ইতিহাস ও ঐতিহ্য

আদিনা মসজিদ: ঐক্যবদ্ধ বাংলার স্বর্ণযুগ ও বাঙালি পরিচয়ের স্থাপত্য রত্ন।

মালদহের আদিনা মসজিদ ১৩৭৩-১৩৭৪ খ্রিস্টাব্দে ইলিয়াস শাহী বংশের দ্বিতীয় সুলতান সিকান্দার শাহের রাজত্বকালে নির্মিত, বাঙালি রাজমিস্ত্রি ও পাথর খোদাই শিল্পীদের হাতে তৈরি ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের মধ্যে অন্যতম বিশালাকার স্থাপত্য নিদর্শন। প্রায় ৫২৪ ফুট দীর্ঘ এবং ৩২২ ফুট চওড়া, ২৬০টি থাম এবং ৩৮৭টি গম্বুজ নিয়ে এই বিশালাকার স্থাপত্য শুধু একটি মসজিদ ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন দিল্লি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো বাংলা সাম্রাজ্যের শক্তি, ক্ষমতা, আভিজাত্য ও অহংকারের প্রতীক।


Support Bengal Frontier
Help us tell the stories that matter.
logo
DONATE NOW
Powered By Cashfree logo


পরবর্তীকালে অল্প সময়ের জন্য হলেও রাজা গণেশ যখন বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করেন, তখন তিনিও তাঁর ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য এই মসজিদটিকেই বেছে নেন। তিনি এটিকে তাঁর কাছারি বাড়ি বা প্রশাসনিক ভবনে রূপান্তরিত করেন এবং মসজিদের প্রবেশপথকে হিন্দু মন্দিরের আদলে গড়ে তোলেন। মসজিদের দেওয়ালেও অনেক দেব-দেবীর মূর্তি স্থাপন করেন। ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদ নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত সেই তখন থেকেই।


মসজিদ তৈরির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে দিল্লি সালতানাতের অধীন লখনৌতির গভর্নর আজ্জুদ্দিন ইয়াহিয়ার মৃত্যু হলে মালিক হাজি শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ ১৩৩৯ সালে সপ্তগ্রামের স্বাধীন শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বাংলা তখন দিল্লি সালতানাতের অধীন লখনৌতি (উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গ), সপ্তগ্রাম (দক্ষিণবঙ্গ) ও সোনারগাঁও (পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গ)—এই তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ ১৩৪২ সালে লখনৌতি ও ১৩৫২ সালে সোনারগাঁও আক্রমণ করে দখল করে নেন। এইভাবে তিনি বাংলার তিনটি প্রদেশ সোনারগাঁও, লখনৌতি ও সপ্তগ্রাম একত্রিত করে সমগ্র বাংলার একচ্ছত্র অধিপতি সুলতান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ একত্রিত বাংলাকে একটি অখণ্ড বাংলা সালতানাত হিসেবে ঘোষণা করেন এবং নিজেকে “শাহ-ই-বাঙ্গালাহ” ও “সুলতান-ই-বাঙ্গালাহ” উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি এখানেই থেমে থাকলেন না, এরপর ১৩৫০ সালে (মতান্তরে ১৩৪৯ সালের শেষভাগে) সুলতান ইলিয়াস শাহ তাঁর বাঙালি সৈন্যবাহিনী নিয়ে কাঠমান্ডু উপত্যকায় একটি অত্যন্ত সফল ও ঐতিহাসিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। সুলতানের বাহিনী তরাই অঞ্চল অতিক্রম করে সমতল ভূমি থেকে পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হয় এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কাঠমান্ডু উপত্যকায় প্রবেশ করে। তৎকালীন নেপালি নথিপত্র ও স্বয়ম্ভূনাথ স্তূপের শিলালিপি অনুসারে, শাহের বাহিনী কাঠমান্ডু, ভক্তপুর (ভাদগাঁও) ও ললিতপুর (পাটন) শহরে ব্যাপক আক্রমণ পরিচালনা করে। নেপালের দুর্বল শাসক এই আকস্মিক ও তীব্র আক্রমণ প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হন। ফলে সুলতানের বাহিনী বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ, সোনা-রুপা ও মূল্যবান সামগ্রী লুণ্ঠন করে সফলভাবে বাংলায় প্রত্যাবর্তন করে। ইলিয়াস শাহের পূর্বে বা পরে আর কোনো শাসক হিমালয় অঞ্চলে এত বড় সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারেননি। এই বিজয়ের ফলে উত্তর সীমান্তে ইলিয়াস শাহের সামরিক মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এরপর তিনি সামরিক অভিযান চালিয়ে পূর্বে আসামের গুয়াহাটি পর্যন্ত, দক্ষিণে উড়িষ্যার চিল্কা পর্যন্ত দখল করে নেন। পশ্চিমে বিহার দখল করে হাজিপুর দুর্গ নগর প্রতিষ্ঠা করেন।

