলাফত সংক্রান্ত অসহযোগ আন্দোলনের জন্য বন্দী ও কয়েদি হয়েছিলেন। হিন্দু নেতাদের মধ্যে অসহযোগের কোন সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ছিল না, তারা  পৃথক পৃথক কারণে বন্দি ও কয়েদি হয়েছিলেন। একমাত্র মেদিনীপুরেরে ইউনিয়ন-বোর্ড বিরোধী আন্দোলন ছাড়া তখন সরকারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো সার্বিক গণ-আন্দোলন বাংলার আর কোনো জেলায় হয়নি। 

কিন্তু হিন্দু শিক্ষিত সমাজ খিলাফৎ আন্দোলনকে সমর্থন করা পছন্দ করে নি। তুরস্কের রাজনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খিলাফৎ আন্দোলন ভেস্তে যাওয়ায় হিন্দু-মুসলমান পূর্বের মতন আবার দূরে সরে গেল। হিন্দু শিক্ষিত সমাজের নিকট থেকে মুসলমান শিক্ষিত সমাজের আশংকার রেশ থেকেই গেল।

মুসলমান সমাজের এই আশংকা দূরীভূত করবার জন্য ১৯২১-এর গয়া কংগ্রেসে প্রস্তাব নেওয়া হোল যে চাকরি-বাকরি ও অন্যান্য সামাজিক সুখ-সুবিধায় মুসলমানের সংখ্যানুপাতিক ন্যায্য দাবি রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অচিরে একটি সর্বভারতীয় হিন্দু-মুসলিম চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। কিন্তু কংগ্রেস নেতারা শেষ পর্যন্ত এই প্রস্তাবের কথা ভুলেই গেলেন। 


বেঙ্গল প্যাক্ট

১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁর বেঙ্গল প্যাক্ট বা বাঙলার হিন্দু-মুসলিম চুক্তি সম্পাদন করলেন। স্যার আবদুর রহিম, মৌলভী আবদুল করিম, মৌলভী মুজিবুর রহমান, মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদি প্রমুখ মুসলিম নেতা, ও জে. এম. সেনগুপ্ত, শরত চন্দ্র বসু, জে. এম. দাশগুপ্ত, বিধান চন্দ্র রায় প্রমুখ হিন্দু নেতাদের সহায়তায় বেঙ্গল প্যাক্ট চুক্তিটি রচিত হয়েছিল। 

চুক্তির কয়েকটি ধারা ছিল:

১) বঙ্গীয় আইন সভায় প্রতিনিধিত্ব পৃথক নির্বাচক মন্ডলীর মাধ্যমে জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

২) স্থানীয় পরিষদসমূহে প্রতিনিধিত্বের অনুপাত হবে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের শতকরা ৬০ ভাগ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শতকরা ৪০ ভাগ।

৩) সরকারি চাকরির ৫৫% পদ পাবে মুসলিমরা। যতদিন ঐ অনুপাতে না পৌঁছানো যায় ততদিন মুসলিমরা পাবে ৮০% এবং হিন্দুরা পাবে ২০%। সরকারি চাকরি ছাড়াও কলকাতা কর্পোরেশন, জেলা ও স্থানীয় বোর্ড তথা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহে মুসলিমরা ঐ হারে চাকরি পাবে।

৪) কোনো সম্প্রদায়ের স্বার্থের পরিপন্থি কোনো আইন বা সিদ্ধান্ত ঐ সম্প্রদায়ের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ৭৫% এর সম্মতি ছাড়া উপস্থাপন করা যাবে না।

৫) মসজিদের সামনে বাদ্য সহকারে শোভাযাত্রা করা যাবে না।

৬) খাদ্যের জন্য গরু জবাই নিয়ে আইন সভায় কোনো আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া যাবে না। আইন সভার বাইরে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সমঝোতা আনার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। গরু জবাই করার সময় যাতে তা হিন্দুদের দৃষ্টিতে পড়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না করে তার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ধর্মীয় কারণে গরু জবাইয়ের ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করা যাবে না।

অধিকাংশ হিন্দু নেতা এই চুক্তির প্রতি বিরূপ ছিলেন। শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী‌ ও বিপিন চন্দ্র পাল এই চুক্তির বিরোধিতা করেন এবং তারা একে একতরফা বলে অভিযোগ করেন। হিন্দু গণমাধ্যমগুলো এর বিরুদ্ধে সমালোচনা শুরু করে। চিত্তরঞ্জন দাশকে অনেকেই সুবিধাবাদি ও মুসলিমদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ করেন।  

অনেক হিন্দু নেতা চিত্তরঞ্জন দাশের বিরোধিতা করলেও সুভাষচন্দ্র বসু, কিরণশংকর রায়, অনিলবরণ রায়, বীরেন্দ্রনাথ শাসমল ও প্রতাপচন্দ্র গুহ-র মতো নেতারা বেঙ্গল প্যাক্ট সমর্থন করেন। 

কিন্তু প্রায় সমগ্র হিন্দু শিক্ষিত সমাজ এই চুক্তির বিরোধিতায় আসরে নামল। বরিশালের পটুয়াখালিতে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের নেতা সতীন সেন এক সত্যাগ্রহ আরম্ভ করলেন। এতে সত্যাগ্রহীরা মুসলমানদের মসজিদের সামনে দিয়ে নামাজের সময়ে বাজনা বাজিয়ে শোভাযাত্রা করে যেতেন এবং মসজিদের সামনে বাজনা বাজানো নিষিদ্ধ থাকায় সেই আইন অমান্য করে কারাবরণ করতেন। এই সত্যাগ্রহের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল চিত্তরঞ্জনের হিন্দু-মুসলিম চুক্তির মসজিদের সামনে বাজনা-না-বাজানোর অন্যতম শর্তকে লঙ্ঘন করা। প্রচার পুস্তিকায় বলা হয়েছিলল, – বাংলার গ্রামে গ্রামে মুসলমান গুণ্ডারা হিন্দু নারী ধর্ষণ ও হিন্দু মন্দির অপবিত্র করে চলেছে। সেইটি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যেই আমাদের এই সত্যাগ্রহ। পটুয়াখালির এই সত্যাগ্রহ সে সময়ে শিক্ষিত হিন্দুদের মধ্যে প্রবল আলোড়ন জাগিয়েছিল। সারা ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে সত্যাগ্রহীরা এসে পটুয়াখালিতে সত্যাগ্রহ করতেন।

বাঙলায় কংগ্রেসের যে দু’-একজন নেতা যেমন বীরেন্দ্রনাথ শাসমল এই চুক্তির স্বপক্ষে ওকালতি করলেন, তাঁরা হিন্দু শিক্ষিত সমাজের অপ্রিয় হয়ে উঠলেন। তাঁর নিজের প্রিয় অনুচরদের প্রচণ্ড বিরোধিতায় চিত্তরঞ্জন খুব বিব্রত হলেন এবং শেষে অসুস্থ হয়ে পড়ে অকস্মাৎ পরলোকগমন করলেন। তাঁর মৃত্যুর পর বাংলার কংগ্রেস নেতারা চিত্তরঞ্জনের বেঙ্গল প্যাক্ট বাতিল করে দিলেন।

১৯২৬-সালে বাংলার বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে কোলকাতা শহরে দাঙ্গা হয়েছিল মূলত এই বেঙ্গল প্যাক্টের বিরোধিতা করে। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা যে কোন মূল্যে বেঙ্গল প্যাক্ট বাতিল করতে দৃড়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। ১৯২৬-সালে মতিলাল নেহরু এক চিঠিতে জওহরলালকে লিখেছিলেনঃ “বাংলার বিপ্লবীরা দুর্ভাগ্যবশতঃ প্রচন্ডভাবে সাম্প্রদয়িক মনোবৃত্তিসম্পন্ন।”


সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ

এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকারের মনে ভিতির উদয় হয়। তারা মনে করে মুসলমানদেরকে কিছুটা সন্তুষ্ট করতে না পারলে আবার একটা ওয়াহাবি আন্দোলন বা সিপাহি বিদ্রোহের মত পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে।  ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ সরকার সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ ঘোষনা করে। এই রোয়েদাদে আইন প্রণেতাগণকে মুসলমান, অনুন্নত সম্প্রদায়, শিখ, ইউরোপীয় এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ‘সাধারণ’ জনগণসহ জমিদার, শ্রমিক, মহিলা ও সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিভিন্ন সম্প্রদায়’ ও স্বার্থের মধ্যে বিভক্ত করা হয়। 

সংখ্যা নয়, সরকারের কাছে কোন গ্রুপের গুরুত্ব কতটা, সেই অনুযায়ী আসন বণ্টন করা হয়। বাঙলায় প্রস্তাবিত আইন সভার ২৫০টি আসনের মধ্যে ইউরোপীয় গ্রুপকে দেওয়া হয় মোট আসনের শতকরা দশ ভাগ আসন অর্থাৎ ২৫টি আসন; অথচ বাঙলায় তাদের জনসংখ্যার অনুপাত ছিল শতকরা এক ভাগেরও কম। তদুপরি আইন সভার নির্বাচন ছিল ‘পৃথক প্রতিনিধিত্বমূলক’; মুসলমানেরা নির্বাচিত করবে মুসলমানদের, হিন্দুরা নির্বাচিত করবে হিন্দুদের এবং ইউরোপীয়রা নির্বাচিত করবে ইউরোপীয়দের। 

সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ ঘোষনা হওয়ার আগে ‘বেঙ্গল কাউন্সিলে’ হিন্দুরা জনসংখ্যার অনুপাতে শতকরা মাত্র ৪৪ ভাগ হলেও আসন পেত ৪৬টি, আর মুসলমানেরা জনসংখ্যার শতকরা ৫৪ ভাগ হলেও আসন পেত মাত্র ৩৯টি। এই সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ আইন সভায় বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকদের দুর্বল সংখ্যালঘিষ্ঠে পরিণত করল, অপর দিকে বাঙলার আইন সভার ইতিহাসে এই প্রথম বারের মতো হিন্দুদের চেয়ে মুসলমানেরা আনুপাতিক হারে বেশ শক্তিশালী অবস্থায় এল।

সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ ঘোষনা হওয়ার ফলে কলকাতার হিন্দু ভদ্রলোকদের মর্যাদার যে ভিত দীর্ঘদিন ধরে অক্ষুণ্ণ ছিল তা দৃশ্যত ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে। একদিকে জমিদারি সুবিধার ওপর প্রবল চাপ এবং অন্য দিকে বিভিন্ন সরকারি এ বেসরকারি চাকরি ও পেশায় শিক্ষিত মুসলমানদের অংশগ্রহণ হিন্দু ভদ্রলোক প্রভাবের মূলে কুঠারাঘাত হানে। 

রোয়েদাদ ঘোষণা পূর্ব পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে, লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে, কোলকাতা কর্পোরেশনে, সারা বাঙলায় স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে হিন্দু ভদ্রলোকেরা সর্বত্র নিজেদের প্রাধান্য বিস্তার করে থাকত। এখন সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ ঘোষণার পর বাঙালি হিন্দু সমাজের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ধ্বংস হয়ে গেল।

