Headlines

কে বাঙালি, কেন বাঙালি

Bengali - painting খ্রিষ্টীয় ১৫ শতাব্দীকালে পর্তুগিজ চিত্রকরের আঁকা বাঙালিদের ছবি।

“রণধারা বাহি জয়গান গাহি
উন্মাদ কলরবে
ভেদি মরুপথ গিরিপর্বত
যারা এসেছিল সবে,
তারা মোর মাঝে সবাই বিরাজে
কেহ নহে নহে দূর,
আমার শোণিতে রয়েছে ধ্বনিতে
তারি বিচিত্র সুর।”

রক্তের মিশ্রণ, ভূগোল ও ইতিহাসের এক মহাকাব্য 

আজকের পৃথিবীতে পরিচয়ের প্রশ্ন ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। ধর্ম, ভাষা, জাতি, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি সব মিলিয়ে মানুষ নিজের অস্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করতে চায়। বাংলার ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্ন নতুন নয়। হাজার বছরের ইতিহাস, রক্তের মিশ্রণ আর এক অনন্য ভৌগোলিক ভূখণ্ড মিলে তৈরি হয়েছে এই জাতি। 

কিন্তু কে বাঙালি? কেনই বা আমরা বাঙালি? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের নৃতাত্ত্বিক শিকড়ে, সুলতানি আমলের রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় আর প্রকৃতির তৈরি এক বিশাল সীমানায়। 


নৃতাত্ত্বিক পরিচয় – বাঙালি একটি মিশ্র জনগোষ্ঠী

নৃতাত্ত্বিকদের মতে, বাঙালি কোনো একক বা খাঁটি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী থেকে তৈরি হয়নি। এটি একটি সংকর বা মিশ্র জনগোষ্ঠী। হাজার বছর ধরে এই বদ্বীপে নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ এসেছে, থিতু হয়েছে এবং নিজেদের বিলীন করে দিয়েছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে।

প্রাক দ্রাবিড় যুগের নেগ্রিটো ও আদি অস্ত্রাল জাতি (Proto-Australoid) গোষ্ঠির সহিত স্থানীয় প্রাচীন জাতি – সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা, কোরা, লোধা ইত্যাদি জাতি গোষ্ঠির মিশ্রনে বাঙালি জাতির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। আদিবাসীদের মধ্যে সাঁওতালরাই প্রথম এ অঞ্চলে এসে বসবাস করে, এখনো পর্যন্ত আদিবাসীদের মধ্যে তারাই সংখ্যা গরিষ্ঠ। তারপর দক্ষিণ ভারত থেকে আসা বিভিন্ন দ্রাবিড় জাতি গোষ্ঠি, হিমালয় পেরিয়ে আসা কোচ, মেচ ইত্যাদি মোঙ্গোলিয়ান জাতি গোষ্টি, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা আল্পীয় বা আল্পাইন জাতি গোষ্ঠি এবং মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া থেকে আসা সেমেটিক, পারশিক ও তুর্কি ইত্যাদি জাতি গোষ্ঠি, সবাই মিলে মিশে আজকের এই বাঙ্গালী জাতি তৈরি হয়েছে। পরবর্তীতে ইউরোপীয়দের (পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ইংরেজ) রক্ত ও সংস্কৃতির ছোঁয়া লেগেছে এই জাতিতে। যে জাতির মধ্যে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠির শঙ্করায়ন যত বেশি হয়, সে জাতির বুদ্ধিবৃত্তি ও টিকে থাকার ক্ষমতা তত বেশি হয়। তাই বাঙ্গালী সারা ভারতে বুদ্ধিতে ও সংস্কৃতিতে অদ্বিতীয়। সারা পৃথিবীতে বাঙ্গালী তৃতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠি, হান চাইনিজ ও আরবদের পরেই। 