বাংলার সুলতান ইলিয়াস শাহের শক্তি বৃদ্ধিকে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক নিজের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে গণ্য করেন। ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক এক বিশাল বাহিনী নিয়ে বাংলা আক্রমণ করেন। ইলিয়াস শাহ রণকৌশলগত কারণে রাজধানী ত্যাগ করে অভেদ্য একডালা দুর্গে আশ্রয় নেন। দিল্লির বাহিনী দুর্গটি দীর্ঘকাল অবরোধ করেও তা দখলে ব্যর্থ হয়। ইলিয়াস শাহের এক লক্ষ আশি হাজার সৈন্য দুর্গ থেকে বের হয়ে দিল্লির সৈন্যদের ওপর আচমকা তীব্র আক্রমণ চালায়, যা ইতিহাসে ‘প্রথম একডালা যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। সুলতান ইলিয়াস শাহের হিন্দু সেনাপতি সহদেব এবং বহু হিন্দু-মুসলিম বাঙালি সৈন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করেন। ফিরোজ শাহ তুঘলক ইলিয়াস শাহের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হন এবং দিল্লিতে ফিরে যান। এই চুক্তির মাধ্যমে দিল্লি সালতানাত পরোক্ষভাবে বাংলার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

সুলতান ইলিয়াস শাহের পর তাঁর পুত্র আবুল মুজাহিদ সিকান্দার শাহ বাংলার সিংহাসনে বসেন। তিনিও তাঁর বাবার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষা বজায় রাখেন। তিনি আসাম জয় করেন, ওড়িশা জয় করেন, ত্রিপুরা জয় করে রাজা-ফা-কে বিতাড়িত করে রত্ন-ফা-কে সিংহাসনে বসান। সিকান্দার শাহ রত্ন-ফা-কে ‘মাণিক্য’ উপাধি প্রদান করেন। ত্রিপুরা রাজমালায় এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

তাঁর শাসনামলে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ১৩৫৯ সালে দ্বিতীয়বার বাংলা আক্রমণ করেন। সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ৮০,০০০ অশ্বারোহী, ৪৭০ হস্তী ও বড় আকারের পদাতিক বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত সেনাবাহিনীকে ব্যক্তিগতভাবে নেতৃত্ব দেন। কিন্তু এবারেও ফিরোজ শাহ তুঘলক পরাজয় স্বীকার করতে এবং চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হন। এরপর দিল্লির পাঠান সুলতানরা আর কখনও বাংলা আক্রমণ করতে সাহস করেননি।