এই আঘাতের কারণে হিন্দু ভদ্রলোকদের প্রতিক্রিয়া যে চরম হবে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু ছিল না। কিন্তু যে প্রতিক্রিয়াটা তারা দেখালো তা ছিল খুবই বিস্ময়কর। সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ ঘোষনা করেছিল ব্রিটিশ সরকার, কিন্তু তারা ব্রিটিশ নীতির বিরুদ্ধে কোন সমালোচনা বা আন্দোলন সংগঠিত করলো না। সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে, বা অন্যান্য পত্র-পত্রীকাতে, জনসভায় বক্তৃতার মাধ্যমে ঐ রোয়েদাদ প্রত্যাখ্যান করার কথা খুব একটা শোনা গেল না। এমনকি আইন সভায় ইউরোপীয়দের বেশি গুরুত্ব দেওয়া বা গভর্নরের বিবেচনামূলক ক্ষমতা নিয়ে তাদেরকে বিক্ষোভ করতেও দেখা গেল না।  সম্ভবত ভদ্রলোকেরা নিজেদের সরকারি চাকরি বাঁচাবার জন্য এবং সংবাদপত্রগুলি সরকারের রোষ থেকে বাঁচার জন্য  ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনার ক্ষেত্রে বিস্ময়করভাবে নীরব ছিল।

এর পরিবর্তে, তারা বাঙালি মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোৎগার করতে থাকে। সংবাদপত্র সম্পাদকীয়তে, পত্র-পত্রিকায়, জনসভায় আবেগঘন জ্বালাময়ী ভাষনের মাধ্যমে বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানকে দুটি পৃথক জাতি হিসাবে উত্থাপন করা হয়, এবং বাঙালি মুসলমান সমাজকে একটি অনুন্নত ও ঘৃণাযোগ্য সম্প্রদায় হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। মধ্যযুগের মুসলিম শাসকদের যাবতীয় অবদানকে অস্বীকার করে ব্রিটিশ শাসনকে ‘মুসলিম শাসনে’র চেয়ে কম ক্ষতিকর বলে গণ্য করা হয়। ব্রিটিশ শাসনকে গণ্য করা হল ‘বাঙালি হিন্দুদের প্রতিভা’ বিকাশের অনুকূল পরিবেশ হিসেবে, বলা হল মুসলমানদের অত্যাচার ও স্বেচ্ছাচারী ‘অন্ধকার’ থেকে ব্রিটিশরা বাঙালি হিন্দুদের মুক্ত করেছে।

রোয়েদাদ সম্পর্কে মুসলমান রাজনীতিকদের প্রতিক্রিয়া হিন্দু নেতৃবৃন্দের মতো অতটা স্পষ্ট ছিল না। চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যু ও হিন্দু-মুসলিম চুক্তি বাতিল হওয়ার পর অনেক মুসলমান নেতা ও কর্মী কংগ্রেস ত্যাগ করে। পুরানো খেলাফত কমিটি তখন সক্রিয় ছিল না; মুসলমানদের রাজনৈতিক মত প্রচার করার জন্য কোনো বিকল্প ফোরাম ও তখন গঠিত হয়নি। বাঙালি মুসলমানের পক্ষে কথা বলার জন্য কোনো একক মুসলমান নেতার কর্তৃত্ব বা সামাজিক প্রতিষ্ঠাও ছিল না। ফলে বাঙালি মুসলমান রাজনীতিকদের কাছ থেকে রোয়েদাদ সম্পর্কে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আসে। প্রত্যেকে লক্ষ করে যে, মুসলমান ‘সম্প্রদায়ে’র জন্য ঐ রোয়েদাদে সুস্পষ্ট সুবিধা রয়েছে। তবে কিছু নেতা সম্প্রদায়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করায় দুঃখ প্রকাশ করে। কারণ তারা লক্ষ করে যে, মুসলমান স্বার্থে প্রভাবিত হলেও সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে ঐক্যের সম্ভাবনাকে রোয়েদাদে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। সম্প্রদায় ভিত্তিতে আইন সভাকে বিভক্ত করায় তারা রোয়েদাদের সমালোচনা করে। 

কিন্তু বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকদের ক্রমাগত মুসলমান বিরোধী প্রচারের প্রতিক্রিয়ায় ক্রমে ক্রমে রোয়েদাদের সমর্থনে মুসলমান নেতৃত্বও ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। ব্যারিস্টার ফজলুল হক প্রথমদিকে রোয়েদাদের নিন্দা করলেও পরবর্তীকালে তিনি পরিস্থিতিজনিত সমস্যাকে স্বীকার করেও এই রোয়েদাদ সমর্থন করেন।  

পরবর্তী কয়েক বছরে রোয়েদাদের বিরুদ্ধে বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকদের বিরোধিতা ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। পলাশির যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশ শক্তির সহায়তায় সুদীর্ঘ প্রায় ৬০০ বছরের যে মুসলমান শাসনের অবসান ঘটানো হয়েছিল, সম্প্রদায়গত রোয়েদাদের মাধ্যমে পুনরায় সেই মুসলমান শাসনে’র সম্ভাবনার ভুত ভদ্রলোকদের তাড়াকরে বেড়াতে লাগল। এর ফলে রোয়েদাদের পক্ষে মুসলমানদের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি আরও সুদৃঢ় হয়ে ওঠে। এভাবে রোয়েদাদ হয়ে পড়ে বিভক্তি ও বিবাদের কেন্দ্রবিন্দু এবং তা হিন্দু ও মুসলমান রাজনীতিকদের বিভেদের মধ্যে একটা ‘গোঁজ’ হিসেবে কাজ করে। ঐ রোয়েদাদ বাঙলার রাজনীতিকে ক্রমবর্ধমানভাবে দুই পৃথক সম্প্রদায়গত গ্রুপে বিভক্ত করে দেয় ঐ দুই গ্রুপ ছিল একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী।


পুনা চুক্তি

রোয়েদাদ নিয়ে উগ্র উন্মাদনা চলার সময় ঐ বিতর্কে আর একটা নতুন মাত্রা যোগ হয়, তা হল পুনা চুক্তি স্বাক্ষর। নিম্নবর্ণের হিন্দুরা মনে করতো যে ব্রিটিশ সরকারের সাহায্য ছাড়া তারা তাদের মর্যাদা ফিরে পাবে না, তাই তারা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখে।  ১৯২৭ সালে ২৮ এবং ২৯শে ডিসেম্বর ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত নমঃশূদ্র সম্মেলনে ইংরাজ সম্রাটের প্রতি নমঃশূদ্রদের আনুগত্য ঘোষণার প্রস্তাব পাস করা হয়।  ১৯২৮ সালে অনুষ্ঠিত অল-বেঙ্গল নমঃশূদ্র সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে রায় সাহেব রেবতীমোহন সরকার (লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য) গুরুত্ব আরোপ করে বলেন যে, ‘ব্রিটিশ সরকার ছাড়া তাঁর সম্প্রদায় (নমঃশূদ্র) তাদের মর্যাদা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেত না এবং এ জন্য বর্তমান রাজনৈতিক আন্দোলনে (সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে) তাঁর সম্প্রদায়ের যোগ দেওয়া উচিত নয়, কারণ তা হবে তাদের জন্য আত্মঘাতী।’ 

গান্ধী এই মত পোষণ করতেন যে, অস্পৃশ্যতা হল ধর্মীয় বিষয় – রাজনৈতিক নয়। ধর্মীয় সংস্কারের মাধ্যমে হিন্দু সমাজই কেবল এ সমস্যার সমাধান করতে পারে। মাহার (Mahar) নেতা বি. আর. আম্বেদকার বলেন যে ক্ষমতা যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের কাছে হস্তান্তরিত হতে যাচ্ছে সেহেতু তাদের কিছুটা হলেও রাজনৈতিক রক্ষাকবচ থাকতে হবে মুসলমান ও অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য যেসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে তার চেয়ে উত্তম না হলেও কিছুটা সুবিধা দিতে হবে। 

গান্ধীর আপত্তি  উপেক্ষা করে তফশিলি সম্প্রদায়ের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচকমণ্ডলীর বিধান রোয়েদাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।  গান্ধী রোয়েদাদের এই বিষয়টির বিরুদ্ধে ‘আমরণ অনশন’ শুরু করেন। গান্ধীর জেদাজেদির ফলে তফশিলি সম্প্রদায়ের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচকমণ্ডলী সৃষ্টি করা গেল না,  পরিবর্তে তফশিলি সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের জন্য হিন্দু আসনের কিছু অংশ সংরক্ষণ করা হোল। এবং বাঙলায় মোট আশিটি হিন্দু আসনের মধ্যে ত্রিশটি আসন তফশিলি সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত হল।

ঐ চুক্তির ফলে বাঙলায় বর্ণ হিন্দুদের আনুপাতিক আসন সংখ্যা অনেক কমে আসে। প্রস্তাবিত আইন সভায় তাদের আসন সংখ্যা শতকরা প্রায় ৩২ ভাগ থেকে কমে ঠিক মাত্র ২০ ভাগ হয়। ভদ্রলোক হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া অবিশ্বাস, উত্তেজনা ও ক্রোধে পরিণত হয়। ভদ্রলোক হিন্দুদের কাছে সম্প্রদায়গত রোয়েদাদের চেয়ে ঐ চুক্তি বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা দেয়।


 হিন্দু-মুসলমান বিরোধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা

বঙ্গের আইনসভায় উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য ১৯৩১ সালে হিন্দু মহাসভা উপজাতীয়দের উচ্চ শ্রেণীর হিন্দু নাম গ্রহণের এবং পরবর্তী আদমশুমারিতে ‘ক্ষত্রিয়’ হিসেবে নাম তালিকাভুক্তির জন্য প্রচার পুস্তিকার মাধ্যমে আহ্বান জানায়। মুঙ্গেরে এক জনসভায় সাভারকার পাঁচটি সাঁওতাল ছেলেকে হিন্দু সম্প্রদায়ে গ্রহণ করে নেন।

১৯৩৯ সালের জানুয়ারি মাসে বঙ্গীয় হিন্দু সংহতি প্রতিষ্ঠিত হয়, ঐ বছরের মার্চ মাসে এই সংগঠনের লোকেরা কোলকাতায় বলেন যে, “আদিবাসী গোষ্ঠীর লোকদের হিন্দু হিসেবে পরিচিতির প্রয়োজন আছে” । 

এসবই ছিল মুলত হিন্দুদের সংখ্যা বাড়িয়ে বঙ্গের আইন সভায় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশবিশেষ। 

১৯৪১ সালের আদমশুমারির কাজ চলার সময় সারা বাংলা প্রদেশ থেকে খবর পাওয়া যায় যে, ‘তফশিলি সম্প্রদায়ের লোকদের শুধু হিন্দু হিসেবে তালিকাভুক্তির চেষ্টা করা হচ্ছে’, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ চেষ্টার সময় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ হয়েছে। রাজশাহীতে বিক্ষোভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে সাঁওতালদের নিয়ে। সাঁওতালদের হিন্দু হিসেবে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ প্রায় সব স্থানেই নেওয়া হয়। যেসব জেলায় সাঁওতালদের সংখ্যা অধিক সেসব জেলায় সাঁওতালদের হিন্দু হিসেবে ঘোষণা দিয়ে হিন্দুদের সংখ্যা যত বেশি সম্ভব বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। 

এর পাল্টা হিসেবে স্থানীয় মুসলিম লীগের লোকেরা সাঁওতালদের মধ্যে কাজ করে এবং তাদের আদিবাসী হিসেবে নিজেদের রেকর্ড করাতে উৎসাহিত করে। 

ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে নিম্ন শ্রেণীর লোকদের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আনার এসব আন্দোলন তাদেরকে বাহ্যিকভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রতি আরো বেশি করে আকৃষ্ট করে। ১৯৩২ সালে জিতু সান্যাল ও তার অনুসারী একদল সাঁওতাল পরিত্যক্ত ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদে আক্রমণ চালায় এবং ধ্বংসাবশেষের ওপর ‘অশাস্ত্রসম্মতভাবে’ কালী উপাসনার ব্যবস্থা করে। এ সময় পুলিশের গুলিতে জিতু নিহত হয়। 