প্রাচীন ইতিহাস

প্রত্নতাত্ত্বিকরা রাঢ় এবং বৃহত্তর বাংলা অঞ্চলে ৪,০০০ বছরেরও বেশী প্রাচীন তাম্র যুগের সভ্যতার আবিষ্কার করেছেন, অধুনা বাংলাদেশের রাঙ্গামাটি ও ফেনী জেলায় পাথরের একটি যন্ত্র এবং একটি হাত কুড়াল আকারে পুরা প্রস্তর যুগের বসতির দলিল পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের নরসিংদীতে উয়ারী-বটেশ্বর সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ সালের দিকে। ধারণা করা হয় এটি মাটির নীচে অবস্থিত একটি দুর্গ-নগরী। নদী থেকে দূরে না হওয়ায় এই বন্দর-শহরটি প্রাচীন রোম, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলের সাথে বৈদেশিক বাণিজ্যে নিমগ্ন ছিল বলে মনে করা হয়। এই সভ্যতার লোকেরা ইটের তৈরি বাড়িতে বাস করত, চওড়া রাস্তায় হাঁটত, রুপার মুদ্রা ও লোহার অস্ত্র ব্যবহার করত। একে বাঙ্গলার এবং সমগ্র উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের প্রাচীনতম শহর বলে মনে করা হয়।

পালী ভাষায় লেখা সিংহলের ‘মহাবংশ’ ও ‘দ্বীপবংশ’ অনুযায়ী বঙ্গদেশের নির্বাসিত রাজকুমার বিজয় সিংহ লঙ্কা জয় করে লঙ্কার রাজকুমারিকে বিয়ে করেন। এ ঘটনা ৫৪৩ খৃষ্টপূর্বের। বর্তমান সময়েও সিংহলবাসীদের সঙ্গে বাঙালিদের শারীরিক, নৃতাত্ত্বিক সাদৃশ্য দেখা যায়। বিজয় কাহিনী সমস্ত ভারতবাসীর হৃদয়ে এরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, সেই ঘটনার বহু শতাব্দী পরেও অজন্তার গুহাচিত্রে সিংহলবিজয় আঁকা হয়েছিল। অজন্তার অতুলনীয় চিত্রগুলির মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে বিজয়ের অভিযান।

৩২৭ খৃষ্টপূর্বাব্দে গ্রীক বীর আলেকজাণ্ডার যখন ভারত আক্রমণ করেন, তখন তিনি পাঞ্জাব জয় করেই ফিরে যান। কারণ তিনি খবর পেয়ে ছিলেন বঙ্গদেশে গঙ্গারিডির রাজা ৮০ হাজার অশ্বারোহী, ২ লক্ষ পদাতিক, ৬ হাজার হস্তি বাহিনী ও আট হাজার যুদ্ধ রথ নিয়ে তার সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছেন। এই খবর পেয়ে আলেকজান্ডারের সৈন বাহিন্যী আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ে, তখন বাধ্য হয়ে প্রাচ্য জয় অসমাপ্ত রেখে আলেকজান্ডারকে ফিরে যেতে হয়।

খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ-সপ্তম শতকে লেখা দণ্ডীর ‘দশকুমারচরিত’-এ বঙ্গোপসাগরের বুকে বিদেশী এক জাহাজের সঙ্গে স্বাধীন সুহ্ম রাষ্ট্রের রণতরীর যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। বিদেশী ঐ জাহাজের অধ্যক্ষের নাম ছিল “রামেষু”। এতে ধারনা করা হয় তখনও বঙ্গোপসাগরে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে জলদস্যুরা এসে বাংলার পণ্যবাহী জাহাজ লুঠ করত।  তাদের প্রতিরোধ করার জন্য স্বাধীন সুহ্ম (তাম্রলিপ্ত) রাষ্ট্রের নৈবাহিনী সমুদ্রে টহল দিত।