দিল্লি সালতানাতকে দুই-দুইবার পরাজিত করে অর্জিত এই পূর্ণ রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে উদযাপনের জন্যই সুলতান সিকান্দার শাহ পান্ডুয়ায় সুবিশাল আদিনা মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই নির্মাণের মাধ্যমে তিনি দিল্লির প্রতি স্পর্ধার বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। মসজিদটি আকারের দিক থেকে দিল্লির ফিরোজ শাহ তুঘলকের নির্মিত বেগমপুর মসজিদের চেয়েও অনেক বড় ছিল, যা বাংলার সার্বভৌমত্ব ও শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।


স্থাপত্যের বিস্ময়

মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ৫২৪ ফুট লম্বা ও ৩২২ ফুট চওড়া। এতে ২৬০টি থাম ও ৩৮৭টি গম্বুজ আছে। মসজিদের নকশায় বাংলা, আরব, ফার্সি ও বাইজেন্টাইন স্থাপত্য অন্তর্ভুক্ত। শুধু আকার-আয়তনেই আদিনা মসজিদ সেই সময়কার দামেস্ক, বাগদাদ, কর্ডোভা অথবা কায়রোর মসজিদগুলির সঙ্গে তুলনীয় নয়, নকশা ও গুণগত দিক থেকেও এটি বিশ্বের সেরা মসজিদগুলির সমকক্ষ। আদিনা মসজিদের কেন্দ্রস্থলে যে বিশাল খিলানযুক্ত অংশ বা ‘আইওয়ান’ রয়েছে, তা পারস্য এবং মধ্য এশীয় (বিশেষ করে দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ) স্থাপত্যরীতি দ্বারা অনুপ্রাণিত। ভারতীয় উপমহাদেশে এত বড় আয়তনের কেন্দ্রীয় খিলানযুক্ত মসজিদ সেই সময়ে বিরল ছিল।

আদিনা মসজিদের শিলালিপিতে সুলতান সিকান্দারকে “আরব ও অ-আরব (আরব ও আজম) সুলতানদের মধ্যে সবচেয়ে উদার, নিখুঁত, জ্ঞানী, উন্নত এবং ন্যায়পরায়ণ সুলতান” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মসজিদের শিলালিপিতে সিকান্দার শাহকে “মহান সুলতান” এবং “বিশ্বাসীদের খলিফা” হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

মসজিদের অলঙ্করণে নানা ধরনের দেশীয় এবং ইরানীয় মোটিফ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন—লম্বা শিকল দিয়ে ঝোলানো প্রদীপ, ফুল, ঘণ্টা, প্রস্ফুটিত পদ্ম, শাখাপ্রশাখা সমন্বিত গাছ, কুলুঙ্গি, ঘট ইত্যাদি। যে শিল্পীরা এই কাজগুলো করেছিলেন তাঁরা হিন্দু বাঙালি ছিলেন বলে ধরে নেওয়া যায়; সুতরাং পোড়ামাটির কাজ করতে গিয়ে তাঁরা যেসব নকশা তৈরিতে পারদর্শী ছিলেন, তা-ই ফুটিয়ে তুলেছেন স্বাভাবিকভাবেই। পশ্চিমদিকের সারা দেওয়াল জুড়ে রয়েছে এই টেরাকোটার কাজ। আবার গাছ, লতাপাতা ও ফুলের অলঙ্করণ ইরানীয় রীতিতে খুবই প্রচলিত।

রিচার্ড ইটন বলেছেন যে, মসজিদটির পশ্চিমমুখী দিকটি যে রাজকীয় বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলেছে তা প্রাক-ইসলামি ইরানের জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই দেওয়ালটি বহু ধাপবিশিষ্ট একটি বিশাল অন্তঃপট, যার বাইরের অংশে পর্যায়ক্রমিক কুলুঙ্গি এবং আনুভূমিক ও উল্লম্ব—উভয়ভাবেই প্রতিচ্ছায়া ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ইন্দো-ইসলামি স্থাপত্য নিদর্শনে এ ধরনের কোনো স্থাপত্য নিদর্শন পাওয়া যায় না। এটি সাসানীয় আমলের সবচেয়ে জাঁকালো স্থাপত্য নিদর্শন তিসফুন (Ctesiphon)-এর বিখ্যাত তাক-ই-কিসরা প্রাসাদের বাইরের দেওয়ালের কথা মনে করিয়ে দেয়। মুসল্লিদের নামাজের অংশটির নকশায় এ বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট। এছাড়া নামাজের জায়গাগুলির অলংকরণে পাল-সেন যুগের পোড়ামাটির শিল্পকলা ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ এখানে আরব্য-পারস্য ও বাঙালি রীতির সংমিশ্রণ ঘটেছে।