চল্লিশের দশকের প্রথম দিকে নিম্ন শ্রেণীর লোকদের হিন্দু রাজনীতিতে আনার প্রয়াস যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন নিম্ন শ্রেণীর লোক ও মুসলমানদের মধ্যে অনেক আক্রমণ পাল্টা আক্রমণের ঘটনা ঘটে। ১৯৪১ সালের প্রথম দিকে ‘রাজশাহীতে একটা মসজিদের সামনে গানবাদ্যসহ একটা সরস্বতী পূজা মিছিল অতিক্রম করার সময় স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা দেখা দেয়’। বসন্তকালে সরস্বতী পূজা হল মূলত বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকদের পূজা। কিন্তু এবার ‘প্রায় দু’হাজার সাঁওতাল তীর-ধনুক বা লাঠি নিয়ে সরস্বতী পুজার মিছিলে যোগ দেওয়ায় বাড়তি উত্তেজনা দেখা দেয়’। পূজায় সাঁওতালদের এভাবে অংশগ্রহণে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ভদ্রলোক হিন্দুরা তাদের ইচ্ছানুযায়ী হিন্দু ‘সংস্কৃতি’ সাঁওতালদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া অবলম্বন করেছে এবং সাম্প্রদায়িক বিবাদে সাঁওতালদের ব্যবহার করছে। 

দুই মাস পর বার্নপুরের কাছে নরসিংহবাদে একটা বড় ধরনের সংঘর্ষ অতি অল্পের জন্য এড়ানো যায়। গোয়ালা শ্রেণীর সদস্যরা আসানসোল থেকে বার্নপুর গো-মাংসের বাজারে গো-মাংস বহন করে নিয়ে যাওয়ায় মুসলমানদের বাধা দিতে শুরু করে, অথচ এই গোয়ালারাই জবাই করার জন্য় মুসলমানদের কাছে গরু বিক্রি করে থাকে এবং দীর্ঘদিন ধরে তারা এটা করে আসছে। 

১৯৪৫ সালের জানুয়ারি মাসে দিনাজপুর জেলার লালবাগ এলাকায় নামাজের সময় স্থানীয় মসজিদের পাশ দিয়ে সাঁওতালদের নেতৃত্বে কালী পূজা উপলক্ষে মিছিল অতিক্রম করাকে কেন্দ্র করে’ মুসলমান ও সাঁওতালদের মধ্যে একটা গোলমালের আশংকা দেখা দেয়; ঐ একই বছর যশোরের লোহাগড়া থানা এলাকায় মিঠাপুর বাজারে নমঃশূদ্র ও মুসলমানেরা পরস্পরের বিরুদ্ধে মারাত্মক সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়।

হাটবারের দিন নামাজ পড়ার সময় মসজিদের সামনে দিয়ে একটা মূর্তি নিয়ে যাওয়ার সময় বেশ কিছু নমঃশূদ্র গান গাচ্ছিল এবং নাচছিল। মসজিদে অবস্থানরত মুসলমানেরা তাদেরকে চলে যেতে বলে এবং তারা চলে যায়। পরদিন প্রায় চার হাজার নমঃশূদ্র ঢাল-সড়কি নিয়ে আসে এবং মসজিদের সামনে পুনরায় নাচতে ও গাইতে থাকে এবং কোনরকম বাধা ছাড়াই তারা চলে যায়, কারণ মুসলমানেরা প্রস্তুত ছিল না। 

এ ঘটনার পর মুসলমানেরা আশপাশের গ্রামের মুসলমানদের সংগঠিত করে এবং নমঃশূদ্রেরা আবার আসলে দলবদ্ধভাবে তাদের আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে। 

এই সময় নিম্ন শ্রেণীর লোকেরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ক্রমবর্ধমানভাবে ভূমিকা নিতে থাকে। মিঠাপুর বাজারের ঘটনা এ ধরনের একটা দৃষ্টান্ত। সেখানে যে নমঃশূদ্ররা মিছিল করে মসজিদ অতিক্রম করেছিল, তারা বেশ জোরেসোরে নিজেদের নতুন ‘হিন্দু’ পরিচিতির কথা তুলে ধরে। যশোর জেলার নড়াইল মহকুমার জালশিতে একই ধরনের অন্য একটি ঘটনা ঘটে – কিছু অজ্ঞাত লোক কর্তৃক ‘কালী’ দেবীর মূর্তি সরিয়ে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নমঃশূদ্র ও মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়’। 

বর্ধমান বিভাগের কুলটিতে মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়া একটি হিন্দু মহাবীর ঝাণ্ডা মিছিলকে মুসলমান জনতা প্রতিহত করলে দাঙ্গা বাধে। দাঙ্গা থামাতে পুলিশ গুলি চালালে চার জন নিহত হয়। নিহত এই চার জন ছিল তফশিলি সম্প্রদায়ের। 

১৯৪১ সালে ঢাকায় সংঘটিত দাঙ্গার জের ধরে খুলনায় নমঃশূদ্র ও মুসলমানদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ বাধে। এ ঘটনায় ‘অনেক লোক হতাহত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয় – একটা নমঃশূদ্র হিন্দু গ্রাম ও একটা মুসলমান গ্রাম পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়’। 

ঢাকা শহরের হিন্দু দাঙ্গাকারীদের মধ্যে গোয়ালারা ছিল খুব সংঘবদ্ধ । পাঁচ বছর পর নোয়াখালীতে বাঙলার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রক্তাক্ত ইতিহাসের জঘন্য হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। হতভাগ্যদের মধ্যে অনেকেই ছিল নমঃশূদ্র; নিহতদের মধ্যে রামগঞ্জ থানার চণ্ডীপুরের একশ একটি ‘দরিদ্র নমঃশূদ্র পরিবারও ছিল’। 

দেশ-বিভাগের সময়কার দাঙ্গায় মেদিনীপুরের সাঁওতালদের ব্যাপকভাবে জড়িত থাকতে দেখা যায়। ১৯৪৭ সালে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এস. রহমতুল্লাহ এ সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা এভাবে বর্ণনা করেন: “স্থানীয় হিন্দুদের উত্তেজিত করার জন্য কোলকাতা থেকে গোলযোগকারীরা আসে, তারা ছিল ধনাঢ্য লোক এবং তারা ছিল বড় বড় ট্রাক-মালিক। তারা যুদ্ধংদেহী সাঁওতালদের ভাড়া করে, তারা (সাঁওতালরা) তীরের অগ্রভাগে আগুনের সলতে জ্বালিয়ে মুসলমানদের কুঁড়েঘরে নিক্ষেপ করে এবং মানুষজনকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারে।  আমি এক উন্মত্ত সাঁওতাল জনতার মুখোমুখি হই, তাদের কাছে ছিল বড় ধনুক, তীর ও বর্শা – তারা ঢাক পিটাচ্ছিল, রণনৃত্য করছিল ও রণহুংকার দিচ্ছিল … জীপ বা গাড়িতে করে যাওয়ার সময় কয়েক বার আমরা লক্ষ করি যে, খড়গপুর যাওয়ার রাস্তার ধারের মুসলমান গ্রামগুলোর বাড়ি বাড়ি আগুন লাগাবার জন্য সাঁওতালরা প্রজ্বলিত তীর ছুঁড়ছে। সাঁওতালদের নিবৃত্ত করার জন্য আমার ব্যক্তিগত ৩১৫ মাউসের ম্যাগনাম (315 Mauser magnum) ব্যবহার করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

চল্লিশ দশকের মধ্য ভাগ থেকে হিন্দু ধর্মযোদ্ধাদের অগ্রবর্তী দল হিসেবে নিম্ন শ্রেণীর লোক এবং আদিবাসীদের মোতায়েন করা হয়। শুদ্ধি অভিযান ও সংগঠন নিম্ন শ্রেণীর লোক ও উপজাতীয়দের ওপর বিশেষ কার্যকর প্রভাব বিস্তার করে বলে প্রতীয়মান হয়। পূর্বাঞ্চলের নমঃশূদ্র ও উত্তরাঞ্চলের রাজবংশী ও সাঁওতালেরা নিজ উদ্যোগেই গত কয়েক দশক ধরে উচ্চতর ধর্মীয় মর্যাদার দাবি জানিয়ে আসছিল। জিতু সান্যালের মতো দরিদ্র লোকেরা ক্রমেই বেশি বেশি করে ‘হিন্দু সম্প্রদায়ের’ হয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, যাদেরকে তারা সদস্য করে নিয়েছিল। মূলত জিতু সান্যালের মতো লোকেরাই নিহতদের তালিকার শিরোনামে ছিল।


ভদ্রলোকদের হতাশা

সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ ঘোষণার পর স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। উদীয়মান মুসলিম গ্রুপগুলো হিন্দু ভদ্রলোক কর্তৃত্বকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ করতে থাকে। পূর্ব বাঙলার মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোর স্থানীয় ও জেলা বোর্ডে মুসলমান প্রতিনিধিত্বের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমনকি পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে হিন্দুরা সংখ্যায় বেশি থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সরকারি প্রতিষ্ঠানে মুসলিম প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। 

স্থানীয় প্রতিষ্ঠান তথা ইউনিয়ন, স্থানীয় ও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড এবং পৌরসভায় আগে সাধারণত হিন্দু ভদ্রলোকেরাই ক্ষমতায় ছিল, তারা এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়। প্রায় ক্ষেত্রেই এর ফল দাঁড়ায় সাম্প্রদায়িক বিরোধ, এবং অনেক সময় তা সংঘর্ষে পরিণত হয়। 

স্কুল বোর্ডগুলোতেও একই ধারা পরিলক্ষিত হয় – অতীতে এসব বোর্ড ভদ্রলোকদের কুক্ষিগত ছিল। এমনকি ভদ্রলোকদের চিরাচরিত ঘাঁটি ঢাকাতেও হিন্দুরা তাদের হাত থেকে পৌরসভা ও স্কুলের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়া রোধ করতে ব্যর্থ হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো ভদ্রলোক হিন্দুদের জন্য সত্যি অসহনীয় ছিল, কারণ তারা নিজেদেরকে বাঙলার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অভিভাবক হিসেবে গণ্য করত।

হিন্দুপ্রধান যেসব এলাকায় হিন্দুদের কর্তৃত্ব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছিল, সেসব এলাকায় বিরোধ বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৩৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এ সময় কালনা মহকুমার দেয়ারা শহরের মুসলমানেরা একটা গরু কুরবানি করে ঈদ উৎসব পালন করে। দেয়ারা শহরে আগে কখনো কুরবানি করা হয়নি। এ ঘটনায় কালনার হিন্দুরা উত্তেজিত হয় এবং এটাকে তারা মুসলমান সম্প্রদায়ের উসকানিমূলক কাজ বলে মনে করে। বর্ধমান শহরের হিন্দুরা এর প্রতিশোধ গ্রহণ করে তারা জোরপূর্বক মুসলমানদের গরু কুরবানি থেকে বিরত রাখে, যদিও বর্ধমানের মুসলমানেরা বকরা ঈদের সময় ঐহিত্যগতভাবে প্রতি বছর গরু কুরবানি দিয়ে আসছিল। এই ঘটনার পর একটা হিংসাত্মক সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হলেও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চাপা ক্ষোভ কিন্তু বিরাজ করতেই থাকে। 