কাশ্মীরের ইতিহাস, ১১৪৮-৪৯ খৃষ্টাব্দে লেখা কলহনের রাজতরঙ্গিনীতে বাঙালির শৌর্যবীর্যের পরিচয় আছে। গৌড়ের মুষ্টিমেয় কিছু সৈন্য প্রভু হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য গৌড় থেকে সুদূর কাশ্মীরে গিয়ে পরিহাস-কেশব মন্দির আক্রমন করেন। গৌড়িয় সৈন্যরা মন্দিরের মধ্যে পরিহাস-কেশবের বিগ্রহ মনে করে ভুল করে বিষ্ণুর একটি সোনার তৈরি মুর্তি পীঠ থেকে তুলে ভেঙে ফেলেন। এদিকে শ্রীনগর থেকে দলে দলে কাশ্মিরি সৈন্য এসে সেই মুষ্টিমেয় গৌড়িয় সৈন্যদের হত্যা করতে থাকেন। কিন্তু গৌড়িয় সৈন্যরা নিজেদের মৃত্যুকে উপেক্ষা করে বিষ্ণু মুর্তিটাকে ভেঙে চুর্ন-বিচুর্ন করে বাতাসে ছড়িয়ে দিতে থাকেন। গৌড়িয়রা সংখ্যায় নিতান্ত কম হওয়ায় শেষ পর্যন্ত পরাজিত ও মৃত্যুবরণ করলেও সেদিন তারা যে অসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন রাজতরঙ্গিনীতে তার ভূয়সি প্রশংসা করা হয়েছে – “সেই দিন গৌড়ীয়গন যাহা করিয়াছিল, তাহা সৃষ্টিকর্তাও বুঝি করিতে পারিতেন না।”


নামের ব্যুৎপত্তি

প্রচীন ভারতীয় সাহিত্য়ে বঙ্গ নামটি পাওয়া যায়। পৌরাণিক মতে দীর্ঘতমা ঋষির ঔরসে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুহ্ম নামে পাঁচ পুত্র জন্মগ্রহণ করেন, তাঁহারাই এই পঞ্চ-রাজ্যের সংস্থাপয়িতা। অনুমান করা হয় দীর্ঘতমা ঋষি খৃঃ পূর্ব্ব ১৬৯০ অব্দে বর্ত্তমান ছিলেন। 

আবার ইব্রাহিমীয় বংশবিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, বঙ্গ ছিল নূহের ছেলে হামের নাতি। হাম ছিলেন নূহ এর পুত্র। তিনি মহাপ্লাবণ থেকে বেঁচে যাওয়া অন্যতম ব্যক্তি। মহাপ্লাবণ থেকে বেঁচে  যাওয়ার পর নূহ এর নির্দেশে তিনি ও তার পুত্র হিন্দ ও সিন্দ ভারত উপমহাদেশে চলে আসেন। ধারণা করা হয়, হিন্দ থেকে হিন্দু ও সিন্দ থেকে সিন্ধু শব্দের উতপত্তি হয়। প্রথম শতাব্দীর রোমানো-ইহুদী ইতিহাসবিদ ফ্ল্যাভিয়াস জোসেফাস (Flavius Josephus) জোর দিয়েছিলেন যে হামের বংশধরেরা এশিয়ার কিছু এলাকায় জনবহুল ছিল। বঙ্গ ছিলেন হিন্দের ছেলে। হিন্দের ছেলে বঙ্গের নাম অনুসারে তার প্রতিষ্ঠিত রাজ্যের নাম হয় বঙ্গ।

‘ঐতরেয় আরণ্যক’ গ্রন্থে প্রথম ‘বঙ্গ’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রিস্টপুর্ব ৩০০০ সালে। বৌধায়ন ধর্মসূত্রে একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে বঙ্গ নামের উল্লেখ রয়েছে। রামায়ণ এ অযোধ্যার সাথে বঙ্গের মৈত্রীবন্ধনের কথার উল্লেখ রয়েছে। মহাভারত থেকে জানা যায়, বঙ্গদের রাজ্য সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছিল। কালিদাসের রঘুবংশে, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গ নামের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু কোথাও বাঙ্গালা বা বাঙ্গালী নামের উল্লেখ পাওয়া যায় না। 

মধ্যযুগে মুসলমান শাসনামলে এই বঙ্গ নামের সঙ্গে আরবি-ফার্সি আল এবং আলি শব্দ যোগ হয়েছে। বঙ্গ থেকে বঙ্গাল ও বঙ্গালী এবং তারথেকে বাংলা এবং বাঙালি।


শাহ-ই-বাংলা ইলিয়াস শাহ: বাঙালি জাতীয়তাবাদের জনক

বাঙালির নৃতাত্ত্বিক গঠন প্রাচীন হলেও, রাজনৈতিকভাবে “বাঙালি” পরিচয়টি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মধ্যযুগে। আর এই ঐতিহাসিক কৃতিত্বের মহানায়ক সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ

১৩৪২ খ্রিষ্টাব্দে লখনৌতির সিংহাসন আরোহণের পর তিনি একে একে সাতগাঁও ও সোনারগাঁও জয় করেন। ইলিয়াস শাহের আগে বাংলা রাঢ়, গৌড়, পুণ্ড্র, বঙ্গ, সমতট, হরিকেল প্রভৃতি উপাঞ্চলে বিভক্ত ছিল। ১৩৫২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সমগ্র বাংলাকে একক প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে এনে, এই বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোকে একত্রিত করে ‘বাঙ্গালাহ’ নামক একটি রাষ্ট্র গঠন করেন। তখন থেকেই “বাংলা” নামটি একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক অঞ্চলের পরিচয় হিসেবে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদেশি ভ্রমণকারী ও ইতিহাসবিদরাও তখন থেকে “বাংলা”কে পৃথক অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করতে শুরু করেন। 

সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ নিজেকে ‘শাহ-ই-বাংলা’ (বাংলার সম্রাট) এবং সুলতান-ই-বাঙালিয়ান’ (বাঙালিদের সুলতান) উপাধিতে ভূষিত করেন। এবং এই অখণ্ড বাংলার নাগরিকদের বাঙালি নামে অবিহিত করেন। এভাবেই ইলিয়াস শাহ বংলা অঞ্চলের মানুষদের সামাজিক এবং ভাষাগত পরিচয়কে রাজনৈতিক ভাবে রূপান্তরিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন। তখন থেকেই সমগ্র ভারতবর্ষের এবং ভারতবর্ষের বাইরের লোকেরাও এই অঞ্চলের অধিবাসী অথাৎ আমাদেরকে বাঙালি বলে অভিহিত করে আসছে।

ইলিয়াস শাহকে মধ্যযুগের ইতিহাসে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা বলা যায়। দিল্লির কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা টীকিয়ে রেখে নিজেকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। ভাষা হল জাতি গঠনের ভিত্তি। বাঙালি মায়ের সন্তান ইলিয়াস শাহ বাংলা ভাষায় সরকারি কাজকর্ম করার নির্দেশ জারি করে ভাষার ভিত্তিতে সমগ্র বাঙালি জাতিকে একজোট করার প্রক্রিয়া শুরু করলেন। তার রাজত্বকালেই সর্বপ্রথম বাঙালিরা একটি জাতি হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে। ইলিয়াস শাহ থেকে শুরু করে বাংলার সুলতানেরা সবাই নিজেকে পরিচয় দিতেন “বাঙালি” নামে। শুধু সুলতানেরাই নয়, বাংলা রাষ্ট্রের সব অভিজাত ও কর্মকর্তারাই নিজেদের পরিচয় দিতেন “বাঙালি” নামে, জন্মসুত্রে তারা আরব, তুর্কি, পাঠান, বালুচ, ইরানি, তাজিক যাই হয়ে থাকুক না কেনো- বহির্বিশ্বে তাঁরা নিজেদের পরিচয় দিতেন ‘বাঙালি’ নামে। বাংলা রাষ্ট্রের সৈন্যরা সমগ্র ভারতসহ সারাবিশ্বে পরিচিত হয় “পাইক-ই-বাঙ্গালাহ” হিসেবে। অর্থাৎ যিনি বাংলার তিনিই বাঙালি, – তিনি জন্মসুত্রে আরব না তুর্কি না অন্যকিছু সেটা বিবেচ্য বিষয় ছিল না।