মসজিদের কেন্দ্র স্থল- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

মসজিদের কেন্দ্র স্থল
– কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

মহিলাদের নামাজ আদায়ের স্থান - কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

মহিলাদের নামাজ আদায়ের স্থান – কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

আদিনা মসজিদের মিহরাব
– কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি


স্পোলিয়া (Spolia)

স্থাপত্যবিজ্ঞানের ভাষায় বিজিত বা পূর্ববর্তী সংস্কৃতির ধ্বংসাবশেষের উপাদানকে নতুন কোনো স্থাপত্যে পুনর্ব্যবহার করার এই রীতিকে ‘স্পোলিয়া’ (Spolia) বলা হয়। আদিনা মসজিদ নির্মাণের সময় বিপুল পরিমাণ শক্ত ব্যাসাল্ট পাথর ও পাথরের স্তম্ভের প্রয়োজন হয়। তৎকালীন সময়ে দূর থেকে নতুন পাথর কেটে আনার চেয়ে সংলগ্ন সেন ও পাল রাজাদের আমলের মন্দির, বৌদ্ধবিহার এবং রাজপ্রাসাদের পরিত্যক্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত পাথর সংগ্রহ করা সহজ ছিল। এই অলঙ্কৃত পাথর, খিলান ও স্তম্ভগুলো সরাসরি মসজিদের ভিত্তি, দেয়াল এবং মেহরাব তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো হিন্দু মন্দির বা বৌদ্ধবিহার ভেঙে মসজিদ তৈরির মালমসলা সংগ্রহ করা হয়েছিল—এমন কোনো প্রমাণ নেই।

মসজিদের পশ্চিমদিকের সুবিশাল দুর্গপ্রাকারের মতো দেওয়ালের বাইরের গায়ে কয়েকটি পাথরের ব্লকে হিন্দু অথবা বৌদ্ধ দেবতা এবং নৃত্যশিল্পীদের ত্রুটিপূর্ণ মূর্তি খোদাই করা আছে। মসজিদের পূর্ব দিকের দেওয়ালের ভেতরের দিকে একজন নৃত্যশিল্পীর ত্রুটিপূর্ণ মূর্তি খোদাই করা একটা ছোট পাথরের ব্লক উল্টো করে লাগানো আছে। মিম্বর অর্থাৎ যেখানে উঠে খুতবা পাঠ করা হয়, সেখানে ইমামের দাঁড়ানোর পাটাতনের নিচে হিন্দু অথবা বৌদ্ধ নৃত্যশিল্পীর মূর্তি খোদাই করা আছে লক্ষ করা যায়—যা নেপাল, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মন্দির-স্থাপত্যে এবং বৌদ্ধস্তূপেও পাওয়া যায়। একসময় নিশ্চয়ই এগুলোকে পলেস্তারার প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে পলেস্তারার প্রলেপ খসে পড়ায় এগুলো উন্মুক্ত হয়ে গেছে।

মসজিদে মহিলাদের নামাজ পড়ার জন্য আলাদা ব্যবস্থা ছিল, যেটিকে এখন ‘লেডিস ব্যালকনি’ বলা হচ্ছে। কয়েকটি ঘরের ধ্বংসাবশেষ এখনও টিকে আছে, তার মধ্যে সিকান্দার শাহের সমাধি ছিল বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন।