পরের বছরে দুর্গা পূজার প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানের সময় মসজিদের সামনে বাজনা বাজানোকে কেন্দ্র করে বর্ধমান শহরে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।  সন্ধ্যা ৮টা ৪০ মিনিটের সময় বড় বাজার এলাকার মসজিদের সামনে মিছিল উপস্থিত হয়। এই মিছিলে বাঁশি ও ঢোল বাজানো হচ্ছিল। এ সময় মসজিদের মধ্যে মুসলমানেরা নামাজ পড়ছিল। তারা এটা দেখে রাগান্বিত হয় এবং উভয় পক্ষই সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ সংবাদ খুব দ্রুত বেড়িখানা মসজিদে গিয়ে পৌঁছায়। সেখান থেকে একদল মুসলমান লাঠি নিয়ে ছুটে আসে এবং ঐ পথ দিয়ে প্রতিমা নিয়ে যেতে দিতে বাধা দেয়। উভয় পক্ষে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয় – মুসলমানেরা দৃঢ়তার সাথে জানায় যে, মসজিদের সামনে কোনো সময় বাজনা বাজানো যাবে না। হিন্দু মিছিলকারীরা রাস্তার পাশে মূর্তি ফেলে রেখে অত্যন্ত রেগেমেগে ঐ স্থান ত্যাগ করে। স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট এই ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেন। মুসলমানেরা শেষ পর্যন্ত রাত দশটার পর মসজিদের সামনে বাজনা বাজানোর অনুমতি দিতে সম্মত হয়। অতঃপর অতি দেরিতে গভীর রাতে মিছিলকারীরা ঐ পথ দিয়ে মিছিল করে চলে যায়। 

একই ধরনের ঘটনা অন্যান্য হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোতেও ঘটে। ১৯৩৪ সালে ২৪ পরগণা জেলার কাকদ্বীপ থানায় মোল্লারচকে একটা বড় ধরনের বিরোধ বাধে। বর্ধমান জেলার মতো ২৪ পরগণা জেলাও ছিল অন্যদের জেলার চেয়ে অধিক নগরকেন্দ্রিক এবং এখানে প্রচুর শিক্ষিত হিন্দুর বাস ছিল।  কিন্তু স্থানীয় রাজনীতির ওপর শিক্ষিত হিন্দুদের প্রভাব প্রতি বছরই শিথিল হয়ে আসছিল। এমনকি বর্ধমান জেলার চেয়ে ২৪ পরগণা জেলায় স্থানীয় বোর্ডগুলোতে মুসলমান সদস্য সংখ্যা দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পায়। বশিরহাট ও বারাসাত মহকুমায় জনসংখ্যার আনুপাতিক হারের থেকে মুসলমান সদস্য ছিল অনেক বেশি। ১৯৩২ সাল নাগাদ মুসলমানেরা বারাসাত বোর্ডে হিন্দু সদস্যদের সাথে সমতা অর্জন করে, যদিও এটা ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা ।

১৯৩৩ সালে উত্তর কোলকাতার বেহালায় একটা বড় ধরনের কলহ সৃষ্টি হয়।  ঈদের সময় ‘কুরবানি করার জন্য একদল মুসলমান শাপোরের দিকে কিছু পশু নিয়ে যাচ্ছিল। বেশ কিছু হিন্দু ও শিখ এ সময় তাদের ওপর পূর্ব পরিকল্পিত আক্রমণ চালায়’। এতে দু’পক্ষের মধ্যে যে মারামারি হয় তাতে বহু লোক মারাত্মক আহত হয়। ১৯৩৪ সালে ডায়মন্ড হারবার মহকুমার কাকদ্বীপ থানার কাছে মোল্লারচরে এক দাঙ্গা সংঘটিত হয়। এখানে ‘মুসলমানেরা গরু কুরবানি করার ইচ্ছার কথা ঘোষণা করে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা তা বন্ধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে’। এর আগে এখানে কোনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা যায়নি। গরু কুরবানি করার ইচ্ছায় হিন্দুরা ক্রুদ্ধ হয়। গরু কুরবানিকে তারা হিন্দুপ্রধান এলাকাকে অপবিত্র করার নজিরবিহীন কাজ হিসেবে গণ্য করে। পার্শ্ববর্তী মেদিনীপুর জেলাতেও ১৯৩৫ সালে একই ধরনের ঘটনা ঘটে। খড়গপুরের বারহোলা থানায় সামান্য একটা ঘটনা থেকে বিরোধ ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, মুসলমানেরা গরু কুরবানি করার জন্য নতুন উদ্যোগ নিলে ‘হিন্দুদের অনুভূতিতে মারাত্মকভাবে আঘাত লাগে। বর্ধমান ও ২৪ পরগণা জেলার মতো মেদিনীপুরও ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা এবং ভদ্রলোক রাজনীতির প্রধান ঘাঁটি।

ফজলুল হক সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মকান্ডের জন্য বাংলা সরকার সাধারণ গরীব, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত হিন্দু-মুসলমান সকল সম্প্রদায়ের জনগণের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে যেমন – 

(১) বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধনী পাস এবং জমিদারদের লাগামহীন অত্যাচার বন্ধ করা (১৯৩৮), (২)  পাটচাষীদের নায্য মূল্য পাওয়ার লক্ষ্যে “পাট অধ্যাদেশ” জারি করা (১৯৩৮), (৩) দরিদ্র চাষীদের সুদখোর মহাজনের কবল থেকে রক্ষা করতে ‘চাষী খাতক আইন’-এর সংশোধনী এনে ঋণ সালিশি বোর্ডকে শক্তিশালী করা (১৯৩৯), (৩) আইন পরিষদে “মহাজনী আইন” পাশ করা (১৯৪০), (৪) ‘দোকান কর্মচারী আইন’ প্রণয়ন এবং দোকান শ্রমিকদের সপ্তাহে একদিন সবেতন ছুটি ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানের নির্দেশ জারি করা (১৯৪০), (৫) বঙ্গীয় আইন সভায় ‘প্রাথমিক শিক্ষা বিল’ পেশ করা এবং প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা – ইত্যাদি। 

হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোর হিন্দু ভদ্রলোকেরা আশা করেছিল যে, প্রাদেশিক পর্যায়ে তারা যে ক্ষমতা হারিয়েছে সেটা তারা স্থানীয় পর্যায়ে অধিকতর ভূমিকা রেখে পুষিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু তা অসম্ভব বলে প্রমাণিত হয়। এর পরিবর্তে তারা দেখতে পায়, সব ক্ষেত্রেই, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোতেও তারা মুসলমানদের কাছে হেরে যাচ্ছে।

১৯৪৬এর নির্বাচন মুসলিম লীগকে পুনরায় বাঙলায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনে। ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে সোহরাওয়ার্দী সরকার গঠন করে বাঙলার নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন।  কিন্তু মুসলিম শাসন সম্পর্কে অনেক বাঙালি হিন্দু তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে ভীতিতে ছিল তিনি সেই সব ভীতি দূর করতে পরবর্তী কয়েক মাসে প্রায় কোনো উদ্যোগ নিলেন না। তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য ১৩ থেকে কমিয়ে ১১ করলেন, আর হিন্দু মন্ত্রীর সংখ্যা কমিয়ে করলেন ৩ এবং তিন জন হিন্দু মন্ত্রীর দু’জনকে তফশিলি সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে গ্রহণ করলেন। 

এই সময় দিল্লিতে কংগ্রেস মুসলিম লীগকে বাদ দিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করার চেষ্টা করছিল। সোহরাওয়ার্দী কংগ্রেসকে এই বলে সতর্ক করে দেন যে: লীগকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে কংগ্রেসকে ক্ষমতায় বসানোর সম্ভাব্য পরিণতি হবে বাঙলার পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা ও সমান্তরাল একটা সরকার প্রতিষ্ঠা …. এ রকম কেন্দ্রীয় সরকার বাংলা থেকে যাতে কোনো রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পারে তা আমরা নিশ্চিত করব, আর আমরা নিজেদের পৃথক রাষ্ট্র মনে করব যার সাথে কেন্দ্রের কোনো সম্পর্ক নেই । তিনি বাঙলার পুরোপুরি স্বাধীনতা ঘোষণার হুমকি দেন।  

সোহরাওয়ার্দীর এ বিবৃতিতে হিন্দু সংবাদপত্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, তারা এর ব্যাখ্যা করে সমগ্র বাঙলাকে তখনই ‘পাকিস্তান বানাবার’ হুমকি হিসেবে। হিন্দু বাঙালিদের কাছে ‘পাকিস্তান’ আসার অর্থ হল চিরকালের জন্য রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারানো এবং তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ইচ্ছার অধীনে থাকা । 


কোলকাতা হত্যাযজ্ঞ (Great Calcutta Killing) 

এই প্রেক্ষাপটে কুখ্যাত কোলকাতা হত্যাযজ্ঞ (Great Calcutta Killing) সংঘটিত হয়। এই দাঙ্গায় কমপক্ষে পাঁচ হাজার লোক নিহত হয়। পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার পর দেখা যায়, উভয় পক্ষের কয়েক হাজার লোক নৃশংসভাবে নিহত হয়েছে। হত্যা শুরু হওয়ার দশ দিন পর এই ভয়ঙ্কর রাতের শহরের (city of dreadful night) ফুটপাতে তিন হাজারের বেশি মৃতদেহ পড়ে থাকে। মৃতদেহ পোড়ানোর জন্য শহরে যে ব্যবস্থা ছিল মৃতদেহের সংখ্যা তার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। ফলে মৃতদেহ সংগ্রহ ও তা গণকবরে স্তূপীকৃত করার জন্য সরকারকে নিম্ন শ্রেণীর ডোমদের জড়ো করতে হয়।

কোলকাতা হত্যাযজ্ঞ একটা আকস্মিক কোন ঘটনা ছিল না। সমগ্র বাংলাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান শাসনে যাওয়া থেকে প্রতিরোধ করতে হিন্দুরা আগে থেকে তৈরী হয়েই ছিল। ঐ লড়াইয়ে হিন্দুর চেয়ে অনেক বেশি মুসলমান নিহত হয়। প্যাটেল ঐ বীভৎস বিষয়টিকে এভাবে মূল্যায়ন করেন: “হিন্দুরা এতে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হয়েছে।”

মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টকে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। উপমহাদেশের মুসলমানগণ ওই দিন সকল কাজ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৬ আগষ্ট ভোরে উত্তেজনা শুরু হয় যখন লীগের স্বেচ্ছাসেবকেরা উত্তর কলকাতায় হিন্দু ব্যবসায়ীদের দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য করে এবং হিন্দুরা এর সমুচিত প্রতিশোধ হিসেবে লীগের শোভাযাত্রাসমূহের পথে বাধার সৃষ্টি করে। ওই দিন অক্টারলোনি মনুমেন্টে লীগের সমাবেশ এ যাবৎকালের মধ্যে মুসলমানদের সর্ববৃহৎ জমায়েত ছিল। এই ‘দিন’-টিকে সাফল্যমন্ডিত করতে লীগ তার সকল সম্মুখ প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তুত রেখেছিল। অন্যদিকে, মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা মার্কিন সৈন্যদের নিকট থেকে অস্ত্রশস্ত্র ও গোলা-বারুদ কিনে জমা করে রেখেছিল, যেগুলি পরে দাঙ্গার সময় ব্যবহার করা হয়। দাঙ্গা আরম্ভের বহু পূর্বে হিন্দুদের মালিকানাধীন ফ্যাক্টরিসমূহে এসিড বোমা তৈরি করা ও মজুদ রাখা হয়। বল্লম ও অন্যান্য অস্ত্রপাতি তৈরি করার জন্য কলকাতার হিন্দু কামারদের প্রস্তুত রাখা হয়।