ইসলামের বিখ্যাত আরব সেনাপতি খালিদ-বিন-ওয়ালিদের বংশধর শায়খ নূর কুতুব উল আলম ছিলেন শাহী বাংলা সাম্রাজ্যের প্রধান মুফতি (ইসলামিক আইন বিশেষজ্ঞ)। বিশ্বে তিনি পরিচিত ছিলেন “শেখ নূর বাঙ্গালী” নামে (যদিও তিনি ছিলেন জন্মসুত্রে একজন আরব)। পরবর্তীকালে ষোড়শ শতাব্দীতে দিল্লির মুঘল বাদশাহ আকবর যখন দীন-ই-ইলাহী প্রচার করেন তখন বাংলার মুসলিম বুদ্ধিজীবি আলেম সমাজ এর প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন। বাংলার কাজী একে ইসলাম-বিরোধী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যা দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। বাঙ্গালী মুসলমান বুদ্ধিজীবিরা শুধু আকবরের বিরোধীতা করেই থেমে থাকেননি, বহু বাঙালি আলিম-ওলামা ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ইসলাম প্রচারের জন্য এবং দীন-ই-ইলাহী থেকে মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য চলে গিয়েছিলেন, বাংলার বাইরে তারা সবাই নিজেদেরকে বাঙালি বলেই পরিচয় দিতেন। যেমন আলী শের বাঙ্গালী গুজরাতে, ওসমান বাঙ্গালী উত্তর প্রদেশের সম্ভলে এবং ইউসুফ বাঙ্গালী মধ্য প্রদেশের বুরহানপুরে ইসলাম প্রচার করতে গিয়েছিলেন। এর থেকে বাঙালি বুদ্ধিজীবিদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা এবং প্রতিবাদী মানসিকতারও পরিচয় পাওয়া যায়।

এককথায় বাঙালি হলো বাংলা রাষ্ট্রের অধিবাসীদের নাগরিকত্বের পরিচয়। যিনি বাংলার অধিবাসী, যে বাংলাকে, বাংলার মানুষ, বাংলা ভাষা, বাংলার প্রকৃতি, বাংলার সংস্কৃিতিকে আপন করে নিয়েছে, তার পরিচয় তিনি বাঙালি। আর এভাবেই সেই সময় থেকেই বাংলার সকল অঞ্চলের সকল অধিবাসী, হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ ব্রাহ্মণ চণ্ডাল সবাই বাঙালি বলে পরিচিত হয় এবং বাংলার বাইরের দেশগুলোও তাদের কে বাঙালি বলে অভিহিত করে। 


বাঙ্গালী একটি জাতি (nation)

ঐতিহাসিকদের মতে বাঙ্গালী একটি জাতি (nation)। কারণ, জাতি গঠনের পূর্বের ধাপ কৌম (clan), গোত্র বা গোষ্ঠি পরিচয় বহু শতাব্দী আগেই বাঙ্গালীদের মধ্য থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বহু শতাব্দী আগেই গোষ্ঠি পরিচয় বিলুপ্ত করে দিয়ে বাঙ্গালীরা নিজেদেরকে একসময় গৌড়িয়, বঙ্গীয়, রাঢ়ি, বারিন্দ্রী ইত্যাদি অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল বা স্থানের নামের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় যুক্ত করত। পরবর্তিতে সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের সময় থেকে আঞ্চলিক পরিচয় বিলুপ্ত করে দিয়ে আমরা নিজেদেরকে বাঙ্গালী বলে পরিচয় দিয়ে আসছি। অথচ ভারতের অন্যান্য জাতি গোষ্ঠির মধ্যে এই কৌমি সমাজ বা জাত গোষ্ঠি পরিচয় আজও অত্যন্ত প্রবলভাবে টিকে রয়েছে। যেমন মাড়োয়ারি, রাজপুত ইত্যাদি সমাজের লোকেরা সবাই রাজস্থানের অধিবাসী হলেও তারা নিজেেদরকে রাজস্থানী বলে পরিচয় না দিয়ে মাড়োয়ারি, রাজপুত ইত্যাদি নামে পরিচয় দিতে বেশি গর্ববোধ করে। তাই ভারতের অন্যান্য জাতি গোষ্ঠি নিজেদেরকে একটি জাতি (nation) বলে দাবী করতে না পারলেও বাঙ্গালী নিজেদেরকে একটি স্বতন্ত্র জাতি (nation) বলে দাবী করার পূর্ণ অধিকার রাখে।


বাঙালি জাতির বাসভূমি – বাঙালি জাতির সীমানা: প্রকৃতির এক বিশাল ক্যানভাস

বাঙালি জাতির বাসভূমি

কোনও স্থান বা দেশের রাষ্ট্রীয় সীমা এবং তার ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক সীমা সর্বত্র সব সময় এক না-ও হতে পারে। রাষ্ট্রীয় সীমা পরিবর্তনশীল ; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রসার ও সংকোচনের সঙ্গে সঙ্গে, কিংবা অন্য কোনও কারণে রাষ্ট্রসীমা প্রসারিত ও সংকুচিত হতে পারে । 