বর্তমানে যেটিকে মসজিদের প্রধান প্রবেশদ্বার বলা হচ্ছে, সেটি যে মসজিদে প্রবেশের প্রধান দ্বার ছিল না, তা একটু ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায়। কারণ যেখানে মসজিদের অভ্যন্তরে এত বড় বড় খিলান ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে মসজিদের প্রধান প্রবেশদ্বারে কোনো খিলান নেই। এত বিশাল একটি মসজিদের প্রবেশদ্বার এত ছোট হতে পারে না; তাছাড়া মসজিদে ঢোকার রাস্তা সাধারণত পশ্চিম দিক দিয়ে হয় না। সম্ভবত এটা খিড়কি দরজা ছিল, এখান দিয়ে সুলতান পরিবারের মহিলারা যাতায়াত করতেন বলে মনেকরা হয়।

মসজিদের পশ্চিম দিকের এবং উত্তর দিকের দুটি প্রবেশপথের মাথার ওপর গণেশের মূর্তিও খোদাই করা রয়েছে। উত্তর দিকের দুটি দরজার উচ্চতা পশ্চিমের দরজার থেকে কম। বস্তুত বর্তমানে মসজিদের কোনো প্রবেশপথেই কোনো খিলান নেই, যা খুবই অস্বাভাবিক। সবকটি দরজাতেই যে পাথরের চৌকাঠসহ দরজার পুরো ফ্রেমটাই অন্য কোথাও থেকে নিয়ে আসা হয়েছে, তা যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারবেন।

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী রাজা গণেশ যখন বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করেন, তখন নিজের শক্তি ও ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য তিনি আদিনা মসজিদকে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ভবনে রূপান্তরিত করেছিলেন। ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারও এই মত ব্যক্ত করেছেন। সম্ভবত সেই সময়েই নিরাপত্তার কারণে খিলান দেওয়া মসজিদের বড় বড় দরজাগুলি বন্ধ করে দিয়ে, কোনো মন্দির থেকে বর্তমান দরজার পুরো ফ্রেমটাই তুলে এনে এখানে বসানো হয়েছে। মসজিদের ভিতরে এবং বাইরের দেওয়ালেও অনেক দেব-দেবীর মূর্তি সেই সময় বসানো হয়ে থাকতে পারে। তবে তার অর্থ কিন্তু এ নয় যে, রাজা গণেশ কোনো মন্দির ধ্বংস করেই তা সংগ্রহ করেছিলেন। নানা কারণে মন্দির অসম্পূর্ণ থাকত, পরিত্যক্ত হতো, জীর্ণ হতো—সেসব জায়গা থেকেও সংগৃহীত হতে পারে।


স্পোলিয়া – পূর্ববর্তী সংস্কৃতির ধ্বংসাবশেষের উপাদানকে নতুন স্থাপত্যে পুনর্ব্যবহার।

স্পোলিয়া - পূর্ববর্তী সংস্কৃতির ধ্বংসাবশেষের উপাদানকে নতুন স্থাপত্যে পুনর্ব্যবহার।

স্পোলিয়া – পূর্ববর্তী সংস্কৃতির ধ্বংসাবশেষের উপাদানকে নতুন স্থাপত্যে পুনর্ব্যবহার।


রাজা গণেশ

কিন্তু কে এই রাজা গণেশ?