গণহত্যার প্রস্তুতি

কোলকাতা হত্যাযজ্ঞের জন্য সাধারন ভাবে মুসলিম লিগকেই দায়ী করা হয়। কিন্তু দাঙ্গা ঘটানোর জন্য মুসলিম লীগের দীর্ঘকালিন কোন প্রস্তুতি ছিল বলে কোন প্রমান নেই। অপর দিকে হিন্দুমহাসভা ও তার সহযোগি দলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। 

জয়া চ্যাটার্জি তাঁর বইতে দেখিয়েছেন – 

“ত্রিশ দশকের শেষে এবং চল্লিশ দশকের প্রথম দিকে কোলকাতা ও মফস্বল শহরগুলোতে হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপের সংগঠন প্রতিষ্ঠার আধিক্য দেখা যায় গ্রুপের বিঘোষিত নীতি ছিল হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করা; কিন্তু তারা ভদ্রলোক যুবকদেরকে দৈহিক যোগ্যতা অর্জন করতে ও আধা-সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে উৎসাহ দিতে অধিকতর শক্তি ব্যয় করত। সম্ভবত এসব সংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে সুসংগঠিত সংগঠন ছিল ভারত সেবাশ্রম সংঘ। এটা ছিল হিন্দু মহাসভার স্বেচ্ছাসেবক শাখা। প্রকাশ্যে সমাজ সেবা সংগঠন হলেও শুরু থেকে এই সংঘ সামরিক কৌশল গ্রহণ করে এবং হিন্দুদের আত্মরক্ষার কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণের আহ্বান জানায়। 

১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত সংঘের এক সভায় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী সভাপতিত্ব করেন। এ সভায় ২,৬০০ লোক যোগদান করে বলে জানা যায়। সভায় বক্তারা সম্প্রদায়গত রোয়েদাদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, এর উদ্দেশ্য বাঙালি হিন্দুদের প্রতিহত করা। তাঁরা বলেন যে, সাবেক দণ্ডিত অপরাধী পুলিন দাস ও সতীন সেনের সাহায্য নিয়ে তাদের আখড়া তৈরি করে দৈহিক গঠনের প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিত যাতে হিন্দুরা আক্রান্ত হলে যেন এক হাজার লাঠি উত্তোলিত হয়। 

বাঙলায় লেখা পোস্টার ছাপানো হয় এর মধ্যে একটা পোস্টারের শিরোনাম ছিল ‘এখনই অহিংসার চেতনা ত্যাগ করো, প্রয়োজন হল পৌরুষ’, দু’মাস পর অনুষ্ঠিত সংঘের অন্য এক সভার প্যান্ডেলে প্রদর্শিত প্লাকার্ডে বাঙলায় লেখা ছিল: ‘হিন্দুরা জাগ্রত হও এবং অসুরদের হত্যার শপথ গ্রহণ করো।’ এর পরের বছর শিবের ধর্মীয় মূর্তিকে ব্যবহার করে একই মূলভাবকে প্রকাশ করা হয়। 

৭ তারিখে (এপ্রিল, ১৯৪০) সেবাশ্রম সংঘের উদ্যোগে মহেশ্বরী ভবনে একটা হিন্দু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দুদের সামরিক মানস গড়ে তোলার জন্য সেখানে বক্তৃতা করা হয়। ত্রিশূলসহ শিবের একটা বড় চিত্র প্রদর্শিত হয় স্বামী বিজনানন্দ বলেন যে, অসুরকে ধ্বংস করার জন্য হিন্দু দেব-দেবীরা সব সময় বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত থাকতেন। স্বামী আদিত্যনন্দ … মন্তব্য করেন যে, তিনি হিন্দুদের সেবা করার জন্য একটা লাঠি নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন যে, হিন্দুর শত্রুদের মুণ্ডচ্ছেদ করতে হবে। ত্রিশূলসহ শিবের চিত্রের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন যে, তাঁর অনুসারীদের অস্ত্র, কমপক্ষে লাঠি হাতে এগিয়ে আসতে হবে স্বামী প্রণবানন্দ পাঁচ লাখ লোকের একটা প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তুলতে চান। তিনি মাড়োয়ারিদের কাছে অর্থ সাহায্যের আবেদন জানান। হরনাম দাস প্রত্যেক হিন্দুকে সৈনিক হওয়ার আহ্বান জানান। পাঁচ লাখ হিন্দুর একটা প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তোলার সংঘের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এতে সন্তুষ্টির সাথে উল্লেখ করা হয় যে, ইতিমধ্যে বারো হাজার লোককে সংগ্রহ করা হয়েছে।

চল্লিশ দশকের প্রথম দিকে কোলকাতার হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপের সংখ্যা বেশ বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে মহাসভার অপর এক ‘সক্রিয়’ শাখা হিন্দু শক্তি সংঘ ছিল বেশ বড় ও সুগঠিত। এর পাঁচশ’র বেশি সদস্য শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন শাখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল এবং এদের আর্থিক অবস্থা ছিল ভালো। বড় বড় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে প্রায়শই বিপুল আর্থিক সাহায্য দেওয়া হত। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, ভারত সেবাশ্রম সংঘ মাড়োয়ারিদের সাহায্য পেত। সুসঙ্গ রাজ পরিবারের বাবু পরিমল সিংহ ছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের একজন অনুগত সমর্থক। বলা হয় যে, বাঙলায় এ সংঘের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ।

চল্লিশ দশকের সাম্প্রদায়িক আদর্শ এবং হিন্দু মহাসভা ও হিন্দুত্ববাদী কংগ্রেসের রাজনীতিতে কোলকাতার হিন্দু ভদ্রলোক যুবক শ্রেণীর ব্যাপক অংশকে সংগঠিত করতে এ ধরনের সংগঠন খুবই কার্যকর ছিল। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ তার তালিকাভুক্ত যুবকদের ‘শারীরিক প্রশিক্ষণ’ দিত, তার মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

যুদ্ধের পর সামরিক কাজ থেকে অব্যাহতি পাওয়া সৈনিক ও সামরিক কর্মচারীদেরকে হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলোর জন্য আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগহ করতে প্রলুব্ধ করা হয়। যুদ্ধের পর থেকে সামরিক বাহিনী থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত সৈনিকদের মাঝে মহাসভা খুবই সক্রিয় ছিল; তারা সৈনিকদের এবং ‘অব্যাহতিপ্রাপ্ত ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির লোকদের মহাসভার পতাকাতলে’ সংগঠিত করার চেষ্টা করে এবং সৈন্যবাহিনীর সাবেক কর্মচারীদের নিয়ে হিন্দু যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে’।

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর কাছে লিখিত পানাগড়ের একজন সাবেক হিন্দু সৈন্য অফিসার আবেগতাড়িত এক পত্রে ঘোষণা করেন: হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলায় আমাদের বিপজ্জনক শত্রু মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য আমরা বর্ধমান জেলার সৈন্যবাহিনীর সাবেক হিন্দু কর্মকর্তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি … আমরা প্রস্তুত আছি, আপনার নির্দেশ আমরা অনুসরণ করব। আমরা শপথ নিয়েছি এবং আমাদের আন্তরিক ইচ্ছা পূরণে আমরা বিরত হব না। আমরা অস্ত্রসজ্জিত এবং যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত … আমরা মনে করি যে, প্রতিশোধ গ্রহণের এই পদ্ধতিতে প্রদেশের বর্বর মুসলমানদের থামিয়ে দিতে পারব এবং এ থেকে তাদের বর্ণসংকর (halfcast) কুখ্যাত নেতা সোহরাওয়ার্দী ও নাজিমুদ্দিন প্রতিশোধ গ্রহণে হিন্দুদের সাহস সম্পর্কে অনুধাবন করতে পারবে। 

মুসলমানদের এইভাবে প্রাণপণে প্রতিহত করার পটভূমিতে ১৯৪৫-৪৬ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর তাই বিস্ময়ের কিছু নেই যে, কয়েক মাস পর হিন্দু স্বেচ্ছাসেবীরা কোলকাতায় তাদের শক্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত ছিল। 

বি. আর. মুনজে মহাসভার নির্বাচনী প্রচারণায় সর্ব প্রথম কামান দাগেন এই ঘোষণা করে: হিন্দু মহাসভা স্বাধীনতা চায়, কিন্তু তারা বিশ্বাস করে না যে অহিংস পথে তা অর্জন করা যাবে। এ জন্য তা পাশ্চাত্যের অতি আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারায় আক্রমণকে সংঘটিত করতে চায় … গৃহযুদ্ধের হুমকির (মুসলিম লীগের) মোকাবেলায় কংগ্রেস যদি মহাসভার শ্লোগান ‘অশ্বচালনা ও রাইফেল শুটিং-এ যুবকদের শিক্ষা দাও’ গ্রহণ করে তাহলে তা হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

বাঙলায় যখন গৃহযুদ্ধ সত্যি সত্যি আসন্ন হয়ে দাঁড়াল, তখন মহাসভা স্বেচ্ছাসেবীরা প্রস্তুত ছিল বাঁশের লাঠি, ছোরা ও দেশীয় পিস্তল নিয়ে নেতাদের পরামর্শ মতো কাজ করতে, তারা বাহিনীর মতো যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে ব্যগ্র ছিল।” 

“মুসলমান দাঙ্গাকারীদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিল পল্লি এলাকা থেকে শহরে আসা ভাসমান শ্রেণীর লোক। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার যে, বহু সংখ্যক ভদ্রলোক হিন্দুকে দাঙ্গার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। দাঙ্গায় জড়িত হিন্দু জনতার গঠন সম্পর্কে আলোচনাকালে সুরঞ্জন দাশ লক্ষ করেন: দাঙ্গার অভিযোগে বাঙালি হিন্দু ছাত্র ও অন্যান্য পেশাজীবী বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোক সক্রিয় ছিল। ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী সওদাগর, শিল্পী, দোকানদার গ্রেফতার হয়। মধ্য কোলকাতায় মুসলমানদের একটি সভা ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য অন্যদের সাথে ভদ্রলোকেরাও অংশগ্রহণ করে ঐ সভায় মুখ্যমন্ত্রী নিজে ভাষণ দেন । বিখ্যাত চক্ষু চিকিৎসক ড. জামাল মোহাম্মদকে হত্যাকারী জনতার মধ্যে একটা বড় অংশ ছিল ‘শিক্ষিত যুবক’। এটা বিস্ময়কর ছিল না যে, তাদের মধ্যে অনেকে পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলে। আরো বিস্ময়ের ব্যাপার যে, হত্যাযজ্ঞের পর অব্যাহতভাবে অসন্তোষের মধ্যে মুসলমান জনতার মাঝে বোমা নিক্ষেপের জন্য হিন্দুদের মধ্য থেকে গ্রেফতারকৃত একজন হিন্দু ছিল বর্ধমানের বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. মহেন্দ্রনাথ সরকার। তিনি স্বীকার করেন: ‘এখন আমি একজন কংগ্রেস নেতা। আগে আমি ছিলাম হিন্দু মহাসভার সদস্য। বাঙলা বিভাগের পক্ষে আমি এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছি। ‘ 