কিন্তু রাষ্ট্রীয় সীমা যাই হোকনা কেন, সাধারণত দেখা যায়, বিশিষ্ট প্রাকৃতিক সীমার আবেষ্টনীর মধ্যেই জাতি ও ভাষার একত্ব-বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠে । অন্তত, প্রাচীন বাঙলাতেও তাই হয়েছিল। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় কবি-ঐতিহাসিকদের বর্ণনা এবং ভৌগোলিক বাস্তবতায় বাঙালি জাতির বাসভূমি ছিল এক বিশাল ও বৈচিত্র্যময় অঞ্চল। 

বাঙালি ঐতিহাসিকেরা এইভাবে বাঙালি জাতির বাসভূমির সীমা-নির্দেশ করেছেন – 

উত্তরে হিমালয় এবং হিমালয়ধৃত নেপাল, সিকিম ও ভোটান রাজ্য ; উত্তর-পূর্বদিকে ব্রহ্মপুত্র নদ ও উপত্যকা ; উত্তর-পশ্চিম দিকে দ্বারবঙ্গ (দারভাঙ্গা) শোন নদ, রোহতাস গড় পর্যন্ত ভাগীরথীর উত্তর সমান্তরালবর্তী সমভূমি; পূর্বদিকে গারে৷ খাসিয়া জৈন্তিয়া-ত্রিপুরা চট্টগ্রামশৈলশ্রেণী হয়ে দক্ষিণ সমুদ্র পর্যন্ত ; পশ্চিমে রাজমহল সাওতাল পরগনা ছোটনাগপুর-মানভূম ধলভূম কেঞ্জার- ময়ূরভঞ্জের শৈলময় অরণ্যময় মালভূমি ; দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ।

এই প্রাকৃতিক সীমাবিধৃত ভূমিখণ্ডের মধ্যেই প্রাচীন বাঙলার গৌড়-পুণ্ড্র-বরেন্দ্রী রাঢ়-সুহ্ম তাম্রলিপ্তি-সমতট-বঙ্গ-বঙ্গাল- হরিকেল প্রভৃতি জনপদ; ভাগীরথী করতোয়া-ব্রহ্মপুত্র পদ্মা মেঘনা এবং আরও অসংখ্য নদনদীবিধৌত বাঙলার গ্রাম, নগর, প্রান্তর, পাহাড়, কান্তার। এই ভূখণ্ডই ঐতিহাসিক কালের বাঙালীর কর্মকৃতির উৎস এবং ধর্ম কর্ম নর্মভূমি। একদিকে সু-উচ্চ পর্বত, দুইদিকে কঠিন শৈলভূমি, আর একদিকে বিস্তীর্ণ সমুদ্র; মাঝখানে সমভূমির সাম্য – ইহাই বাঙালীর ভৌগোলিক ভাগ্য। 

কিন্তু আজ হিমালয় আমাদের নামমাত্রই : সমুদ্রও বুঝি নামমাত্র : তাম্রলিপ্তি সত্যই সকরুণ স্মৃতি।

কবির ভাষায় –

“হিমালয় নাম মাত্র,
আমাদের সমুদ্র কোথায়?
টিমটিম করে শুধু খেলো দুটি বন্দরের বাতি।
সমুদ্রের দুঃসাহসী জাহাজ ভেড়ে না সেথা;
– তাম্রলিপ্ত সকরূণ স্মৃতি।”


উপসংহার: কেন আমরা বাঙালি?

আমরা বাঙালি, কারণ আমাদের ধমনিতে বইছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের রক্ত। আমরা বাঙালি, কারণ প্রকৃতির এই বিশাল সীমানা আমাদের উদার হতে শিখিয়েছে, নদী আমাদের দিয়েছে গতিশীলতা। আর শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের মতো দূরদর্শী শাসকেরা আমাদের দিয়ে গেছেন একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়।

আজ ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক কারণে বাঙালি হয়তো নানা রাষ্ট্রে বা সীমান্তে বিভক্ত, কিন্তু হাজার বছরের সংস্কৃতি, ভাষা আর ইতিহাসের এই অটুট বন্ধন বাঙালিকে পৃথিবীর বুকে এক অনন্য ও অপরাজেয় জাতি হিসেবে টিকিয়ে রাখবে চিরকাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *