পলাশির যুদ্ধের পর ইংরেজ শাসনকে অভিজাত শ্রেণীর বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় স্বাগত জানিয়েছিল। নবাবি আমলে আরবি ফারসী শিখে সরকারি চাকরির উঁচু উঁচু পদগুলো তারাই দখল করে রেখেছিল। এখন তারা ইংরেজের প্রভুত্বকে শুধু স্বাগত জানাল তাই নয়, ইংরেজি শিক্ষা, তাদের সংস্কৃতি, তাদের জীবন-দর্শনকে সম্পূর্ণরূপে করায়ত্ত করবার জন্য উঠে পড়ে লাগল। ওদিকে ইংরেজরা তাদের রাজত্ব কেড়ে নিয়েছে, তাই শত্রুর শিক্ষা-সংস্কৃতি-সভ্যতার প্রতি মুসলমান সম্প্রদায় বিমুখ হয়ে রইল।
অপরদিকে শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়া বাংলার মুসলমান সম্প্রদায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে শুরু করল। ওয়াহাবি আন্দোলন প্রথমদিকে শুধুমাত্র ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন হিসাবে শুরু হলেও, ১৮২০ খৃষ্টাব্দে ওয়াহাবিরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন শুরু করে। ওয়াহাবিদের লড়াই ভারতের আদিতম এবং সর্বাধিক দীর্ঘস্থায়ী ব্রিটিশ বিরোধী লড়াইগুলির মধ্যে অন্যতম। গোটা ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় ইতিহাসের সব থেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় ওয়াহাবিদের ব্রিটিশ বিরোধী লড়াই। কিন্তু দুঃখের বিষয় কোন ঐতিহাসিক রচনাতেই অর্ধ শতাব্দী-ব্যাপী এই মহান সংগ্রামকে উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়া হয়নি। ওয়াহাবিরা ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছিল। এই সময় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যে সব অসংখ্য ষড়যন্ত্রকারীর বিচার হয়েছে এবং বিচারের রায়ে যাঁদের ফাঁসি হয়েছে তাঁরা প্রায় সকলেই ছিলেন ওয়াহাবি সম্প্রদায়ভুক্ত।
মালদহ মামলার (১৮৭০) রায়ে ওয়াহাবি নেতা রফিক মন্ডলের পুত্র আমির উদ্দিনকে আন্দামান দ্বীপে যাবজ্জীবন নির্বাসন দণ্ড দেওয়া হয় এবং তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। মামলার রায় শুনে তাঁর অশীতিপর বৃদ্ধ পিতা রফিক মন্ডল নিজের ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত কন্ঠে বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে তার বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হয়নি। আমার ছেলে যদি তার নতুন আদর্শে অবিচল থাকে তবে হারাতেও প্রস্তুত আছি।’
রাজমহল মামলার রায়ে (১৮৭০) ওয়াহাবি নেতা ইব্রাহিম মন্ডলকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়ে আন্দামান প্রেরণ করা হয় এবং তাঁর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। ইব্রাহিম মালদহ, রাজশাহী, বগুড়া, রংপুরে এবং দিনাজপুরে আন্দোলন সংগঠিত করা ও তহবিল সংগ্রহ করার কাজে লিপ্ত ছিলেন। সে সময় একজন অতি সৎ ন্যায়নিষ্ঠ ও সম্মানিত ব্যক্তি হিসাবে তিনি পরিচিত ছিলেন। তাঁর বিরদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হওয়ায় ১৮৭৮ খ্রীস্টাব্দে লর্ড লিটন তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন।
১৮৬৯ খ্রীস্টাব্দে কলকাতার কলুটোলার আমির খাঁ ও হাসমত খাঁ নামে দুই চর্ম ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসনের অবসানকল্পে মুক্তি যুদ্ধের জন্য তহবিল সংগ্রহ করছিলেন। কয়েক বছরের জন্য তাঁদের আটক রাখা হয়। পরে পাঁচজন অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন আন্দামান কারাবাসে নিক্ষেপ করা হয়। কলকাতা হাইকোর্টের চীফ জাস্টিস নরম্যান তাঁদের আপীল নাকচ করে দেন।
১৮১৮ খ্রীস্টাব্দের ৩ নং রেগুলেশন অনুযায়ী সত্তর বছর বয়স্ক আমির খাঁকে আটক করা হয়। অবশ্য এর পর তিনি আর বেশি দিন বাঁচেন নি। খান মুবারক আলিও জেলখানার নির্মম প্রহারের ফলে মত্যুবরণ করেন।
কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মিঃ নরম্যান নির্বিকারে ওয়াহাবি বিপ্লবের নেতাদের একে একে প্রাণ দণ্ডে দণ্ডিত করে ফাঁসিতে পাঠাচ্ছিলেন। তারই প্রতিবাদে ১৮৭১ সালে ২০শে সেপ্টেম্বর, নরম্যান যখন কলকাতা টাউন হলের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছিল, তখন মোহাম্মদ আবদুল্লাহ তাকে আক্রমণ করে এবং ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। নরম্যানকে হত্যার পর আবদুল্লাহকে খুঁজে পেতে কলকাতায় তার ছবিসহ পোস্টার লাগানো হয়। কিন্তু ধরা পড়ার পর সে মুক্তি পাবার জন্য আদালতে শাস্তি গ্রহণে অস্বীকার করেননি। বিনা প্রতিবাদে ফাঁসির মঞ্চে শহিদের মৃত্যু বরণ করেছিলেন। এটি ছিল মেদিনীপুরের বীর বিপ্লবী ক্ষুদিরামের ফাঁসির (১৯০৮) ৩৭ বছর আগের ঘটনা। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই বাঙালি বীর মোহাম্মদ আবদুল্লাহই ছিলেন প্রথম শহিদ। অথচ ভদ্রলোকদের লেখা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের যে ইতিহাস আমাদের পড়ানো হয়, তাতে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম শহিদ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর নাম আমরা পাই না।
১৮৭২ খ্রীস্টাব্দে লর্ড মেয়ো আন্দামান পোর্টব্লেয়ার জেল পরিদর্শনে গেলে মহম্মদ শের আলি নামে একজন ওয়াহাবি কয়েদী তাঁকে হত্যা করেন।
বাঙ্গলায় ওয়াহাবীদের নেতা ছিলেন বাঁশের কেল্লার বিখ্যাত সৈয়দ মীর নিসার আলী (তিতুমীর)। তিতুমীর বর্তমান চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং ফরিদপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অধিকার নিয়ে সেখানে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। নিজেকে ‘বাদশাহ করে মৈনুদ্দিন নামে জনৈক ওয়াহাবীকে প্রধানমন্ত্রী ও তার ভাগ্নে গোলাম মাসুমকে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। স্থানীয় জমিদারদের নিজস্ব বাহিনী এবং ব্রিটিশ বাহিনী তিতুমীরের হাতে বেশ কয়েকবার পরাজয় বরণ করে। তন্মধ্যে বারাসত বিদ্রোহ অন্যতম। উইলিয়াম হান্টার বলেন, ঐ বিদ্রোহে প্রায় ৮৩ হাজার কৃষকসেনা তিতুমীরের পক্ষে যুদ্ধ করেন।
অবশেষে ১৮৩১ সালের ১৩ নভেম্বর ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। ১৪ নভেম্বর কর্নেল হার্ডিং-এর নেতৃত্বে ব্রিটিশ সৈন্যরা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তিতুমীর ও তার অনুসারীদের আক্রমণ করে।[তাদের সাধারণ তলোয়ার ও হালকা অস্ত্র নিয়ে তিতুমীর ও তার সৈন্যরা ব্রিটিশ সৈন্যদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে দাঁড়াতে পারে নি। ১৯ নভেম্বর তিতুমীর ও তার চল্লিশ জন সহচর শহীদ হন। তার বাহিনীর প্রধান মাসুম খাঁ বা গোলাম মাসুমকে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং বাশেঁর কেল্লা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
এছাড়া পাটনা ও মেদিনীপুরে ওয়াহাবীরা ইংরেজদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন। ওয়াহাবীদের দমন করবার জন্য ইংরেজরা সৈন্যদল নিয়োগ করেছিলেন এবং কারাগারে তাঁদের প্রতি নিষ্ঠুর অত্যাচার করা হত। হিন্দুত্ববাদীরা এটা স্বীকার করতে চান না, কিন্তু বাঙ্গলার ও পাটনার ওয়াহাবীরাই ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের দিশারী ছিলেন। সিপাহী বিদ্রোহ সংঘটিত করতেও ওয়াহাবীরা অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিলেন এবং যে যে স্থানে সিপাহী বিদ্রোহ ফলপ্ৰসূ হয়েছিল, তা ছিল অনেকটা এই ওয়াহাবীদের প্রচেষ্টা ও সংগঠনের ফল।
ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই করে যত ওয়াহাবী প্রাণ দিয়েছেন বা প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন, যে কোন পরাধীন জাতির পক্ষেই তা গৌরবের বিষয়। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী ঐতিহাসিকদের লেখা ভারতের ইতিহাস তাঁদের সেভাবে স্বীকৃতি দেয় নি। ওয়াহাবী বিদ্রোহীদের বন্দী রাখবার জন্যই আন্দামানে সেলুলার জেল তৈরি করা হয়েছিল। সেলুলার জেলে বন্দিদের মধ্যে এক বড় সংখ্যার মানুষ ছিলেন ওয়াহাবি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
হিন্দুত্ববাদীদের অনেকেই ওয়াহাবি আন্দোলনকারীদের স্বাধীনতা সংগ্রামি বলে স্বীকার করতে চান না। তারা বলে থাকে, ওয়াহাবিরা ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেনি, তারা নাকি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিল।
হিন্দুত্ববাদীদের এই যুক্তি যদি আমরা মেনে নিই তাহলে পরবর্তিকালের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকারীদের মধ্যে অনেকের নামই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে বাদ দিতে হয়। এদের মধ্যে এনেকেই, – যেমন – তিলক, অরবিন্দ, বিপিন পাল -এরা প্রত্যেকেই ব্রটিশ বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হিন্দু ধর্মীয় আদর্শকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার কাজে লিপ্ত ছিলেন।
এমনকি এই সময়ে বাংলার বিপ্লবী দলগুলো দলীয় সদস্য সংগ্রহ করার সময়, যুবক অনুসারীদের শাক্ত দর্শন দ্বারা অনুপ্রাণিত ধর্মীয় শপথে আবদ্ধ করত। দেবী প্রতিমার সামনে হিন্দু ধর্মীয় আচার মেনে শপথ নিতে হত। তাদের কাছে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে সংগঠিত করার আসল লক্ষ্য ছিল দীর্ঘকালব্যাপী স্থবির হিন্দু জাতির পুনর্জাগরণ ও নতুন করে তাকে সবল করা।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজফফর আহমদ, তাঁর লেখা “কমিউনিস্ট পার্টি ও আমার জীবন” বইতে দেখিয়েছেন যে, “সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের অন্যতম মুখ্য প্রতিষ্ঠান অনুশীলন সমিতির লিখিত প্রচারপত্রে লেখা থাকতো যে, সমিতির অন্যতম উদ্দেশ্য মুসলমানদের দাবিয়ে রাখা এবং সমিতির নিয়ম ছিল কোন অহিন্দু সমিতির সভ্য হতে পারবে না।”
অনুশীলন সমিতির একটি ইশতেহারে প্রকাশ্যভাবে মুসলমানদের সম্বন্ধে উল্লেখ করা ছিল “যতদুর দেখা যাচ্ছে তাতে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে দু-এক বছরের মধ্যেই সমগ্র মুসলমান জাতি হিন্দুদের নিকট বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হবে। কিন্তু তখন যদি হিন্দুরা তাদের দৃঢ়তা ও জাতীয় গৌরব বিসর্জন দিয়ে অতীব অধোগামী হয়ে মুসলমানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তাদের সঙ্গে হাত মেলায় তাহলে মুসলমানদের বাড় বেড়ে যাবে এবং তাতে মঙ্গল না হয়ে অমঙ্গলই হবে”।
তারপরেও আমরা, যখন মুসলমান বিদ্বেষী সন্ত্রাষবাদী বিপ্লবীদেরকে, মহান স্বাধীনতা সংগ্রামি হিসাবে মেনে নিতে কোনো আপত্তি করি না, তখন মুহাম্মদ আবদুল্লার মত অসংখ্য ওয়াহাবী বিপ্লবীদেরকে স্বাধীনতা সংগ্রামি হিসাবে কেন স্বীকার করা হবেনা, এই প্রশ্ন থাকল।