হিন্দুদের পক্ষে যোগ দেয় ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত সৈনিক ও মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা। ছাত্র, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী এবং দোকানদার ও পাড়ার ভাড়াটে গুণ্ডা মার্কা ছেলেদের অভাবিত ঐক্যের ফলে হিন্দু জনতার রক্তক্ষয়ী বিজয় হয় কোলকাতার রাস্তায়, ১৯৪৬ সালে। এটাই বাঙলা বিভাগ এবং একটা পৃথক হিন্দু আবাসভূমি গঠনের জন্য হিন্দু আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছে।” কিন্তু হিন্দুত্ববাদীদের এই জঘন্য কাজকে আজও স্বীকার করা হয় না। 


বাংলা ভাগের জন্য প্রচার অভিযান

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশের আর কোন ক্ষমতা অবশিষ্ট ছিল না ভারত শাসন করার। তারা নিজেদের গরজেই যত দ্রুত সম্ভব ক্ষমতা হস্তান্তর করে ভারত ছেড়ে পালাতে চাইছিল। এখন কত দ্রুত, কার কাছে এবং কী শর্তে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে, এটাই ছিল আলোচনার বিষয়। 

অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানরাই যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ, ব্রিটিশরা এদেশ থেকে চলে যাওয়ার পর গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের মাধ্যমে মুসলমানদেরই ক্ষমতা দখল করার সম্বাবনা বেশি, তাই এই পরিস্থিতিতে নিম্ন শ্রেণীর হিন্দু থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত মুসলমান শাসনের থেকে বাংলা বিভাগ অধিকতর পছন্দনীয়, – এই ধারণা পশ্চিম বাঙলার উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের মনে উদিত হয়।

যে বর্ণহিন্দু সম্প্রদায় ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিল, সর্বাত্মকভাবে-১৯৪৭ সালে তারাই হয়ে দাঁড়ালো বঙ্গভঙ্গের প্রধান সমর্থক। কারণ একটাই, ১৯০৫ সালে বাংলার রাজনীতিতে, শিক্ষায়, পেশায় এগিয়ে থাকা বর্ণ হিন্দুদের প্রাধান্য ছিল প্রশ্নাতীত। অখণ্ড বাংলায় তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি অক্ষুন্ন থাকার প্রতিশ্রুতিও ছিল নিশ্চিত। বঙ্গভঙ্গ হলে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তির এই ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল অপরিহার্য। 

কিন্তু ১৯৪৭ সালে অর্থাৎ ৪২ বছরের ব্যবধানে বাংলার রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠীর প্রাধান্য স্থাপিত হয়ে গেছে। বাংলা অবিভক্ত থাকলে সেখানে মুসলমানদের প্রাধান্যই বজায় থাকবে। হিন্দু প্রাধান্যের কোনোরকম সম্ভাবনাই নেই। অথচ বাংলাকে বিভক্ত করলে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হবে। কেবলমাত্র এই কারণেই হিন্দু নেতারা বঙ্গভঙ্গের দৃঢ় সমর্থক হয়ে পড়েন। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে অখণ্ড বাংলা যদি ভারতের মধ্যেও থাকে, তাহলে সেখানেও মুসলমানদেরই প্রাধান্য থাকবে। মন্ত্রিসভার প্রধান একজন মুসলমানই হবে। এ ব্যাপারটা হিন্দু নেতাদের পছন্দ হয় নি। 

১৯৪৭ সালের ২২শে মে হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ প্যাটেলের কাছে এক চিঠিতে লিখলেন ‘’ক্যাবিনেট মিশনে যেরকম বলা হয়েছে সেরকম একটা শিথিল কেন্দ্রীয় সরকার হলেও বাংলায় আমাদের নিরাপত্তা থাকবে না। পাকিস্তান হোক আর নাই হোক বর্তমান বাংলাকে ভেঙ্গে আমরা দুটি প্রদেশ গড়ার দাবি করছি।” 

আগের মাসে (৪ এপ্রিল ১৯৪৭) প্রাদেশিক হিন্দু কনফারেন্সের সভাপতির ভাষণে এম. সি. চ্যাটার্জি বললেন, “বাংলার হিন্দুদের একটা শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে অবশ্যই একটা পৃথক প্রদেশ গড়তে হবে। এটা বিভাজন নয়-হিন্দুদের জীবন-মরণের প্রশ্ন”। 

বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সদস্য বি. সি. সিনহা ১৯৪৭ সালের ৫ জুন প্যাটেলকে এক পত্রে লেখেন যে—“পুরো বাংলাও যদি ভারতে যোগ দেয় তাহলেও কম বেশি বর্তমানে যে অবস্থা আছে সেই অবস্থাই বজায় থাকবে এবং বাংলায় জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করার ধারণা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হবে। নিজেদের হাতে প্রশাসনের ভার না পেলে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না। অতএব ভারতে থাকতে চাইলেও বাংলাকে অখণ্ড রাখা যাবে না।” 

১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগের জন্য সাধারণত মুসলিম লীগ কে দায়ী করা হয়। কিন্তু বাংলা ভাগের জন্য কলকাতার ভদ্রলোকদের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস এবং সহযোগি হিন্দু মহাসভা সারা বাংলা জুড়ে ব্যাপক এবং সুপরিকল্পিত প্রচার অভিযান চালিয়ে ছিল। 

১৯৪৬ সালের মে মাসের ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব ছিল ভারতকে অখণ্ড রাখার সর্বশেষ প্রস্তাব। সেই প্রস্তাবে কনফেডারেশানের ভিত্তিতে উত্তর ভারতের মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্যগুলো নিয়ে একটি স্বায়ত্তশায়িত অঞ্চল, বাংলা ও আসাম নিয়ে একটি স্বায়ত্তশায়িত অঞ্চল এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চল নিয়ে আরেকটি স্বায়ত্তশায়িত অঞ্চলের প্রস্তাব ছিল। 

ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবে ভারতে একটি প্রকৃত যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব ছিল। বলা হয়েছিল দিল্লি কেন্দ্রিক কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেবলমাত্র মুদ্রানীতি, প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্র নীতির মত সর্বভারতীয় দায়িত্বগুলো থাকবে। অন্যান্য ক্ষমতা থাকবে রাজ্যগুলির হাতে। জিন্না এই প্রস্তাবে রাজি ছিলেন, কিন্তু কংগ্রেস এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। কংগ্রেস চেয়েছিল সর্বক্ষমতা সম্পন্ন একটি কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্যগুলি কেন্দ্রের প্রতি নির্ভরশীল ও মুখাপেক্ষি থাকবে। 

জিন্না বুঝেছিলেন এরকমটা হলে রাজ্যগুলির আর কোন স্বাধীনতা থাকবেনা। রাজ্যগুলিকে তাদের উন্নতির জন্য চিরকাল দিল্লির কৃপাপ্রার্থী হয়ে থাকতে হবে। তাই তিনি শেষ পর্যন্ত ভারত ভাগের পক্ষেই মতস্থির করে ফেলেন।

১৯৪৬ সালে দিল্লীতে ক্যাবিনেট মিশন ও ভারতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনার সময় জল্পনা-কল্পনা উত্তেজনার তুঙ্গে ওঠে। তখন কোলকাতা ও পশ্চিম বাঙলার প্রাণকেন্দ্রের ভদ্রলোক হিন্দুরা বাংলা বিভাগের পরিকল্পনাকে অনুকূল বলে মনে করে এবং এভাবে পশ্চিম বাঙলার হিন্দু প্রধান অঞ্চলগুলো নিয়ে একটা হিন্দু হোমল্যান্ড গড়ে তোলার কথা চিন্তা করে। মুসলমানদের ‘স্থায়ী শাসনের’ অধীন থাকার সম্ভাবনা অসহ্য মনে হওয়ায় পশ্চিম বাঙলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোর অধিক সংখ্যক হিন্দুদের কাছে এই সমাধান অনুকূল বলে বিবেচিত হয়। 

১৯৪৬ সালের শেষ কয়েক মাসে এবং ১৯৪৭ সালের প্রথম দিকে বাংলা ভাগের পক্ষে জোরদার প্রচার শুরু হয়।  কোলকাতা হত্যাযজ্ঞের পর হিন্দুরা ক্রমাগতভাবে উগ্র সাম্প্রদায়িক ঘৃণাপুর্ণ প্রচারণার শিকার হয়। “ভারতের হিন্দুদের ওপর আপতিত দুর্যোগের এই চরম দিনগুলোতে হিন্দুরা কি কাপুরুষের মতো তাদের গৃহের মধ্যে শান্ত হয়ে থাকবে, তারা কি শত্রুদের ধ্বংস এবং নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য এখনই সংগঠিত হবে না? বাঙলার হিন্দু যুবকেরা কি তাদের মা-বোনদের উৎপীড়নের প্রতিশোধ নেবে না? আজই তোমাদের আত্মোৎসর্গের শপথ নিতে হবে! প্রতিরোধ ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে!”

পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় – “কোলকাতার মতো শহরে কার্ফু দিয়ে আইন-শৃঙ্খলার নামে আজকাল কী হচ্ছে তা কি তোমরা জানো? তারা কোলকাতায় গোপন কসাইখানা বানিয়েছে। কার্ফু আইন ভঙ্গ করার জন্য পাঞ্জাবি পুলিশ তাদেরকে পুলিশের ট্রাকে করে নিয়ে যায় এবং তাদেরকে কসাইখানায় অবস্থানরত বা ঐসব কসাইখানার কোয়ার্টারে বাসরত খুনি দলের হাতে তুলে দেয়। অতঃপর গ্রেফতারকৃত ঐ লোকদের অধিকাংশদের কী হয় তা তোমরা জানো; তাদেরকে হত্যা করা হয়, তাদের দেহ কেটে টুকরো টুকরো করা হয় এবং কাঠের বাক্সে পুরে শহরের বাইরে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।”

১৬ই আগস্টের ঘটনা বিস্মৃত না হওয়ার জন্য হিন্দুদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রচারপত্রে বলা হয় : “এ কথা আমাদের সব সময় স্মরণ করা উচিত যে, ঐসব লোকের কথা আমাদের স্মৃতি থেকে মুছতে দেয়া যায় না। ঐ নৃশংসতা ঘটিয়েছে এমন সব লোক যারা মনে করে হিন্দুদের জমির ওপর মসজিদ তৈরি করা, হিন্দু মহিলার সতীত্ব হরণ করা, হিন্দু উপাসনালয় ধ্বংস ও অপবিত্র করা এবং হিন্দু রীতি ও ধর্মীয় কাজে হস্তক্ষেপ করা তাদের ধর্মীয় কর্তব্য। ১৬ই আগস্ট ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ পালনকালে তারা ধর্মীয় উন্মাদনায় মেতে ওঠে ও আমাদের প্রিয় মা ও বোনকে ধর্ষণ করার পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের যোনিপথ ও পায়ু ফেঁড়ে এক করে দেয় এবং মায়েদের স্তন বিকলাঙ্গ করে দেয়, যে স্তন থেকে দুধ পান করতে আমরা হিন্দুরা গর্ববোধ করি।” গোয়েন্দা শাখা এটাকে বর্ণনা করে ‘ঘৃণার স্তবগান’ (a hymn of hates) হিসেবে। ঐ পুস্তিকার শেষে হিন্দুদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, যারা বাংলা ভাগের বিরোধিতা করে তাদেরকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিতে।