রাজা গণেশ ছিলেন এমনই এক ভাতুরিয়ার জমিদার বংশের সন্তান। আধুনিক বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার ৬নং ভাতুরিয়া ইউনিয়নের গড়ভবানীপুর মৌজায় চব্বিশ পরগনা জেলার ভাতুরিয়াতে এখনো রাজা গণেশের বসতভিটার অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়। তিনি নিজের যোগ্যতায় সুলতানের দরবারে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন এবং দিনাজপুরের শাসক হিসেবে নিযুক্ত হন।

রাজা গণেশের সহায়তায় সুলতান সাইফুদ্দীন হামজা শাহকে হত্যা করে সুলতানের ক্রীতদাস শিহাবুদ্দীন বায়াজিদ শাহ সিংহাসনে বসেন। শিহাবুদ্দীন বায়াজিদ শাহ ছিলেন নামেই মাত্র সুলতান, আসল ক্ষমতা ছিল রাজা গণেশের হাতে। এরপর শিহাবুদ্দীন বায়াজিদ শাহ গুপ্তঘাতকের হাতে খুন হয়ে যান এবং সুলতানের শিশুপুত্র আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ সিংহাসনে বসেন। যতদূর মনে হয়, এসব কিছুর পেছনে রাজা গণেশের প্ররোচনা ছিল। রাজা গণেশ শিহাবুদ্দীনের মৃত্যুর পর তাঁর শিশুপুত্র আলাউদ্দীনকে সিংহাসনে বসিয়েছিলেন এবং তাঁকে নামমাত্র রাজা করে নিজেই রাজ্য শাসন করতেন। এরপর সুলতান আলাউদ্দীনকে হত্যা করে গণেশ স্বয়ং বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করে নেন। তাই সমসাময়িক বিবরণীতে রাজা গণেশকে একজন অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। হয়তো-বা সেই জন্যই রাজা গণেশ বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করলেও নিজেকে তিনি সুলতান বা সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করার সাহস দেখাতে পারেননি। তাই ইতিহাসের পাতায় তাঁকে আমরা জমিদার গণেশ বা রাজা গণেশ নামেই পাই।

রাজা গণেশ সুশাসক ছিলেন। হিন্দুধর্মাবলম্বী হলেও সাম্রাজ্যের মুসলমান প্রজাদের সঙ্গে প্রথম দিকে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল, কিন্তু পরে বিরোধ তৈরি হয়। তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের বিধবা পত্নী ফুলজানি বেগমকে বলপূর্বক বিবাহ করেন এবং নিজের শক্তি-ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য আদিনা মসজিদকে প্রশাসনিক ভবনে রূপান্তরিত করে সেখানে হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি স্থাপন করেন। অনুমান করা হয় আদিনা মসজিদের প্রবেশদ্বার রাজা গণেশই সেই সময় পরিবর্তন করিয়েছিলেন।

এর ফলে মুসলমান প্রজাদের সঙ্গে বিরোধ চরমে পৌঁছালে রাজা গণেশ দমন-পীড়ন নীতি গ্রহণ করেন। বহু মুসলমান বুদ্ধিজীবী, আলেম-ওলামা, সুফি-দরবেশকে হত্যা করা হয়। অনেক মসজিদ ও মাদ্রাসা ভেঙে দেওয়া হয়। তার ফলে পাণ্ডুয়ার সুফি সাধক নূর কুতুব আলম জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শর্কিকে ব্যাকুল আবেদন জানিয়ে এক চিঠি লিখে সাহায্য চেয়ে পাঠান। চিঠি পেয়ে ইব্রাহিম শর্কি বাংলা আক্রমণ করেন।

রাজা গণেশ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে সিদ্ধহস্ত হলেও, তিনি নিজের সামরিক প্রতিভার পরিচয় রাখতে পারলেন না। বিনা যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে ইব্রাহিম শর্কির সঙ্গে সন্ধি চুক্তি করতে বাধ্য হলেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী রাজা গণেশ ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ালেন এবং রাজা গণেশের পুত্র যুবরাজ যদু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বাংলার সিংহাসনে বসলেন। অতঃপর ইব্রাহিম শর্কি দেশে ফিরে গেলেন।

দেশে ফিরে গিয়ে ইব্রাহিম শর্কি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অল্পদিনের মধ্যে পরলোকগমন করেন। রাজা গণেশ তখন যুবরাজ যদুকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে দিয়ে পুনরায় নিজে রাজা হয়ে বসেন এবং মুসলমান প্রজাদের ওপর আবার দমন-পীড়ন চালাতে থাকেন। এক বিশাল আড়ম্বরপূর্ণ যজ্ঞ করে যুবরাজ যদুকে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করিয়ে পুনরায় হিন্দুধর্মে দীক্ষিত করা হয়।

কিন্তু যুবরাজ সুফি দরবেশদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইসলামের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসেন। রাজা গণেশ যুবরাজ যদুকে কারাগারে বন্দি করে রাখেন। যুবরাজ যদু বন্দি থাকা অবস্থাতেই ঘাতক দিয়ে রাজা গণেশকে হত্যা করান এবং নিজে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সুলতান জালালুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ নাম নিয়ে বাংলার সিংহাসনে বসেন। রাজা গণেশের সাত বছরের রাজত্বের অবসান হয়।

সুলতান জালালুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের জনপ্রিয় হতে পেরেছিলেন। মধ্যযুগের বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে, সুলতান জালালুদ্দীন মুহাম্মদ শাহকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুলতান বলে গণ্য করা হয়। তিনি ১৭ বছর বাংলা শাসন করেছিলেন।

সুলতান জালালুদ্দিন মুহাম্মদ শাহ বা তাঁর উত্তরসূরিদের শাসনামলে আদিনাকে তার পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার কোনো প্রচেষ্টা করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে কিছুই জানা যায় না। সম্ভবত বিপুল ব্যয়ের কারণে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।



উপসংহার

আদিনা মসজিদের গায়ে হিন্দু-বৌদ্ধ দেব-দেবীর মূর্তির উপস্থিতির কারণে উগ্রপন্থী হিন্দুত্ববাদীরা দাবি করে যে, মসজিদের জায়গায় আগে আদিনাথ শিব মন্দির ছিল; সেই আদিনাথ মন্দির ভেঙে আদিনা মসজিদ তৈরি করা হয়েছে।

কিন্তু তাঁদের এই দাবির পেছনে কোনো তথ্য-প্রমাণ বা যুক্তি নেই। ‘আদিনা মসজিদ’ নামের সঙ্গে আদিনাথের কোনো সম্পর্ক নেই। ফার্সিতে ‘আদিনা’ মানে শুক্রবার বা জুম্মাবার। অর্থাৎ আদিনা মসজিদ ছিল রাজকীয় জুম্মা মসজিদ বা জামে মসজিদ। সমকালীন বা তার পরবর্তীকালের কোনো হিন্দু লেখক বা কবির লেখা কোনো সাহিত্যে, কাব্যে, মঙ্গলকাব্যে, অথবা বিদেশি রাষ্ট্রদূত এবং পর্যটকদের লেখাতে মন্দির ধ্বংস করে মসজিদ তৈরি করার কথা কোথাও বলা হয়নি।

উনিশ শতকে ভূমিকম্পে মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এটি অব্যবহৃত হয়ে পড়ে। পাণ্ডুয়ার বেশিরভাগ অঞ্চল লতাপাতাপূর্ণ জায়গা হয়ে যায়।


তথ্যসুত্রঃ

বাঙ্গলা দেশের ইতিহাস (মধ্য যুগ) – ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার
The Rise of Islam and the Bengal Frontier – Rechard M. Eaton
The Art and Architecture of Adina Mosque – Rozina Parvin
Memories of Gaur and Pandua – Khan sahib M. Abid Ali Khan


বাংলা এবং বাঙালির জন্য লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের সাহায্য করুন।
আমরা কোনো কোটিপতি বা বড় কোনো কোম্পানি নই – আমাদের পাঠকরাই আমাদের সমর্থন করেন। আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ এবং সাহসী প্রচেষ্টার জন্য অনুদান দিয়ে আমাদের পাশে থাকুন।

logo
DONATE NOW
Powered By Cashfree logo