বাংলা ভাগের আন্দোলন শুধু কোলকাতা শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যেসব জেলায় হিন্দুরা সংখ্যা গরিষ্ঠ হওয়া সত্তেও স্থানীয় ক্ষমতা মুসলমানদের হাতে চলে গিয়েছিল সেসব জেলায় বাংলা ভাগের আন্দোলন বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠে, এসব জেলা হল বর্ধমান, মেদিনীপুর, ২৪ পরগণা, হুগলী এবং অবশ্যই কোলকাতা। কিন্তু জেলায় বাংলা ভাগের এই আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। বরং এটা ছিল একদল লোকের সুপরিকল্পিত আন্দোলন। সবজায়গায় একই ছাপানো দাবিপত্র ব্যবহার করা হোত, তাতে স্বাক্ষর কারীর নাম, ঠিকানা ইত্যাদি লিখতে হোত। 

বাংলা ভাগের আন্দোলনে অনেকেই এককভাবে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে দায়ী করেন, কিন্তু এই সংঘবদ্ধ আন্দোলনে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে স্থানীয় কংগ্রেস গ্রুপগুলো ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল। বেঙ্গল কংগ্রেস  নেতারা এ সময় সিদ্ধান্ত নেন যে, দলের অভ্যন্তরে তাদের ক্ষমতাকে বাইরের রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তরিত করার জন্য বাংলা ভাগ করা হল একমাত্র পথ । এ লক্ষ্য অর্জনে তারা তাদের নতুন সুশৃঙ্খল বাহিনীকে কাজে লাগায়, যেখানে প্রয়োজন সেখানে মহাসভার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। চল্লিশের দশকে সদস্য সংগ্রহ ও নীতির ক্ষেত্রে কংগ্রেস ও মহাসভার মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না।  ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে হিন্দু মহাসভা একটা আসনেও জয়ী হতে পারেনি এবং একটা শক্তিহীন দল হয়ে পড়েছিল। চল্লিশের দশকের প্রথম দিকে মহাসভা পরিচালিত করত কংগ্রেসকে, এই ভূমিকা এখন বিপরীতমুখী হয়ে পড়ে। বাংলা ভাগের লক্ষ্যে উভয় দল একসাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে এবং কংগ্রেস ঐ আন্দোলন পরিচালনায় নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করে।

বাংলা ভাগের যৌথ আন্দোলনে কংগ্রেস স্পষ্টতই ছিল অধিকতর অগ্রণী অংশীদার। সারা বাঙলায় মহাসভা ছাড়াই কংগ্রেস স্বতন্ত্রভাবে বাঙলা ভাগের আহ্বান জানিয়ে জনসভার আয়োজন করে। কোলকাতার বালিগঞ্জে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন বাঙলার নেতৃস্থানীয় গান্ধীবাদী ড. প্রফুল্লচন্দ্র। 

বাঙলা ভাগের জন্য ৭৬টি জনসভার আয়োজন করা হয় বলে জানা যায় এর মধ্যে কংগ্রেস একাই কমপক্ষে ৫৯টি জনসভার আয়োজন করে। বারোটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয় মহাসভার উদ্যোগে, আর মাত্র পাঁচটি জনসভা হয় যৌথ উদ্যোগে। এই আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল বর্ধমান জেলা। কংগ্রেস কমিটিগুলো এ জেলায় বাঙলা বিভাগের পক্ষে শুধু কাটোয়া, কালনা ও আসানসোলের মতো শহরেই জনসভার আয়োজন করেনি, রায়ানের মতো ক্ষুদ্র গ্রামেও জনসভার আয়োজন করে। এই গ্রাম থেকেই স্বাক্ষর ও বুড়ো আঙুলের ছাপ দিয়ে একশ’টি দরখাস্ত প্রেরণ করা হয় । 

কোলকাতার হিন্দু ভদ্রলোকেরা ছিল এই আন্দোলনের মূল শক্তি, প্রাদেশিক রাজনীতিতে ভদ্রলোকেরা ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল, জমিদারিও আর লাভজনক ছিল না।  হতাশ ভদ্রলোকেরা আশা করেছিল যে, বাংলা ভাগ করলে হিন্দুপ্রধান এলাকায় তারা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। 

শুধু কংগ্রেস বা হিন্দু মহাসভা নয়,  মিউনিসিপ্যাল কমিশনারদের এসোসিয়েশন, ইউনিয়ন বোর্ড, জমিদার এসোসিয়েশন, স্থানীয় ক্লাব, এমনকি এন্টালি বয়েজ লাইব্রেরিও বাংলা ভাগের জন্য আবেদনপত্র প্রেরণ করে। উকিলদের সমিতি, মেডিকেল প্রাকটিশনার্স এসোসিয়েশন, বড়বড় কোম্পানি, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, উকিল, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর, জমিদার, ম্যানেজার – সবাই এ কথা সমর্থন করে ঘোষণা করে যে, “মুসলিম লীগ সরকারের অধীনে জীবন, সম্পত্তি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যাবে’ এবং সে কারণে ‘অনতিবিলম্বে বাঙলা ভাগের দাবি ছাড়া’ তাদের বিকল্প নেই ।

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের জন্য ব্রিটিশ সরকারের মতো কোলকাতার অবাঙালি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ও সমানভাবে দায়ী ছিল। চালের মজুতদারি করে মানব সৃষ্টি এই দুর্ভিক্ষে ৩০লক্ষ বাঙালির মৃত্যুর বিনিময়ে তারা রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠে। বাঙালির রক্তচোষা এই কালো টাকা তারা কয়লার খনিতে এবং অন্যান্য শিল্পে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু বাংলা অবিভক্ত থাকলে মুসলমান প্রধাণ বাংলাতে তারা ভাল ফল করবে এবং মুসলিম লীগ সরকার তাদেরকে সহযোগিতা করবে বলে কোলকাতার মাড়োয়ারি সম্প্রদায় একেবারে  বিশ্বাস করত না।  অপর পক্ষে, বাংলা ভাগ হলে বাংলায় কংগ্রেস সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, এবং ঐ সরকার হবে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের পকেট সরকার। এবং একমাত্র বাংলা ভাগ হলে তবেই কংগ্রেস বাংলায় ক্ষমতায় আসতে পারবে। তাই বাংলা ভাগের আন্দোলনে বিড়লা ও তাঁর সম্প্রদায়ের সদস্যরা নিখুঁত ব্যবসায়িক স্বার্থে বিপুল পরিমান অর্থ সাহায্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কোলকাতা ও পল্লি এলাকার বাঙালি বা অবাঙালি ব্যবসায়ীরা এই আন্দোলন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিড়লা, ঈশ্বর দাস জালান, গোয়েঙ্কা ও নলিনী রঞ্জন সরকার – বাঙলার সব লাখপতি ক্রোড়পতি – উচ্চ পর্যায়ের কমিটিতে উপস্থিত থেকে আন্দোলন পরিচালনার কৌশল নির্ধারণ করতেন। প্রদেশের সব এলাকা থেকে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা সর্ব-ভারতীয় কংগ্রেস কমিটির কাছে দরখাস্ত প্রেরণ করে জানায় যে, মুসলিম লীগ সরকারের অধীন বাঙলায় ব্যবসা ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস’ হয়ে গিয়েছে এবং তারা বাঙলা বিভাগের প্রচেষ্টায় আন্তরিকভাবে সমর্থন করে। তারা বলে যে, এই পদক্ষেপ ‘শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয়’।  

বাঙলার বিভিন্ন এলাকায় অনেক জনসভায় অনতিবিলম্বে একটা পৃথক হিন্দু প্রদেশ গঠনের দাবি জানিয়ে প্রস্তাব পাশ করা হয় এসব জনসভায় সভাপতিত্ব করেন (এবং অবশ্যই অর্থ প্রদান করেন) স্থানীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। বস্তুত বেশ কয়েক বছর ধরে জি. ডি. বিড়লা ছিলেন বাঙলা ভাগের একজন সমর্থক : ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে তিনি মহাদেব দেশাইয়ের কাছে স্বীকার করেন যে, ‘আমি (বাংলা) বিভাগের পক্ষে। আমি মনে করি না যে, এটা অবাস্তব বা হিন্দুদের স্বার্থবিরুদ্ধ।’ কোলকাতার ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কাছে (বাংলা) বিভাগ স্পষ্টত আর্থিক দিক দিয়ে উত্তম বলে প্রতিভাত হয়। 


অবিভক্ত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার জন্য প্রচেষ্টা

বাঙলা-বিভাগ আন্দোলনে হিন্দু জনমত সংগঠনের সাফল্য মানে এই নয় যে সবাই এ আন্দোলনে ভেসে গিয়েছিল। বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী একটি পরিকল্পনা পেশ করেন যে, পূর্ব এবং পশ্চিম বাংলা ভারত কিংবা পাকিস্তানের অংশ হিসেবে না যুক্ত হয়ে বরং একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। সোহরাওয়ার্দী ২৪ এপ্রিল, ১৯৪৭ সালে দিল্লির একটি সংবাদ সম্মেলনে তার প্রস্তাব তুলে ধরেন। পরিকল্পনাটি যদিও সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ বাতিল করে দেয়। কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সোহরাওয়ার্দীর পরিকল্পনাকে পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছিলেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর সমর্থন লাভের পর সোহরাওয়ার্দী তার পরিকল্পনার স্বপক্ষে সমর্থন জমায়েত শুরু করেন। বর্ধমানের নেতা আবুল হাসিম সোহরাওয়ার্দীর প্রস্তাবকে  সমর্থন করেন।

কংগ্রেসের পক্ষ থেকে গুটিকয়েক নেতা এই পরিকল্পনার সাথে একমত ছিলেন। তাদের মাঝে ছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসের অগ্রজ শরৎ চন্দ্র বোস এবং কিরণ শংকর রয়। কিন্তু জওহরলাল নেহেরু এবং বল্লবভাই প্যাটেল সহ বেশিরভাগ কংগ্রেস নেতা এই পরিকল্পনা বাতিল করেন। এছাড়াও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নেতৃত্বাধীন হিন্দুমহাসভা এর তীব্রভাবে বিরোধিতা করে। 

শরৎ বসুর নেতৃত্বে কংগ্রেসের মুষ্টিমেয় কিছু লোক স্বাধীন সার্বভৌম অবিভক্ত বাংলা রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করেন। কিন্তু অনতিবিলম্বে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, প্রাদেশিক কংগ্রেসের কেউ বসুকে সমর্থন করেন না। শাসনতন্ত্র (constituant) পরিষদের বাঙলার এগারো জন হিন্দু সদস্য মাউন্টব্যাটেনের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর কাছে ‘ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে পশ্চিম ও উত্তর বাংলায় পৃথক ও স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ গঠনের দাবি জানান’।  তবু কিরণ শংকর রায়ের সহায়তায় শরৎ বসু শেষ মুহূর্তে একটা ‘যুক্ত ও সার্বভৌম বাংলা’ গঠনে মুসলমান নেতাদের সাথে চুক্তি করেন। ১৯৪৭ সালের মে মাসে বসু এই প্রস্তাবের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যের একটি রূপরেখা প্রস্তুত করেন এবং সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম তা উৎসাহের সাথে গ্রহণ করেন। 

স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্রের জন্য যৌথ নির্বাচকমণ্ডলী, প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধিকার এবং জনসংখ্যা অনুপাতে আসন সংরক্ষণের নীতি গ্রহণ করা হয়। বাঙলার ‘স্বাধীন রাষ্ট্রে’ সমান সংখ্যক হিন্দু ও মুসলমান মন্ত্রী থাকবে, প্রধানমন্ত্রী হবেন মুসলমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন হিন্দু। সরকারি চাকুরিতে হিন্দু-মুসলমানদের সমান অংশ নিশ্চিত করা হবে। এবং সর্বসম্মতভাবে স্থির করা হয় যে, বাঙলার স্বাধীন রাষ্ট্র হবে ‘সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী; এ ধারণা গ্রহণ করা হয় যে, “সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান আসলে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্যে নিহিত রয়েছে।”

বাঙলাকে যুক্ত রাখার পরিকল্পনায় গান্ধীও শর্তসাপেক্ষ সমর্থন দেন, তবে তাঁকে সমর্থন প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়। ওয়ার্কিং কমিটিতে তাঁর সহকর্মীরা ‘শরৎ বাবুর উদ্যোগে সমর্থন জানানোর জন্য তাঁকে কৈফিয়ত তলব করে’। 

হোসেন সোহরাওয়ার্দী ২৬ এপ্রিল ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে বলেন, বাংলা ভাগ না করে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। মাউন্টব্যাটেন কিন্তু সোহরাওয়ার্দীকে নিরাশ করেন নি। তিনি বলেছিলেন, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ যদি মেনে নেয়, অখণ্ড বাংলার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারের কোনো আপত্তি থাকবে না।

২৬ এপ্রিল মাউন্টব্যাটেন একটি বৈঠক করেন মহম্মদ আলী জিন্নার সাথে। জিন্না জানান, অবিভক্ত ও স্বাধীন বাংলার প্রস্তাবে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। বলেন – ‘আমি আনন্দিত হব। কলকাতা ছাড়া বাংলার কী মর্যাদা রয়েছে? ওদের (বাঙ্গালিদের) পক্ষে যুক্ত ও স্বাধীন থাকাই ভালো হবে।’ 

পরদিন, দিল্লিতে একটি প্রেস কনফারেন্সে সোহরাওয়ার্দী একটি বত্তৃতা দেন, তিনি বলেন- 

“আসুন এক মুহূর্ত থেমে ভাবি বাংলা ঐক্যবদ্ধ হলে কি হতে পারে। এটি একটি মহান দেশ হবে, প্রকৃতপক্ষে ভারতের সবচেয়ে ধনী এবং সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ। এটি তার জনগণকে একটি উচ্চ জীবনযাত্রার মান দিতে সক্ষম হবে, যেখানে একজন মহান মানুষ তাদের মর্যাদার পূর্ণ উচ্চতায় উঠতে সক্ষম হবে, এমন একটি ভূমি যা সত্যই প্রচুর হবে। এটি কৃষিতে সমৃদ্ধ হবে, সিন্ধু-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ হবে এবং সময়ের সাথে সাথে এটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এবং প্রগতিশীল দেশ হবে। বাংলা ঐক্যবদ্ধ হলে এটা কোন স্বপ্ন বা কল্পনার ব্যপার হবে না”।

১৮ এপ্রিল মাউন্টব্যাটেন বাংলার গভর্নর ফ্রেডরিক বারোজকে টেলিগ্রামে জানান – ‘এটি ভুলবেন না যে আমার প্ল্যানে পাকিস্তান বা হিন্দুস্তানের অংশ নয় এমন একটি যুক্ত অথচ স্বাধীন বাংলার পথ খোলা রয়েছে।’

জিন্নার সমর্থন থাকলেও, কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতারা তীব্র বিরোধিতা করেন অখণ্ড বাংলার পরিকল্পনার। পাশাপাশি, ব্যক্তিগতভাবে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বাংলার কংগ্রেস নেতাদের চিঠি লিখে বাংলা ভাগের দাবিতে অটল থাকতে বলেন। এবং যাঁরা অখণ্ড বাংলা চাইছিলেন, তাঁদের নিন্দা করেন প্যাটেল। নেহরুও চাননি, বাংলা স্বাধীন রাষ্ট্র হোক।


বাংলা ভাগ হল

কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার এত চেষ্টা সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার বাংলা-বিভাগের বিষয়ে নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায়নি। ১৭ মে ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, বাংলা বিভাজন সম্পর্কে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদকে দুটি ভাগে ভাগ করা হবে। একটি ভাগ মুসলিম সংখ্যাগুরু জেলাগুলির প্রতিনিধিত্ব করবে, অন্য ভাগটি হিন্দু সংখ্যাগুরু এলাকার। এই জেলাগুলির নির্বাচিত সদস্যরা পৃথকভাবে ভোট দেবেন। ভোটের ফলাফলে যদি যে-কোনো একটি পক্ষও বাংলার বিভাজন চায়, তাহলে বাংলা ভাগ হবে। নইলে, উভয় পক্ষই যদি বাংলাভাগের বিপক্ষে ভোট দেয়, অখণ্ড থাকবে বাংলা।

পরিকল্পনা অনুসারে ১৯৪৭ সালের ২০ জুন, বঙ্গীয় আইনসভার সদস্যরা বাংলার ভাগ্য নির্ধারণের জন্য আইনসভায় মিলিত হন। পরপর কয়েক দফায় ভোট গ্রহণ করা হয়। 

সম্মেলনের প্রথমদিকে কংগ্রেসের দাবিতে ‘বাংলা ভাগ হবে এবং বিভক্ত সমগ্র বাংলা বর্তমান ভারতীয় গণপরিষদে যোগদান করবে’ বলে একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। আইনসভার হিন্দু-মুসলিম সকল সদস্যদের নিয়ে গঠিত হাউসের যৌথ অধিবেশনে এই প্রস্তাব অর্থাৎ বাংলা ভাগের পক্ষে মাত্র ৯০টি ভোট পড়ে, বাংলা ভাগের বিপক্ষে ১২৬টি ভোট পড়ে। তাই এই প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। 

এরপর বাংলার মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার সদস্যরা পৃথকভাবে প্রথমে বাংলা ভাগের প্রস্তাবের উপর ভোটদানে অংশ গ্রহণ করে, এবং বাংলা ভাগের পক্ষে মাত্র ৩৫টি ভোট ও বাংলা ভাগের বিপক্ষে ১০৬টি ভোট পড়ে তাই বাংলা ভাগের প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। 

এরপর এই অংশের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করবার জন্য বর্তমান গণপরিষদে যোগদান করবে না, মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলির জন্য যে নতুন গণপরিষদ গঠি হবে, সেই গণপরিষদে যোগদান করবে তার একটি  প্রস্তাব উত্থাপিত  হয়। মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলির জন্য যে নতুন গণপরিষদ গঠিত হবে, সেই গণপরিষদের যোগদানের প্রস্তাবের পক্ষে ১০৭ জন ও বিপক্ষে ৩৪ জন ভোট প্রদান করায়  প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।

তারপর বাংলার হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার সদস্যরা পৃথকভাবে বাংলা ভাগের প্রস্তাবের উপর ভোটদানে অংশ গ্রহণ করে, এবং বাংলা ভাগের পক্ষে ৫৮টি ভোট ও বাংলা ভাগের বিপক্ষে মাত্র ২১টি ভোট পড়ে, এবং বাংলা ভাগের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। তারপর এই অংশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের উদ্দেশ্য বর্তমান ভারতীয় গণপরিষদে যোগদানের প্রস্তাব ৫৮-২১ ভোটে গৃহীত হয়।

এই ভোটাভোটিতে মোট ২২৫ জন সদস্য অংশ গ্রহণ করেন। তন্মধ্যে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট অঞ্চলের ছিলেন ৮০ জন, তারমধ্যে আবার হিন্দু ছিলেন ৫৮ জন, মুসলমান  ছিলেন ২১ জন,  অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ৪ জন এবং ভারতীয় খৃষ্টান ১ জন। এবং মুসলমান গরিষ্ঠ অঞ্চলের ছিলেন ১৪৫ জন, তারমধ্যে মুসলমান ছিলেন ১০৩ জন, হিন্দু ৪১ জন এবং ভারতীয় খৃষ্টান ১ জন।

সেদিন বিশিষ্ট হিন্দু ব্যক্তিত্বদের মধ্যে যারা বাংলা ভাগের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, তারা হলেন – গোবিন্দলাল ব্যানার্জি, ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী (হিন্দুমহাসভা), মহারাজাধিরাজ স্যার উদয়চাঁদ মহতাব (নির্দল), মুকুন্দবিহারী মল্লিক (নির্দল), রতনলাল ব্রাহ্মণ (কমিউনিষ্ট) এবং জ্যোতি বসু (কমিউনিষ্ট)।

এবং  বিশিষ্ট মুসলমান ব্যক্তিত্বদের মধ্যে যারা বাংলাকে অবিভক্ত রাখার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন –   মিঃ এস. এইচ. সোহারাবর্দী (প্রধানমন্ত্রী), মিঃ এম. এ. এই. ইস্‌পাহানী ও আরো অনেকে।

শর্ত অনুযায়ী, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের সদস্যরা বাংলা ভাগের সমর্থনে ভোট দেওয়ায়, স্থির হয়ে যায় যে, বাংলা ভাগ হচ্ছেই। বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে বাংলাকে দু’টুকরোয় ভাগ করার পরিকল্পনা গৃহীত হয়। এবং পরবর্তীকালে বিতর্কিত সীমাও নির্ধারিত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট অনির্দিষ্ট কালের জন্য দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায় বাংলা।


উপসংহার

সেই সম্রাট শশাঙ্কের সময় থেকে পলাশির যুদ্ধ পর্যন্ত হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালি জাতি অনেক উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে সময় অতিক্রান্ত করেছে। শাহ-ই-বাংলা সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের সময় থেকে একটি জাতি হিসাবে বাঙালি বরাবর ঐক্যবদ্ধ ছিল, বাংলার অখণ্ডতা মোটের উপর বজায় ছিল। এই  দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ধর্ম ও সম্প্রদায়গত স্বার্থ নিয়ে জাতির অভ্যন্তরে  মঝেমধ্যে যুদ্ধ বিবাদও নিশ্চয়ই হয়ে থাকবে, কিন্তু ক্ষুদ্র সম্প্রদায়গত স্বার্থে বাংলাকে ভাগ করার কথা কেউ ভাবেনি। বাংলার স্বাধীনতা ও অখণ্ডতা রক্ষা করতে গিয়ে বহু হিন্দু বীর আত্মোৎসর্গ করেছেন, বহু মুসলমান মুজাহিদ শহিদ হয়ে গেছেন, তবুও বাংলাকে ভাগ হতে দেয়নি। 

কিন্তু ১৯৪৭ সালের ২০ জুন নিজেদের ক্ষুদ্র সাম্প্রদায়িক স্বার্থকে সামনে রেখে বাংলার স্বঘোষিত ভদ্রলোকেরা বাঙালি জাতির প্রতি যে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন, তার জন্য জাতি তাদেরকে কোনদিন ক্ষমা করবে না। কৃষক প্রজা পার্টির সৈয়দ হাবিব-উল-রহমান বাংলা ভাগের বিরোধিতা করে বলেছিলেন-, “হিন্দু ও মুসলমান উভয়ই একটি অভিন্ন মাতৃভূমিতে বাস করে, একটি অভিন্ন ভাষা ও সাহিত্যের শাখা ব্যবহার করে এবং একটি অভিন্ন ভূমিতে কয়েক শতাব্দী ধরে বসবাসের মাধ্যমে বিকশিত একটি সাধারণ হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির মহৎ ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত।” কিন্তু তার এই বক্তব্য ভদ্রলোকদের মনে রেখাপাত করে নি। সেদিন তারা যদি নিজেদের ক্ষুদ্র সাম্প্রদায়িক স্বার্থকে দূরে সরিয়ে রেখে বাংলা ভাগের বিপক্ষে ভোট দিতেন, তবে হয়ত হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে শুধুমাত্র বাঙালিদের জন্য একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্রের জন্ম হোত সেই ১৯৪৭ সালেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *